Sunday, 26 June, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




বিয়ানীবাজার পৌরসভায় কঠিন সমীকরণের ভোটযুদ্ধ

ছাদেক আহমদ আজাদ: আর মাত্র একদিন  পরেই বিয়ানীবাজার পৌরসভার দ্বিতীয় নির্বাচন। এলক্ষ্যে সোমবার প্রচার-প্রচারণার শেষ দিনে মেয়র প্রার্থীদের শো-ডাউনে পৌরশহর ছিল উৎসবমুখর। পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন জানাতে পৌরবাসী ছাড়াও বিয়ানীবাজার এবং বড়লেখা উপজেলার অনেক মানুষ নির্বাচনী মিছিল ও সমাবেশে যোগদান করেন। বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে শহরে মানুষের ভীড় থাকলেও প্রার্থীদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। এ পর্যন্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড়ধরণের কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। মধ্যরাত ১২ টায় বন্ধ হয়ে গেছে প্রার্থীদের দৌঁড়ঝাপ। ভোটের দৌঁড়ে পিছিয়ে থাকা দু’প্রার্থীর মধ্যে আঞ্চলিক ইস্যুতে ঐক্য হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন সুখবর পাওয়া গেলে মেয়র পদে চতুর্মুখী অথবা ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে।

আগামীকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতার মসনদে কে বসবেন, ঐতিহাসিক এ রায় চূড়ান্ত করবেন ২৭ হাজার ৩৬৯ জন ভোটার। এখন তাদের দিকে চেয়ে আছেন প্রার্থী ও তাদের শুভাকাক্সিক্ষরা। কাক্সিক্ষত এ নির্বাচনে ১০ মেয়র ও ৫৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনের চাঁদ রাতে কালো টাকা বিতরণ বন্ধে প্রশাসন নজরদারি জোরদার করেছে।

পৌর নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে মোট ৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতি কেন্দ্রে একজন এসআই এর নেতৃত্বে ৫ জন পুলিশ ও ৯ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি ভ্রাম্যমান টহলে নিয়োজিত থাকবে ২ প্লাটুন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও আনসার। গতকাল রাতে সিলেটের ডাক’কে এসব তথ্য জানিয়েছেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আশিক নূর।

নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি রিটার্নিং অফিসার সৈয়দ কামাল হোসেন জানান, ইভিএম এর মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট করতে প্রতি কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এতে শতাধিক ক্যামেরা বসানো হবে। তিনি জানান, আজ সকাল থেকে প্রিসাইডিং অফিসারের মাধ্যমে নির্বাচন সামগ্রী কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌছানো হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট সম্পন্ন করতে প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন সৈয়দ কামাল হোসেন।

কেন্দ্র অনুযায়ী ভোটের হিসেবে বিয়ানীবাজার পৌরসভার শ্রীধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৩৫৪ ভোট, কসবা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ২০০২ ভোট, কসবা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৬৫৩ ভোট, খাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৬৬৭ ভোট, পিএইচজি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ৩২৮৫ ভোট, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ২০৪৪ ভোট, বিয়ানীবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ১৯২৮ ভোট, খাসাড়ীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৬০৩ ভোট, নিদনপুর সুপাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩১৯৯ ভোট ও নিদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৬৩৪ ভোট।

এদিকে, গতকাল বিকেলে পৌরশহরে শেষ নির্বাচনী সভা ও মিছিল করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের মো. আব্দুস শুকুর, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চামচ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী জিএস ফারুকুল হক, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হেলমেট প্রতীকের মেয়র প্রার্থী হাজি আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। এছাড়া পৌরশহরে মুরব্বিদের সাথে নিয়ে ব্যতিক্রমী র‌্যালী বের করেন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সাবেক পৌর প্রশাসক মো. তফজ্জুল হোসেন।

জানা যায়, শহরের উত্তর বাজারে নৌকার সমর্থনে নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কবির উদ্দিন আহমদ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ আব্বাছ উদ্দিন, বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান খান, সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল, বড়লেখা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সুন্দর, মেয়র প্রার্থী আব্দুস শুকুরসহ জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।

এ সময় শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকা প্রতীকে ভোট দিন।

বক্তব্য রাখছেন এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান

এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান বলেন, পিছিয়েপড়া পৌরসভায় সকল নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করেছেন মেয়র আব্দুস শুকুর। নান্দনিক পৌরসভা গড়তে তাঁকে আরেকবার সুযোগ দিন। তিনি বিজয়ী হলে সমবণ্টনের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজ করবেন।

মেয়র প্রার্থী আব্দুস শুকুর বিগত ৫ বছরের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে বলেন, আমি সর্বদা জনগণের কল্যাণে কাজ করেছি। আমার বিশ্বাস ভোটের মাধ্যমে পৌরবাসী এখন প্রতিদান দিবেন।

ভোটের মাঠে তুমূল আলোচনায় থাকা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিএস ফারুকুল হক গতকাল শহরের উত্তর বাজারে তাঁর চামচ প্রতীক এর শেষ নির্বাচনী সভা করেছেন। এ সময় বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জুয়াদ আলী, বিয়ানীবাজার সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ, শ্রমিক নেতা আকিল উদ্দিন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি নেতা আবু তাহের, বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান, সাবেক ছাত্রনেতা আজহার হোসেন রিফাত প্রমুখ। সভায় বক্তারা বলেন, ক্লিন ইমেজের সাবেক ছাত্রনেতা ফারুকুল হকের নির্বাচনী প্রচারণায় নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা মেয়র নির্বাচিত হয়ে পৌরবাসীর উন্নয়ন করতে চাই। এজন্য সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছি।

বক্তব্য রাখছেন চামচ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী জিএস ফারুকুল হক

মেয়র প্রার্থী ফারুকুল হক বলেন, পৌর এলাকায় নেতৃত্বের যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণে আমি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে এসেছি। আসুন আমরা পরিবর্তন ও সমণ্টন প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিতে সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে জবাব দিই। তাহলেই আমাদের জীবন হবে আরো সহজ, আরো সুন্দর। তিনি চামচ মার্কায় ভোট দিতে পৌরবাসীর প্রতি আকুল আবেদন জানান।

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হাজি আব্দুল কুদ্দুছ টিটুর হেলমেট প্রতীকের সমর্থনে গতকাল শহরের দক্ষিণ বাজারে শেষ নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী হাজি আব্দুল সফিকসহ নেতৃবৃন্দ। এ সময় বক্তারা বলেন, বিয়ানীবাজার পৌরসভা নির্বাচন আদায়ের অন্যতম সাহসি সৈনিক আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। তিনি দীর্ঘ ৯ বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরে নির্বাচনের পক্ষে রায় আনেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার ষড়যন্ত্রের কারণে গত নির্বাচনে তার নাম পর্যন্ত কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি। এবারও সিন্ডিকেট শক্তিশালী করতে ফারুকুল হক কিংবা আব্দুল কুদ্দুছ টিটুকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়নি। তারা ভোটের মাধ্যমে সিন্ডিকেট চক্রের বিদায় জানাতে পৌরবাসীর প্রতি জোর দাবি জানান।

বক্তব্য রাখছেন হেলমেট প্রতীকের মেয়র প্রার্থী হাজি আব্দুল কুদ্দুছ টিটু

এ সময় মেয়র প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুছ টিটু বিএ বলেন, একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা চালাতে হলে শিক্ষিত মেয়রের প্রয়োজন। স্বশিক্ষিতরা মেয়র হলে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। এজন্য দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি পিছু ছাড়বে না। তিনি হেলমেট প্রতীকে ভোট দিতে সবার প্রতি অনুরোধ করেন।

সোমবার বিয়ানীবাজার পৌরশহরে প্রবীণ মুরব্বিদের সাথে নিয়ে ব্যতিক্রমী র‌্যালী করেছেন জগ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান ও সাবেক পৌর প্রশাসক মো. তফজ্জুল হোসেন। বিগত নির্বাচনে তিনি তৃতীয় স্থান দখল করেছিলেন। এবার জয় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাঁর নিজস্ব ভোট ব্যাংকে হানা দিতে একাধিক প্রার্থী চেষ্টা করলেও তেমন সুখবর এখনো পাননি। তবে, তফজ্জুল সহোদর মোহাম্মদ জাকির হোসেন প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে কাজ করায় তিনি কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

মেয়র প্রার্থী তফজ্জুল হোসেনের নেতৃত্বে জগ প্রতীকের র‌্যালী

গতকাল র‌্যালী শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সালে আলাপকালে তফজ্জুল হোসেন বলেন, পৌরসভাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এজন্য শেষ বয়সে আরো একটিবার সুযোগ দিতে তিনি পৌরবাসীর প্রতি অনুরোধ করেন।

অপরদিকে, সোমবার রাতে শ্রীধরা ত্রিমুখী বাজারে শেষ নির্বাচনী সভা করতে পারেননি মোবাইল প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মো. আব্দুস সবুর। এরআগে গত রোববার রাতে শ্রীধরার কৃতিসন্তান মেয়র প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুছ টিটু মহান মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত আব্দুর রহিম বছন হাজির ‘রাজাকারপুত্র’ আব্দুস সবুরকে ঐ এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত শ্রীধরাবাসী আব্দুল কুদ্দুছ টিটুকে ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে সমর্থন করেন। এজন্য কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছেন নবাং-শ্রীধরার ঐক্যের প্রত্যাশী মেয়র প্রার্থী আব্দুস সবুর। এ পর্যন্ত তাঁকে বিএনপি-জামায়াতও সমর্থন করেনি বলে জানা গেছে।

 


সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :