Wednesday, 22 September, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




এবার কম ধাপে হবে ইউপি নির্বাচন

গাজী শাহনেওয়াজ: নভেল করোনাভাইরাসে মৃত্যু ও সংক্রমণ এখন নিম্নমুখী। এ সুযোগটা কাজে লাগাতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ সারা দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে ভোট গ্রহণের ধাপ কমিয়ে দ্রুত শেষ করবে নির্বাচন কমিশন। অতীতে ছয় ধাপে হয়েছিল ইউপির ভোট।

এদিকে ইউপি নির্বাচন করার জন্য একটি পথনকশা তৈরি করছে কমিশন সচিবালয়। সব ধরনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। সচিবালয়ের তৈরি খসড়া কমিশন সভায় উত্থাপন করবে। এ উপলক্ষে আগামী ২ সেপ্টেম্বর কমিশন সভা বসবে। সভায় আলোচনার পর স্থগিত ইউপিসহ বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সব ইউপির তফসিল দেবে ইসি।

ইসির ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা সূত্র বলছে, স্থগিত ইউপি নির্বাচন হবে সেপ্টেম্বরে। বাকি নির্বাচনের পরবর্তী ধাপের ভোট শুরু হবে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে। এভাবে কয়েক ধাপে শেষ হবে তৃণমূলের মূলভিত্তি ইউপির এই ভোট। তবে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি। এ কারণে নির্বাচনের প্রচারসহ কিছু বিষয়ে শর্তারোপ হবে। সীমিত পরিসরে চলবে সভা-সমাবেশ, জনসমাগম এড়িয়ে চালাতে হবে প্রচার এবং স্বাস্থ্যবিধি মানায় থাকবে কড়াকড়ি। এ ছাড়া শারীরিক প্রচারের বিকল্প হিসেবে সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির তাগিদ থাকবে এবার। এই নির্বাচন ব্যালটের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা সদর ইউপিগুলোতে এ প্রযুক্তিতে নির্বাচন হবে।

এই নির্বাচন আয়োজনে সরকার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আপত্তি নেই বলে জানা গেছে। ইসি তার সুবিধা অনুযায়ী যাতে এসব নির্বাচন করতে পারেন, সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহায়তা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। তারা চায় প্রার্থীরা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্বাচনের কার্যক্রম চালান সেটা নিশ্চিত করবে ইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, স্থগিতসহ মেয়াদোত্তীর্ণ ইউপি নির্বাচন করার জন্য মন্ত্রণালয় আলাদা করে চিঠি পাঠাবে না। কমিশন সুবিধা অনুযায়ী সম্পন্ন করবে এসব নির্বাচন। আমরা চাই তারা যে নির্বাচনই করুন সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানায় বিশেষ নজর দেবেন। সম্ভব হলে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তার জন্য নিদের্শনা দিতে পারেন, যোগ করেন সরকারের এই সিনিয়র সচিব।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন দলীয় প্রতীকে। তবে বিএনপির সমর্থকরা মাঠে লড়বেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে। ক্ষমতাসীনদের দলীয় কোন্দলের ফায়দা নিতে চায় দলটি। অন্যদিকে স্বতন্ত্র হওয়ায় বিএনপির প্রার্থীরা প্রচারের ক্ষেত্রে পুলিশের হয়রানি এড়িয়ে মাঠে থাকবেন সরব। তৃণমূলকে চাঙা রাখতে দলটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে কিছু প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা থাকবে। কারণ আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আন্দোলনসহ নানা ইস্যুতে এসব প্রার্থী ভূমিকা রাখতে পারবে। এ খবর পাওয়া গেছে বিএনপির হাইকমান্ড সূত্র থেকে।

জানতে চাইলে বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির বলেন, বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে থাকবেন নির্দলীয় পরিচয়ে অর্থাৎ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এখনো পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ডের এমনিই সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে নানা ইতিবাচক যুক্তি রয়েছে বলে জানান দলটির এই গণমাধ্যম মুখপাত্র।

ভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ইউপি নির্বাচন করার জন্য সচিবালয় কাজ করছে। তারা প্রস্তুত করে আমাদের কাছে উপস্থাপন করলে সেটাকে দেখে কমিশন থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে কীভাবে ও কবে নির্বাচন করা যায়।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, স্থগিত ইউপি ভোট আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার চিন্তা আছে। আর বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সব ইউপির নির্বাচন শেষ করা হবে এ বছরের মধ্যে। এসব নির্বাচনের পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন। আগামী ২ সেপ্টেম্বর কমিশন সভা হবে; সেখানে আলোচনার পর কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করা হবে। তবে অতীতের মতো এত ধাপে নির্বাচন হবে না। করোনা পরিস্থিতির কারণে ধাপ কমিয়ে নির্বাচন করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান প্রশাসন সার্ভিসের এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ধাপের ভোট অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হবে।

তথ্য মতে, করোনা পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে সব ইউপির নির্বাচন মেয়াদোত্তীর্ণ। করোনার কারণে তফসিল দিয়েও এসব নির্বাচন শেষ মুহূর্তে এসে স্থগিত করতে হয়েছিল যা সেপ্টেম্বরে হতে যাচ্ছে। এ কারণে পরিষদের কার্যক্রম ধরে রাখতে বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব নিয়মিত রাখতে চিঠি জারি করেছিল মন্ত্রণালয়। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হলে নতুন নির্বাচিতরা পরিষদ চালাবেন।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনে পরিষদের মেয়াদের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘কোনো পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা, সংশ্লিষ্ট পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠানের তারিখ থেকে পাঁচ বছর সময়ের জন্য উক্ত পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।’

পরিষদের নির্বাচনের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘পরিষদ গঠনের জন্য কোনো সাধারণ নির্বাচন ওই পরিষদের জন্য অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে।’ আইনে উল্লেখ রয়েছে, ‘দৈব-দুর্বিপাকজনিত বা অন্যবধি কোনো কারণে নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হলে, সরকার লিখিত আদেশ দ্বারা, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কিংবা অনধিক ৯০ দিন পর্যন্ত যা আগে ঘটবে, সংশ্লিষ্ট পরিষদকে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্ষমতা দিতে পারে।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা দেশে ইউপি সংখ্যা ৪ হাজার ৪৮৩টি। এর মধ্যে ছয় ধাপে ভোট হয়েছে ৪ হাজার ৩২১টিতে এবং অন্যান্য সময়ে ভোট হয়েছে ১৬২টিতে। গত ২১ মার্চ মেয়াদ শেষ হয় ৭৫২ ইউপির, ৩০ মার্চ ৬৮৪ ইউপির, ২২ এপ্রিল ৬৮৫ ইউপির, ৬ মে ৭৪৩ ইউপির, ২৭ মে ৭৩৩ ইউপির এবং গত ৩ জুন শেষ হয় ৭২৪ ইউপির মেয়াদ।

 

Developed by :