Saturday, 27 November, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের উদ্যোগ


কাউসার চৌধুরী

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনার দু’টি মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়। উচ্চ আদালতের আদেশে গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের দু’টি মামলার বিচার কার্যক্রম একই আদালতে এক সাথে চলবে । এজন্যে নতুন করে মামলার অভিযোগও গঠন করা হবে। তবে, আগামী ধার্য্য তারিখে কোন আদালতে নতুন করে অভিযোগ গঠন করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী শনিবার দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনার এক বছর পূর্ণ হবে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী প্যানেলের প্রধান এডভোকেট শহিদুজ্জামান চৌধুরী সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগে মামলা দু’টি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের জন্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছি। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী গণধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের দু’টি মামলার বিচার হবে একই সাথে এবং একই আদালতে। এজন্যে নতুন করে অভিযোগ গঠন করতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি এডভোকেট রাশিদা সাঈদা খানম উচ্চ আদালতের আদেশের ফলে নতুন করে অভিযোগ গঠন করার কথা নিশ্চিত করেন। তবে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দু’টি প্রেরণের ব্যাপারে তার কাছে কোনো তথ্য নেই বলে তিনি জানান।

⇒ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ
বাদীপক্ষ সূত্রে জানা যায়, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে আলোচিত গণধর্ষণের ঘটনার বিচার কার্যক্রম কম সময়ের মধ্যে সম্পন্নের লক্ষ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দু’টি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয় এ সংক্রান্ত জেলা কমিটি। এজন্যে গেল ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা ।

⇒আবারও অভিযোগ গঠন করা হবে
গত ২৪ জানুয়ারি আদালতে এ দুটি মামলার বিচার কাজ একসঙ্গে শুরু করার আবেদন করেছিলেন বাদীপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপরই বাদীপক্ষ মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম একই আদালতে সম্পন্নের জন্য জানুয়ারি মাসেই উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। ফৌজধারি বিবিধ মামলা নম্বর -৮৯৫২/২০২১। গত ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চ্যুয়াল বেঞ্চ এ মামলার শুনানি করেন । বাদী পক্ষে ব্যারিস্টার আব্দুল কাইয়ূম লিটন ও এডভোকেট সাব্রিনা জারিন এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সরওয়ার হোসেন বাপ্পি, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাওদুদা বেগম ও হাসিনা মমতাজ শুনানিতে অংশ নেন। শুনানি শেষে আদালত মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম একসাথে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলায় একই সাথে দন্ডবিধি আইনের ধারা থাকলে মামলার বিচার একই আদালতে চলতে পারে। এক সাথে বিচার কার্যক্রম চলতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু একই ঘটনায় পুলিশের দু’টি অভিযোগপত্র দেয়ায় বাদীপক্ষের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এতে ন্যায় বিচার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাক্ষীদের জন্যও বিষয়টি বিড়ম্বনার। কারণ, চাঞ্চল্যকর এ মামলার সাক্ষীরা দুই আদালতে দু’দিন আসবেন কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন বাদীপক্ষ । ধর্ষণকারীরা সকলেই নানাভাবে প্রভাবশালী। এজন্য বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। আগামী ১৩ অক্টোবর বুধবার মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ রয়েছে। তবে, ওই দিন কোন আদালতে অভিযোগ গঠন করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

⇒ সাক্ষ্য দিতে গ্রেফতার করা হয় বাদীকে
গত ১৭ জানুয়ারি রোববার মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। ওই দিন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো মোহিতুল হক চৌধুরী সকল আসামীর উপস্থিতিতে অপহরণ, গণধর্ষণ ও গণধর্ষণে সহায়তার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের পর ২৭ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। কিন্তু বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতে এক সাথে একই আদালতে মামলা দু’টি চালানোর আবেদন করায় এবং আবেদনটির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে যাননি। ওইদিন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ থাকার পরও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে যাননি মামলার বাদীসহ পাঁচ সাক্ষী। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন আদালত। ওইদিন গ্রেফতারী পরোয়ানামূলে মামলার বাদীকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আদালতে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ । ওইদিন উচ্চ আদালত শুনানি শেষে আদেশ দেন। তাৎক্ষণিকভাবে উচ্চ আদালতের আদেশের কপি সরবরাহ করা হলে সাক্ষ্য গ্রহণ না করে বাদীকে ছেড়ে দেয়া হয় বলে বাদীর প্রধান আইনজীবী এডভোকেট শহিদুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন।

⇒ ৬ ধর্ষকসহ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
আলোচিত এই গণধর্ষণের ঘটনায় সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার পুত্র সাইফুর রহমান (২৮), হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গির মিয়ার পুত্র শাহ মো মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের পুত্র তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের পুত্র অর্জুন লস্কর (২৬), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের পুত্র রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির (গাছবাড়ী) সালিক আহমদের পুত্র মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার (বাসা নং-৭৬) মৃত সোনা মিয়ার পুত্র আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের পুত্র মিজবাউল ইসলাম রাজনকে (২৭) অভিযুক্ত করে দন্ডবিধির ৩৪২/৩২৩/৩৭৯/৩৮৫/৩৪ ধারা তৎসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী, ২০০৩) এর /৭/৯/(৩)৩০ ধারায় অভিযোগপত্র গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আদালতে জমা দেয় পুলিশ। এতে ৫২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য রাজন ঘটনার ২ মাস ৮ দিন পর ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেন। গ্রেফতারকৃত এই ৮ আসামীর সকলেই অকপটে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়। ৮ আসামীর মধ্যে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক ও অর্জুন লস্কর, মিজবাহুল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ১৯ বছর বয়সী ওই নববধূকে গণধর্ষণ করে। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম ধর্ষণে সহযোগিতা করে। ৮ আসামীর সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তারা টিলগড় গ্রুপে সক্রিয় ছিল বলেও সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে ৮ আসামী সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে।

এদিকে, ৩ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র গ্রহণ করা নিয়ে প্রথম শুনানি হয়। ওই দিন বাদীপক্ষ অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় সময় প্রার্থনা করেন। ১০ জানুয়ারি বাদীপক্ষের আইনজীবী অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য আবেদন করে সময় চাইলে আদালত দুই দিনের সময় নির্ধারণ করে দেন। বাদীপক্ষের আবেদনে অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করার জন্য আদালতে জমা দেওয়া বেশ কিছু নথি চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মামলার অভিযোগপত্র, সিজার লিস্ট, জিম্মানামা, স্কেচ, ইনডেক্স, ইনডেক্সের সূচি ও ব্যাখ্যা, মেডিকেল ও ডিএনএ রিপোর্ট, আসামীদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ২২ ধারার জবানবন্দি, আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও আসামীদের রিমান্ড আবেদনের কপি।

এদিকে , গণধর্ষণের ঘটনার আগে অস্ত্র মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ঘটনার ১ মাস ২৭ দিন পর ২২ নভেম্বর অভিযোগপত্রটি জমা দেয়া হয়। ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিসহ ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত সকলকে আসামী করে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯/১৯এ ধারায় অভিযোগপত্রটি জমা দেয়া হয় ।

⇒ সাইফুররাই ধর্ষণ করেছিল
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনার পর ১ ও ৩ অক্টোবর গ্রেফতারকৃত ৮ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় । আদালতের আদেশের পর ওসমানীর ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ওসিসির মাধ্যমে ৮ আসামীর ডিএনএ সংগ্রহ করে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে প্রেরণ করে পুলিশ। নমুনা সংগ্রহের প্রায় ২ মাস পর ৩০ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট ডিএনএ রিপোর্ট এসে পৌছে। ডিএনএ রিপোর্টে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর ও মাহবুবুর রহমান রনির ডিএনএ ‘ম্যাচিং’ পাওয়া যায়। এদিকে আইনুদ্দিন ও মিসবাহ উদ্দিন রাজন’র ডিএনএ ‘মিক্সিং’ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

ডিএনএ রিপোর্ট’র ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই ৬ জনই গৃহবধূকে ধর্ষণ করেছিল। আইনুদ্দিন ও মিসবাহ ধর্ষণের সময় ‘কিছু ব্যবহার করায়’ ম্যাচিং এর বদলে রিপোর্টে ‘মিক্সিং’ পাওয়া যায়। বাকী ৪ জন কোনো কিছু ব্যবহার না করে সরাসরি ধর্ষণ করেছিল।

⇒ অধ্যক্ষ ও সুপারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ
এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমেদ ও হোস্টেল সুপার জীবন কৃষ্ণ আচার্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। চলতি বছরের ২ জুন দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো কামরুল হোসেন মোল্লার সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন। আদেশে বলা হয় , ‘ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের পেছনে মূলত হোস্টেল সুপার ও প্রহরীদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে ওই কলেজের অধ্যক্ষও কোনোভাবে ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না।’ আইন সচিব, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

এদিকে, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে সিলেটের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোঃ বজলুর রহমান, সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম মো আবুল কাশেম, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মমিনুন নেছা ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ২০ অক্টোবর ১৭৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন হাইকোর্ট বেঞ্চে জমা দেন।

এদিকে, ধর্ষণের ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।

⇒ ছাত্রত্ব-সার্টিফিকেট বাতিল
গণধর্ষণের ঘটনা গণ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার সাথে সাথে দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। সিলেটসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে ধর্ষণ বিরোধী তীব্র আন্দোলন। ঘটনার পর এমসি কলেজের ছাত্র সাইফুর রহমান, মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম ও রবিউল ইসলামকে কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেন। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে।

⇒ আদালতে অকপটে সবই স্বীকার
গণধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষকদের গ্রেফতারে মাঠে নামে আইনশৃংখলা বাহিনী। ঘটনার ৩ দিনের মধ্যে ৮ আসামীকে র‌্যাব ও পুলিশ সাড়াশি অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। সাইফুর রহমানকে ছাতক থেকে, তারেকুল ইসলাম তারেককে দিরাই থেকে, মাহবুবুর রহমান রনিকে হবিগঞ্জ সদর থেকে, অর্জুন লস্করকে মাধবপুর থেকে, রবিউল ইসলামকে নবীগঞ্জ থেকে ও মাহফুজুর রহমান মাসুমকে হরিপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। আইনুদ্দিন ও মিসবাহ উদ্দিন রাজনকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাদেরকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত প্রত্যেককে ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে পর্যায়ক্রমে ৮ আসামী আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেয়। গৃহবধূকে তুলে নেয়াসহ ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে নিজেদের জবানবন্দিতে।

⇒ সংসদে আইনের পরিবর্তন
এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন হয়। ঢাকা, সিলেটসহ দেশের সর্বত্র চলে ধারাবাহিক কর্মসূচি। এক পর্যায়ে সরকার ধর্ষণের সাজার আইনের পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের ঘোষণা দেয়। বিষয়টি প্রথমে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। পরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিল আকারে পাশ হয়।

জানা গেছে, গত ৮ নভেম্বর জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি তুলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। একই দিন বিলটি সংসদে তোলা হয়। ২০০০ সালের নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধন করা হয়। গত ১৭ নভেম্বর ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান করে জাতীয় সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল ২০২০ পাশ হয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা বিলটি পাশের প্রস্তাব করেন।

⇒ ভয়ঙ্কর সেই সন্ধ্যা
গেল বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক তার ১৯ বছর বয়সী নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান। এর আগে শাহপরান (রহঃ) মাজারও ঘুরে আসেন তারা। সন্ধ্যার পরে এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে তারা থামেন । এ সময় কয়েক যুবক ওই স্বামী ও তার স্ত্রীকে ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে প্রাইভেটকারসহ তাদেরকে জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যায় । এরপর স্বামীকে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ৫ম তলা বিল্ডিং এর সামনে প্রাইভেটকারের মধ্যেই গৃহবধূকে ধর্ষণ করে। তারা দম্পতির সাথে থাকা টাকা, স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আটকে রাখে তাদের প্রাইভেট কারও। ছাত্রাবাস থেকে টিলাগড় পয়েন্টে এসে যুবকটি পুলিশে ফোন দেন। পুলিশ আসতে বেশ সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ পেয়ে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ নির্যাতিতাকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করে। ঐ রাতেই নির্যাতিতার স্বামী মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৩-৪ জনকে আসামী করে শাহপরান থানায় মামলা করেন। শাহপরান থানার মামলা নং- ২১। তারিখ-২৬/০৯/২০২১।

মামলা দায়েরের পর ঘটনাস্থল এলাকার শাহপরান থানা পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কিংবা সিলেট মহানগর পুলিশ এজাহারভুক্ত কোন আসামীকেই গ্রেফতার করতে পারেনি। র‌্যাব ও সিলেট রেঞ্জের অধীনস্থ পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করে।

 




 

Developed by :