Monday, 17 May, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ |




আমাদের বাতিঘর অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া — মো. কবির খান

মো. কবির খান

১৯৭৯ সাল। আমি তখন ১৪ বছর বয়সের জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একজন ছাত্র।হঠাৎ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আজির উদ্দিন স্যার ও বাংলা বিষয়ের স্যার জনাব নৃপেন্দ্র কুমার দাস ১ম ঘন্টায় শ্রেণিতে উপস্হিত হয়ে বললেন বিদ্যালয়ের SMC এর সভাপতি জনাব আমির উদ্দিন (সাবেক ১১ নং লাউতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান) কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। এখানে সিনিয়র ও জুনিয়র দুটি গ্রুপ থাকবে। সমস্ত উপজেলা থেকে বিতর্ক টীম আমাদের স্কুলে আসবে। বিদ্যালয়ে সাজ সাজ রব সুতরাং আমাদের স্কুল থেকে জুনিয়র গ্রুপে একটি টীম দেওয়া প্রয়োজনহেতু আমাকে টীম লিডার দিয়ে একটি টীম গঠন করা হলো।টিমের সদস্যরা হলেন (১) মোঃ কবির খান (দলনেতা) (২) আশীষ ভট্টাচার্য্য ( বর্তমানে হল্যান্ড প্রবাসী) (৩) মোঃ আনোয়ার হোসেন (আমেরিকা প্রবাসী)। জুনিয়র গ্রুপের বিষয় ছিল “অর্থই সকল অনর্থের মূল”। সিনিয়র গ্রুপে ছিল কলেজের ছাত্ররা। তাদের বিষয় ছিল “চরিত্রই মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ”।

বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের জন্য যথারীতি প্রস্তুতি নিতে থাকি এবং নির্ধারিত দিনে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে সমগ্র উপজেলায় জুনিয়র গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হই।

সিনিয়র গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয় বিয়ানীবাজার ডিগ্রি কলেজর (বর্তমানে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ) মোঃ গোলাম কিবরিয়া তাপাদারের নেতৃত্বে গঠিত টীম। ঐদিন প্রথম কিবরিয়া ভাইয়ের সাথে দেখা এবং পরবর্তীকালে ছোট ভাই হিসেবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল প্রায়ই নিয়মিত।

১ম দিন কিবরিয়া ভাইয়ের তুখোড় বক্তব্য আমাকে সহ উপস্থিত সকলকে আকর্ষণ করেছিল। সেই থেকে আমি তাহার বক্তৃতা শোনার একজন ভক্ত হয়ে গেলাম। আমি যে ছাত্র সংগঠন করতাম” বাংলাদেশ ছাত্রলীগ” তিনি ছিলেন “বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের” একজন তুখোড় ছাত্রনেতা। ভিন্ন ভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মী হলেও রাজনীতি ছাড়া সকল দিকে ছিল বড় ভাই ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক।

বিরল প্রতিভার অধিকারী, কিবরিয়া ভাইকে যখন ব্ক্তৃতা দিতে দেখতাম অন্য সংগঠনের কর্মী হয়েও তার বক্তৃতা শোনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিবরিয়া ভাই যখন তাত্বিক বক্তৃতা দিতেন তখন শ্রোতারা পিনপতন নীরবতা পালন করতেন। পরিচয়ের সূচনালগ্নথেকে দেখেছি তিনি একজন ভাল বক্তা এবং সেকালের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একজন ছাত্রনেতা হিসেবে সমস্ত বিয়ানীবাজার বাসীর নিকট পরিচিত ছিলেন। কিবরিয়া ভাই সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের একটি বিশিষ্ট নাম, যে নামটি উচ্চারিত হলে তিনি কে? এ প্রশ্ন করার মতো কেউ শিক্ষিত সমাজে আছেন কিনা সন্দেহ। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, দেশ বিদেশে সুনাম ও সম্মান তিনি একদিনে অর্জন করেননি। অর্ধ শতাব্দীর বিরামহীন একাগ্র সাধনা তাকে সম্মানের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

সুদর্শন কিবরিয়া ভাইকে দেখেছি একজন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের তুখোড় নেতা হিসেবে,দেখেছি ছাত্র সংগ্রামে,দেখেছি জীবন সংগ্রামে,দেখেছি ছাত্রদের দাবী আদায় করতে ধৈর্য ধারণ করে এগিয়ে যেতে, দেখছি সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে,দেখেছি একজন পরিশ্রমী ও সৎ ব্যাংকার হিসেব, দেখেছি একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে, দেখেছি একজন দক্ষ অধ্যক্ষ হিসেবে, দেখেছি সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সুদক্ষ চেয়ারম্যান হিসেবে।

কিবরিয়া ভাই দেশের জন্য, মানুষের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা দিতেন। তার স্নেহ, আদর,গভীর ভালবাসা দিয়ে আমার সকল কষ্ট, বেদনা, দুঃখ কেমন করে যেন জুড়িয়ে দিতেন। বেশ কয়েকদিন তাকে যখন অসুস্হ দেখতে গিয়েছি হাসি মুখে কাছে নিয়ে বসিয়ে কেমন আছো কি করছো জিজ্ঞাসা করে জানতেন কে কি করে?

কিবরিয়া ভাই! আমাদের সকলের প্রিয় ভাই আজ অসুস্থ হয়ে ঘরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি যে কোন মানুষের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। তার অপূর্ব অচিন্তনীয় স্মৃতি শক্তির চমৎকারিত্বে সবসময় মুগ্ধ হয়েছি। কাউকে তিনি একবার দেখলে বা কারো সাথে যোগাযোগ হলে মনের অন্তঃস্থলে স্হান দিতেন একেবারে ফটেগ্রাফির মতো স্হায়ীভাবে। আমরা সকলেই ভাবতাম তার হৃদয় কতটা বড় যে সকলেরই সমান স্হান হতে পারে তার হৃদয়ে।সাহস, আন্তরিকতা,অব্যাহত কাজ করা,পরম সহিষ্ণুতা, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এসবই ছিল তার প্রতিদিনের পথ চলার সম্পদ। তিনি ছিলেন বলিষ্ট স্হির,প্রতিজ্ঞায় অটুট, নির্ভিক, নিরলস, আস্হাশীল ভালবাসার প্রতীক একজন সর্বংসহা ব্যক্তিত্ব।তার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ঠ্যে আছে ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতা। তিনি বৈরী কোন পরিস্থিতিতে আপোস করেননি, পিছিয়ে থাকেননি, সতত তিনি এগিয়েছেন।

কিবরিয়া ভাই আমাদের বাতিঘর। বাতিঘরের আলোয় গভীর সমুদ্রে পথ হারানো মানুষ যেভাবে পথের দিশা পায় তিনিও আলোহীন মানুষকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতেন। আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া তাপাদার প্রতিনিয়ত তার কর্মের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখাতেন মানুষকে।

তিনি শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীর নিকট খুবই জনপ্রিয় স্যার ছিলেন।একজন ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনে “স্যার” খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিক শিষ্যদের কাছে মুর্শিদ যেমন শিক্ষকও তার কাছে তেমনি তার আশ্রয়,পথ নির্দেশদাতা এবং তার মনোজগতের চিরন্তনতার প্রতীক। চারপাশের সবকিছুর মধ্যেই ঐ সময় সে তার ঐ আকাংখিত ধ্রুবকে প্রত্যাশা করে শিক্ষকের কাছে। শিক্ষককে সে একটা অবিচল অপরিবর্তনীয় সত্তা হিসেবে দেখতে পায়। এতে তার আত্মার জোর আসে। হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাণের স্পন্দন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া তাপাদার। ক্ষুদ্র এলাকায় বিশাল চিত্তের একটা বহুমাত্রিক ও নন্দিত ব্যক্তিত্ব তিনি। উপস্থাপক, সংগঠক, লেখক, বক্তা, সাহিত্য সমালোচক সর্বোপরি শিক্ষক কত অভিধায় তাকে অভিহিত করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে আমি অনেক ঋনী।

তিনি একজন সফল মানুষ কিন্তু দুঃখ হয় পরিপূর্ণ সার্থক হওয়ার সময়টা তিনি পেলেন না। অবসর জীবনে ঘরে থেকেও তিনি আজ আমাদের কাছে থাকতে পারছেন না। তার চিন্তা ধ্যান বা জ্ঞান আমাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারছেন না। বেঁচে থেকেও তিনি আমাদের মধ্য থেকে অনেক দূরে। দুরারোগ্য ব্যাধি তার সুন্দর জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে। তিনি যেন সুস্হ হন সুস্হ থাকেন দুরাশার মাঝেও আশার প্রতিক্ষায় রইলাম।তাহার জন্য সবাই দোয়া করবেন। নিরাশ হওয়ার কিছু নেই হয়ত সুস্হ হয়ে আবারও ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে তুখোড় বক্তা হিসেবে।

লেখক: প্রধান শিক্ষক, সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।

 

Developed by :