Wednesday, 4 August, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




তেজবান মনখোলা লুৎফুরকে রোগ কাবু করতে পারবে না — জাহেদ আহমদ

আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ অসুস্থ। বিয়ানী বাজারের মানুষ একনামে তাঁকে চিনেন। লুৎফুর রহমান খান। মাথিউরা ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান। নব্বই -এর দশকে বয়স `বিশের কোটায়’ পৌঁছানোর আগেই বিপুল সংখ্যক ভোটে উনি কনিষ্ঠতম ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এক সময় জাসদ ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। তুখোড় ছাত্র নেতা ছিলেন।

তবে এসব পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয় তাঁকে মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছে তাহল ইনি অত্যন্ত বড় হৃদয়ের একজন মানুষ। আপনি যদি বাঙলা ভাষী হোন, আর পাঁচ মিনিট এই ভদ্রলোকের সাথে আলাপ করেন, তাহলে আপনি নিজের অজান্তে হলে একবার হলে ও স্বগতোক্তি করতে বাধ্য হবেন, অসাধারণ এক মানুষ!

সুপুরুষ বাঙালীর কেতাবি সংজ্ঞা আমার জানা নেই, কিন্তু শারীরিক গঠন, বাগ্মীতার সাথে যদি যোগ করি মানুষের সাথে মধুর ব্যাবহার আর শিষ্টতা তাহলে লুৎফুর রহমান সত্যি অসাধারণ একজন বাঙালি।

কথায় ফিটফাট মানুষের সবাই বাস্তব জীবনে চলনে-আচরনে ফিটফাট নয়। লুৎফুর রহমান খান বাস্তব জীবনে ও একজন সলিড মানুষ।

২০০০৮ সালের কথা। আমি কয়েকমাস এস্টরিয়াতে তাঁর সাথে তখন থাকতাম।

“ভাইগ্না, অত সখাল ঘুমাইগেলায় নি?” আমার মত তাঁর গলা ও চড়া। কাজে শেষে বাড়ি ফিরে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেন তিনি। খেয়ে শুয়েছি কিনা জিজ্ঞাস করেন।

তিনি আমার আপন মামা নয়, প্রাইমারী স্কুলের সহপাটি হেলিমুল হকের মামা। আমি মামা ডাকি। “চেয়ারম্যান” ডাকেন অনেক মানুষ নিউ ইয়র্কে ও তাঁকে।

৩৬ এভিন্যুর গ্রোসারী দোকানদার কুমিল্লার কামাল আহমদ একবার আমাকে আরেকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন “আমাদের চেয়ারম্যান সাহেবের ভাগিনা”। আমার তখন মনে হয়েছে আমি চেয়ারম্যান মাও সেতুঙের ভাগ্না।

আমার আপন মামাদের সাথে ও জীবনে এত প্রাণ খুলে কথা বলিনি, আড্ডা দেইনি যতবার উনার সাথে দিয়েছি। অন্যান্যদের সাথে সেসব আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন ছোট দেশের গোলাম মর্তুজা ভাই (প্রাক্তন সভাপতি, সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়ন), গোলাটিকরের ইসলাম উদ্দিন স্যার (স্পেশাল এড টিচার, নিউইয়র্ক বোর্ড অব এডুকেশন )। নিউ ইয়র্ক লাইফের অন্যতম মধুর স্মৃতি আমার জীবনে এসব আড্ডা।

একবার বাউল সাধক লালনের জন্ম দিবসে মামা বললেন, ভাইগ্না, সাঁইজির স্মরনে চলো নিজেরা মিলে একটা অনুষ্ঠান করি। তথাস্তু, আমি বললাম । আমরা মামা ভাগ্না মিলে ঘরের কাছেই একটা বাংলাদেশী রেসটুরেন্টের বেসমেন্টে একটু বাদ্য বাজনার আয়োজন করলাম। আমি ঘরে আমার ডেস্কটপে কয়েকটী পোস্টার বানালাম। নাম দিলাম “আউল বাউল লালন সন্ধ্যা।” মামা-ভাগ্না মিলে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করলাম।

লুৎফুর মামা প্রচণ্ড পড়তে ভালবাসেন।

নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালান বেশ কয়েক হাজার বাঙালি কিন্তু আমার একুশ বছরের আমেরিকার জীবনে আর কোন বাঙালি টাক্সি চালক দেখিনি যিনি বাইরে থেকে প্রায় দিন ঘরে ফেরেন নতুন পুরানো হরেক পদের বই নিয়ে। অন্যদের মত ইনি বই কেবল তাকে সাজিয়ে রাখেন না, এগুলি ঘাঁটাঘাঁটি করেন ফরজ নামাজ পড়ার সমান গুরুত্বে। আমার সংগ্রহের কিছু বই উনি হাতে নিয়ে বললেন, ভাইগ্না, তোমার তো দেখি সোনার খনি!

আমি মনে প্রাণে আশা করছি, চেয়ারম্যান লুৎফুর মামা শিগগির সুস্থ হয়ে ওঠবেন। তাঁর মত তেজবান, মনখোলা মানুষকে কোন রোগ এটাক করে কাবু করতে পারবে না।

(লেখাটি জাহেদ আহমদ এর ব্যক্তিগত ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া)

 

Developed by :