Wednesday, 22 September, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ৭ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




উন্নয়নের ছোঁয়া বঞ্চিত উলুউরি ও মালপাড়া রাস্তার বেহাল দশা

সানেশ্বর-উলুউরি, মাটিজুরা-মালপাড়া রাস্তার বর্তমান অবস্থা (বা থেকে)

ছাদেক আহমদ আজাদ:

বিগত এক দশকে বিয়ানীবাজার উপজেলায় সর্বক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নয়ন হয়েছে। এরপরও অনেক স্থানে রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা দেখলে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি কি তা বেমালুম ভুলে যেতে হবে! বর্ষা মৌসুম আসায় ভুক্তভোগি জনগণ নিজ এলাকার কর্দমাক্ত রাস্তার ছবি ফেসবুকে দিয়ে তীর্যক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সেখানে সরকারের উন্নয়নের ছিটেফুটো ছোঁয়াও লাগেনি। আসলে কি তাই? না, উন্নয়ন হয়েছে তবে তা দৃশ্যমান হয়নি।

এদিকে, কাচা রাস্তা পাকা না হওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। এলাকাবাসী কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে চলাচলে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপিসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

খানাখন্দে ভরপুর সানেশ্বর-উলুউরি রাস্তা

দৃশ্য-১: বিয়ানীবাজার উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের নানকার বিদ্রোহ আন্দোলনের সূতিকাগার সানেশ্বর-উলুউরি গ্রাম। এ দু’গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। বিশেষ করে নানকার স্মৃতি সৌধ থেকে পশ্চিমমুখী প্রায় দু’কিলোমিটার কাচা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় উলুউরি গ্রামে। শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসরমান এ গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছেন। একসময় তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা। অনেক চেষ্টা তদবিরের পর বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে বিদ্যুতের দুঃখ লাঘব হয়। কিন্তু রাস্তার অবস্থা আগে যা ছিল, এখনও তা-ই। বর্ষা মৌসুম আসায় এ গ্রামের মানুষের দুঃখভরা নিঃশ্বাস বেড়েই চলছে। এখন পুরো রাস্তা কর্দমাক্ত হওয়ায় ছোট যানবাহন তো দূরের কথা হেঁটে চলাও দায়। আর কিছুদিন পর বন্যা হলেই রাস্তাটি পানির নিচে তলিয়ে যাবে। তখন অনেক পথ ঘুরে সোনাই নদীর ডাইক ব্যবহার করে তাদেরকে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে হবে। এ দুঃখ-কষ্টের অবস্থা থেকে সহসাই তারা উত্তরণ চান।

এ বিষয়ে উলুউরি গ্রামের উদ্যমী তরুণ সুশীল দাস অনেকটা ক্ষোভের সুরে বলেন, ‘শুধু নির্বাচন আসলে বসন্তের কোকিলদের দেখা মিলে। যেই নির্বাচন শেষ, সব কোকিল নীড়ে চলে যায়। নির্বাচন ছাড়া উলুউরি গ্রামের কথা কেউ মনে রাখে না বা রাখতে চায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।’

অঞ্জন অপু নামে এক ব্যক্তি কর্দমাক্ত ছবি ফেসবুকে দিয়ে লিখেন, ‘এটা কোন বিল বা হাওরের মাঝের রাস্তা নয়। এটি উলুউরি গ্রামের হাজারো মানুষের চলাচলের প্রধান রাস্তা। প্রতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা রাস্তা পাকাকারণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার পর রাস্তা পাকা করা হয়না।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের সিংহভাগ ভোট নৌকার। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও রাস্তাটি পাকাকরণ না হওয়াটা হতাশার।’

তিলপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সানেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা বিবেকানন্দ দাস বিবেক বলেন, ‘রাস্তাটি সরু এবং নিচু হওয়াতে দীর্ঘদিন থেকে পাকা হচ্ছে না। এজন্য বর্ষা মৌসুম এলেই স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। তিনি বলেন, সরকারি টাকায় বারবার মাটির কাজ হলেও রহস্যজনক কারণে রাস্তাটি আগের মতোই রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় এমনটি হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।’

জানা যায়, উলুউরি কাচা রাস্তা পাকাকরণে ইতোমধ্যে দু’বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু প্রস্থ ১০ ফুটের স্থলে ৮ ফুট হওয়াতে দু’বারই টেন্ডারে কোন ঠিকাদার অংশ নেয়নি। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন রাস্তায় মাটি ভরাট করা। স্থানীয় এলাকাবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদ এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এলে উলুউরিবাসীর দীর্ঘদিনের দুঃখ লাঘব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাটিজুরা-মালপাড়া রাস্তা দিয়ে কাদা মাড়িয়ে কোমলমতি ছাত্রীরা চলাচল করছেন

দৃশ্য-২: তিলপাড়া ইউনিয়নের মাটিজুরা-মালপাড়া ভায়া পীরেরচক বাজার রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ যাতায়াত করেন। আগে পিছে পাকা সড়ক হলেও মধ্যখানে এক কিলোমিটারের বেশি রাস্তা এখনো কাচা রয়েছে। এজন্য এলাকার মানুষ এ মুহূর্তে বিয়ানীবাজার উপজেলা সদরের সাথে যানবাহন নিয়ে চলাচল করতে পারছেন না। এমনকি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই রাস্তায় অধিক কাদা হওয়াতে পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এরপরও বিকল্প পথ না থাকায় সাধারণ মানুষকে এ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

জানা যায়, মালপাড়া গ্রামের কাচা এ রাস্তার পাশে পঞ্চগ্রাম শাহী ঈদগাহ, হযরত শাহজাজাল (রহ.) দরগাহ মসজিদের ইমাম মরহুম হযরত মাওলানা আকবর আলী প্রতিষ্ঠিত কওমী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা অবস্থিত। এছাড়া এ রাস্তা ব্যবহার করে প্রতিবেশি কয়েক গ্রামের শিশু-কিশোর মাটিজুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাটিজুরা নিম্ন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। এখন স্কুল বন্ধ হওয়াতে ছাত্রছাত্রীরা অনেকটা বিপদমুক্ত থাকলেও বিভিন্ন বয়সের মানুষ কাদার মধ্যে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করছেন।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা ছিল, তিলপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এ রাস্তা সংস্কারে ভূমিকা রাখা হবে। কিন্তু টাকা বরাদ্দ না করায় এলাকার মানুষ হতাশ হয়েছেন। এরপরও বর্ষা মৌসুমে রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের কষ্ট লাঘবে স্থানীয় জনগণ দু’লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে মাটি ভরাট করেন।

এলাকার উদ্যমী যুবক সমাজসেবি আমিনুল হক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সরকার যথেষ্ট উন্নয়ন করেছে। এরপরও নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ মাটিজুরা-মালপাড়া রাস্তা পাকাকরণ না হওয়াটা দুঃখজনক।’

আওয়ামী লীগ নেতা করিম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে এ ইউনিয়নের প্রায় সবক’টি রাস্তা পাকা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আন্তরিক হলে এতোদিনে এ রাস্তাটিও পাকা হয়ে যেত। তিনি দ্রুত এ রাস্তা পাকাকরণে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।’

তিলপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমার অবস্থান থেকে রাস্তাঘাটের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছি। আশা কারি কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতি হলে রাস্তা পাকাকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব।

এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রকৌশলী হাসানুজ্জামান বলেন, রাস্তাঘাটের উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। কিন্তু উলুউরি ও মালপাড়া রাস্তার অবস্থা কেমন তা আমার জানা নেই। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ দু’টি রাস্তা পাকাকরণ করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনব।

সার্বিক বিষয়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বলেন, তিলপাড়া ইউনিয়নের উন্নয়নে আমার বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রায় সকল সমস্যার সমাধান আমি করেছি। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস কেটে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনা করে উলুউরি রাস্তার সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের চেষ্টা করা হবে। এছাড়া, মালপাড়া রাস্তা পাকাকরণের ব্যাপারেও বাস্তবিক পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন সাবেক মন্ত্রী নাহিদ। তিনি বর্ষা মৌসুমে সবাইকে ধৈর্য্যরে সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহ্বান জানান। সূত্র: দৈনিক সিলেটের ডাক

 




 

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :