Saturday, 18 September, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




পরিজায়ী নাপিত বদরুদ্দিনের ৩-কাল !

জাহাঙ্গীর হোসেন: ক’বছর আগে মৃত মায়ের দেয়া উপহারে একটা গাড়ি কিনেছিলাম, এমন কথা আমার ফেসবুক পাঠক বন্ধুরা অনেকেই কমবেশি জানেন। বছর পূর্তি হওয়াতে গতকাল ঢাকার BRTA-তে গিয়েছিলাম গাড়ির ট্যাক্সটোকেন-ফিটনেস সংক্রান্ত কাজ নবায়ণ করতে। লাইনে অনেক ভীড় থাকাতে কিউতে গাড়ি রেখে চা-খেতে এলাম BRTA-র ফুটপাতে।

রাস্তার চায়ের দোকানের পাশেই ৮৩-বছরের ঘোলাটে চোখের বুড়ো নাপিত ভাঙা চেয়ার আর চুল কাটার অনাধুনিক সেকেলে যন্ত্রপাতি নিয়ে বসে আছে খদ্দেরের আশায়। চায়ের কাপ শেষ করে, কথা বলতে চাই্লাম, বুড়ো নাপিতের সাথে। ৩০-টাকায় চুল কাটে সে, আর সেভ করে ১০-টাকায়।

আমায় মিনতি করলেন করুণ চাহনিতে, ‘চুল কাটবেন বাবা’? গ্রামে নাপিতের কাছে উঠোনে পিঁড়িতে বসে চুল কাটতাম কৈশোরে। শহুরে হওয়ার পর সাধারণত সেলুনেই চুল কাটি আমি এক দেড়শ টাকায়। ঢাকায় ফুটপাতে কখনো কাটিনি। বসুন্ধরায় ১০০-টাকা সেলুনে নেয় এখান।

অভিজাত সেলুনে ২০০/৩০০ টাকাও নিয়েছিল ২/১ বার। অস্ট্রেলিয়া একবার চুল কেটে বাংলাদেশি দেড় হাজার টাকা দেয়ার শোক অনেকদিন ছিল আমার। বৃটেনের প্লি-মাউথে চুল কেটেছিলাম ৫-পাউন্ডে একবার। তো কেন যেন ইচ্ছে হলো, ৩০-টাকা দিয়ে চুল কাটি আজ এখানেই। এবং সত্যি ইটের পায়ার ভাঙা চেয়ারে বসলাম চুল ছাটাতে বুড়ো নাপিতের কাছে।
:
সতর্ক করলাম বুড়ো নাপিতকে আমার চুল যেন খারাপ না হয়। আমি কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, ঢাকার শেরাটন, কোলকাতার পিয়ারলেস ইত্যাদিতে চুল কেটেছি। তালি দেয়া ভাঙা চশমার ফাঁকে বুড়ো বললো, “খারাপ হবে না বাবা, ভাল আর যত্ন করে কাটবো”! চুল কাটতে হাত খুব কাঁপলো বুড়োর। বললো, “বয়সের ভারে হাত কাঁপে এখন কিস্তু সতর্ক আমি খুব।

চুল খারাপ হবে না বাবা”! ভাষাতত্ত্বে পড়া আমার ভাষা বুঝতে প্রবলেম হলোনা বুড়োর। বললাম, ‘কাকা আপনার বাড়ি কোন জেলাতে? ভাষাতো কেমন কেমন যেন মনে হচ্ছে’? বুড়ো নাপিত বললো, ‘মিরপুর জেনেভা ক্যাম্প মানে বিহারি কলোনির বাসিন্দা আমি। বাবার সাথে ভারত বিভাগের সময় ১৯৪৭-এ বিহার থেকে পাকিস্তান চলে এসেছিলাম আমরা’।

বললাম, ‘চাচা আমার বাবাতো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু আপনারাতো ছিলেন পাকিস্তানপন্থী রাজাকার’। লজ্জিত হলো বুড়ো নাপিত। অনুশোচনা আর কিছুটা ভীত হয়ে বললো, ‘বাবা আমরা কাউকে হত্যা করিনি। আসলে মুসলমান হিসাবে পাকিস্তানকে ভাল মনে করেছিলাম কিন্তু সেটা ভুল ছিল আমাদের’।
:
বুড়োকে নির্ভয় দিয়ে বলি, ‘থাক চাচা ওসব বাদ দিন। এখন কেমন আছেন বলুন’? এবার সত্যি ক্লেদাক্ত হলো চাচার চোখ। আরো হাত কাঁপতে থাকলো তার। চুল কাটা প্রায় অসম্ভব হলো এবার তার জন্যে। কাঁপতে কাঁপতে বলে, “ভাল নেই বাবা।

প্রায় ৪৮-বছর একটা ছোট খুপড়িতে ৫-জন মানুষ থাকি। ভারতে ছেড়ে এসেছি বলে পৈত্রিক ভিটেতেও ফিরে যেতে পারিনি আর। বেইমান পাকিস্তানের পক্ষে ছিলাম আমরা কিন্তু তারাও আর নিলোনা আ্মাদের। বরং বাংলাদেশের মানুষ ভাল বলেই, তারা এতো বছর এদেশে থাকতে দিয়েছে আমাদের”।

এমন সরল স্বীকারোক্তিতে এবার সত্যি মনটা গললো আমার। বিহারী পাকিস্তানী নয়, আটকে পরা মানুষ হিসেবে বুড়োর জন্যে মন কাঁদলো আমার। বললাম – “চাচা ৪৮-বছর একই ঘরে থাকছেন আপনারা? আপনার ঘর দেখতে মন চাইছে আমার। আপনার ঘরে যেতে চাইলে নেবেন আমায়”?
:
গাড়ির সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে আরো দেড় ঘণ্টা লাগলো। ফিরে এসে বললাম, ‘চলুন চাচা আপনার ঘরে যাবো’। দুপুরের খাবার খেতে কখনো কখনো ঘরে যায় বদরুদ্দিন নামের বুড়ো নাপিত। আমার অনুরোধে আমার গাড়িতে বসিয়ে কালশি কালাপানি হয়ে গাড়ি ঢুকে গেল একদম মীরপুর বিহারী ক্যাম্পে।

ঘরে ঢুকেই বিস্ময়ে হতবাক হলাম আমি। মাত্র একটি কক্ষই বরাদ্দ করা হয়েছে ১৯৭২-সনে এসব হতভাগ্য পরিবারগুলোর জন্যে। এরপর ঘরগুলো আর কোন মেরামত হয়নি। নিজেদের চেষ্টায় নানাস্থানে জোড়াতালি দেয়া। একটা মাত্র ৬০-পাওয়ারের সেকেলে বিজলী বালব ও একটা ইলেকট্রিক পুরনো পাখা। ছোট জানালা দিয়ে বাতাস খুব কমই ঢুকতে পারে এ বস্তির ঘরে।

গণ টয়লেট সবার জন্যে। ৩-সন্তানের মাঝে মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল এ ক্যাম্পেই। ২-ছেলে বাঙালি বিয়ে করে মিশে গেছে তাদের সাথে। অভাবের সংসারে মা বাবাকে দেখার সুযোগ হয়না তাদের। প্রায় ৭০-বছরের স্ত্রী সাফিয়া ছাড়াও, ৪০ বছরের বিধবা কন্যা আয়েশা থাকে তার প্রতিবন্ধ্বী মেয়েকে নিয়ে মা বাবার সাথে এ কক্ষটিতেই।
:
ভেতরে ঢুকে কোথায় বসবো বুঝতে পারছিলাম না আমি। এ পথে অনেকবার গেলেও কখনো ঢুকিনি এ বস্তিতে। এ বিহারী পরিবারটির দুর্দশা দেখে বস্তুবাদি মানুষ হিসেবে আমার চিন্তন আর স্বপ্নেরা একাকার হয় এ দু:খযন্ত্রণার হাঁটে। গাঁ থেকে আনা ড্রাইভার ছেলেটাকে ৫০০-টাকার নোট দিয়ে পাঠাই কালশি থেকে দুপুরের খাবার কিনে আনতে। সে নান-রুটি, গ্রিল মুরগি আর ঠান্ডা পানীয় নিয়ে ফিরলো ১০-মিনিটের মাথায়। ততক্ষণে পাশের আরো ৩-টা ঘর দেখে ফেলি আমি। বিহারী নাপিত বদরুদ্দিন, স্ত্রী সাফিয়া, কন্যা আয়েশা আর তার অটেস্টিক কন্যার সাথে এক অপরিচ্ছন্ন আলোহীন ঘরে দুপুরের খাবার খাই ভাললাগার বিস্ময়কর পরমানন্দে!

জাতিসংঘ ত্রাণ থেকে মাসে কিছু গম-চাল পায় এ পরিবার সাহায্য হিসেবে। তারপরো স্ত্রী, কন্যা আর অটেস্টিক নাতনিকে বাঁচাতে ৮৩-বছরের বদরুদ্দিন এখনো নাপিতের কাজ করে ঢাকার ফুটপাতে।
:
দেশহীন গোত্রহীন সুখহীন ভালবাসাহীন বদরুদ্দিন পরিবারের দু:খের বানভাসিতে গলে যায় আমার জীবনের মোমফুলেরা জ্বলে জ্বলে! পুড়তে থাকি আমি ক্রমাগত এদের দু:খজীবনের হাঁটে। এখনো এ ৮৩-বছর বয়সি বিহারের নিমশ্রী গাঁয়ের মুসলিম বদরুদ্দিন যে সুখ অন্বেষণে চলে এসেছিল এক কল্পিত মুসলিম “পাক” ভূমিতে, সে পাক ভূমি “অপবিত্র” করেছিল ওদের বাঙালির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে।

আর এতো বছর সুখ খুঁজে খুঁজে বন বনান্তরে ক্লান্ত বদরুদ্দিনরা কেবল সর্বনেশে মেঘের ঘরে জমে থাকা ধুলোঝেড়েই কাল কাটিয়েছে অনেকগুলো বছর। কখনো পৌঁছতে পারেনি অভিমানে পুষ্ট উদ্ভেলিত বক্ষের সুউচ্চ সুখের শিখর চূড়োয়। বস্তি জীবনের নিক্ষেপিত উষ্ণতার গহনে জীবন থেকে জীবনে, দেশ থেকে দেশান্তরির এই যে চলমানতা, তা আর শেষ হয়নি কখনো।
:
এবার উঠে দাড়াই আমি বদরুদ্দিনের শুকনো কাঁপা হাত ছুঁয়ে। তৃষা নিবৃত্তির সৌমতায় ছড়িয়ে দেয়া বোধেরা আঁকড়ে ধরে আমায় বদরুদ্দিনের বস্তি ঘরে। সুপ্ত পুরণো কষ্টপাখিরা আর হৃদপিন্ডের ভিতরের ঝর্ণারা একসাথে বইতে শুরু করে আবার। যে ঝর্ণার জলে ভালবাসার সাতমহলের মালিণিরা ফুল ভাসিয়ে দেয় আকাশ দেবতার অর্ঘ হিসেবে।

যা কখনো ছুঁতে পারেনি নাপিত বদরুদ্দিন, বিহার পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে পরিজায়ী এ সকল বদরুদ্দিনদের! দেশহীন, নাগরিকত্বহীন, পরিচয়হীন বুড়ো নাপিত বদরুদ্দিনের জীবন যন্ত্রণা ও এর কষ্টবাতাসে ভেসে ভেসে আমি উড়তে থাকি ঢাকার ক্লেদময় আকাশে! জানিনা এসব বদরুদ্দিনদের দু:খহাটে আর কত হাঁটবো আমি!

 




 

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :