Thursday, 3 December, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




বিদেশে বসে দাদাগিরি

সন্ত্রাসীরা ফোনেই চালিয়ে যাচ্ছে অপকর্ম, করছে চাঁদাবাজি

আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে খুন, অস্ত্র, ডাকাতিসহ এক ডজন মামলার আসামি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মো. ইসমাইল ওরফে পিস্তল ইসমাইল। ফেরারি অবস্থায় নাম পাল্টে জাল পাসপোর্ট তৈরি করে দেশ থেকে পালিয়ে যায় কাতারে। কাতারে গিয়ে সন্ত্রাসী ইসমাইল বনে গেছে মোহাম্মদ আলমগীর (পাসপোর্টে ভুয়া নাম)! বিদেশে বসবাস করলেও বন্ধ হয়নি তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ফোনেই চালিয়ে যাচ্ছে সব অপর্কম। কাতারে বসেই দাদাগিরি করছে চট্টগ্রামে।

৮ সেপ্টেম্বর চাঞ্চল্যকর জিল্লুর ভাণ্ডারি হত্যা মামলার দুই সাক্ষী রশিদ আহম্মদ বাচা ও মো. ইকবালকে সাক্ষী না দিতে বিদেশে বসে ৯৭৪৩০৬৪৩৬৩১ নম্বর থেকে ফোন করে সরাসরি খুন করার হুমকি দেয়। পেশাদার এ অপরাধীর বিরুদ্ধে আছে চাঁদাবাজির বহু অভিযোগও।

দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক এইট মার্ডার মামলার প্রধান আসামি দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ কিছুদিন পরপরই ভারত ও কাতার থেকে ফোনে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে চট্টগ্রামে। নগরীর মুরাদপুর ফরেস্ট গেইট এলাকার হাসিনা মঞ্জিলের মালিক হাসিনা বেগমকে ৮ সেপ্টেম্বর সাজ্জাদ ফোন করে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে তার বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়ে স্বামী ও মেয়ের জামাইকে খুন করবে বলে হুমকি দেয়। হুমকি দেওয়ার পর শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের সহযোগী দিদারসহ দুই সহযোগী হাসিনা মঞ্জিলে হানাও দেয়।

বিদেশে বসে সাজ্জাদও দাদাগিরি করে যাচ্ছে চট্টগ্রামে। এ দুই সন্ত্রাসীর মতো রেলওয়ে সিআরবিতে ডাবল মার্ডার মামলাসহ এক ডজন মামলার আসামি যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর দুবাইতে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে অপরাধজগৎ। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী নিহত হওয়ার পর বাবর গোপনে বিদেশে পাড়ি জমায়। গত ৩ সেপ্টেম্বর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বাবরের বিরুদ্ধে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. আইয়ুব আলী নগরীর খুলশী থানায় জিডি করেন। এর আগে ২৬ আগস্ট বাবরের বিরুদ্ধে এক কোটি ২৬ লাখ টাকার একটি প্রাডো জিপ আত্মসাতের অভিযোগ এনে রেলওয়ের ঠিকাদার মোহাম্মদ শাহ আলম সদরঘাট থানায় অপর একটি জিডি করেন। বাবর ৯৭১৫২৩৭৮২৮২৫ নম্বর থেকে ফোন করে।

একইভাবে কাতারে বসে শিবির ক্যাডার নুরনবী ম্যাক্সন ও সারোয়ার চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ আছে। চাঁদাবাজির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কাতারে মারামারির ঘটনার পর কাতার পুলিশের তৎপরতায় দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয় সারোয়ার। দেশে ফিরলেই ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হয় সে। তবে কাতারে বসে ম্যাক্সনের সঙ্গে এক হয়ে চট্টগ্রামের বায়েজিদ-পাঁচলাইশ ও অক্সিজেন এলাকায় নীরব চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে যুবলীগ ক্যাডার ইমতিয়াজ সুলতান একরাম।

এ পাঁচ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।এ প্রসঙ্গে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, হাসিনা মঞ্জিলের মালিক বিদেশে থেকে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ চাঁদাবাজি ও খুনের হুমকি দেওয়ার বিষয়ে একটি জিডি করেন। তদন্তে নেমে দিদারসহ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করি। বিদেশ থেকে আসা ফোন নম্বরগুলো নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।

নগরীর সদরঘাট থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আহমেদ কিরণ বলেন, বিদেশে অবস্থান করা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের বিরুদ্ধে শাহ আলম নামের এক ব্যক্তি একটি জিডি করেছেন। তদন্ত অফিসার তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার পরিত্রাণ তালুকদার জানান, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে শিবির ক্যাডার সারোয়ার ও ম্যাক্সন এবং কথিত যুবলীগ নেতা একরামের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তারা কাতারে বসে সন্ত্রাসীদের দিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চাঁদাবাজি করাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।

বিদেশে বসে দাদাগিরি করা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ:

ভারতের পাঞ্জাব ও দুবাইতে বসেই চট্টগ্রামে নীরব চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেন খান। ২০১৯ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভারত হয়ে কাতারে চলে যায় তার দুই সহযোগী সন্ত্রাসী সারোয়ার এবং নুরনবী ওরফে ম্যাক্সন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় যুবলীগ ক্যাডার একরামও। তারা বিদেশে বসে চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মারামারির পর চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরতে বাধ্য হয় সারোয়ার। তবে ম্যাক্সন, একরাম ও সাজ্জাদ এখনও কাতারে রয়েছে।দুই ব্যবসায়ী থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ পেয়ে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নগরীর ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে অস্ত্রসহ পাঁচ সন্ত্রাসী রুহুল আমিন, তুহিন, সুজন, জাবেদ ওরফে ভাগিনা জাবেদ ও রনি গ্রেপ্তার হয়। চাঁদা না পেয়ে নয়াহাটে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে পেট্রোল বোমাও নিক্ষেপ করেছিল তারা।

এ ছাড়া ব্যবসায়ী উজ্জ্বল দেওয়ানজী থেকে শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের নামে টাকা দাবির অভিযোগ পায় পুলিশ। এ অভিযোগের তদন্তে নেমেও পুলিশ জানতে পারে সারোয়ার, ম্যাক্সন ও একরাম কাতারে অবস্থান করে বায়েজিদের রুহুল আমিনের মাধ্যমে উজ্জ্বলের কাছ থেকে চাঁদা চেয়েছিল। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পূর্ব শহীদনগর এলাকার আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের পাশে মহিউদ্দীন আলম নামে এক কাতার প্রবাসীর বাড়ি নির্মাণ কাজে সাজ্জাদ মোবাইল ফোনে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। সাজ্জাদ ফোনে বাড়িওয়ালাকে বলে, তার দুই অনুসারী ম্যাক্সন ও সারোয়ার কাতারে অবস্থান করছে। তাদের কাতারে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। তবে ওই কাতার প্রবাসী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর কালা মানিক নামে তাদের অপর এক সহযোগী ফোন দিয়ে প্রবাসী মহিউদ্দিন আহমেদের পরিবারকে হত্যার হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর তদন্তে নেমে ঘটনার সত্যতা পায় পুলিশ।

তারপর ১৯ সেপ্টেম্বর আরেক ব্যবসায়ীকে কাতার থেকে ম্যাক্সন ফোন করে চার লাখ টাকা দাবি করে। চাঁদার টাকা দিতে না পারলে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুরে থাকা তার যন্ত্রাংশের দোকান জ্বালিয়ে দেবে বলে হুমকির কথা জিডিতে উল্লেখ করা হয়।অন্যদিকে রেলওয়ের ঠিকাদার শাহ আলম জিডিতে উল্লেখ করেন, তার সোয়া কোটি টাকা দামের একটি প্রাডো জিপ আত্মসাৎ করে যুবলীগের হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর।

ভুক্তভোগীদের বক্তব্য:

হাসিনা মঞ্জিলের মালিক হাসিনা বেগম বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৩টায় সাজ্জাদ পরিচয়ে আমাকে ফোন দিয়ে অশ্নীল ভাষায় গালাগাল করা হয়। তিন দিনের মধ্যে দেড় কোটি টাকা তার পাঠানো লোককে দেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। টাকা না দিলে আমার স্বামী এবং মেয়ের জামাইকে খুন করবে বলে হুমকি দেয়।জিল্লুর ভাণ্ডারি হত্যা মামলার সাক্ষী মো. ইকবাল ও বাচা বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর মামলার সাক্ষ্য দিতে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির হই। সাক্ষী দিতে এজলাসে ঢুকব, ঠিক তার ১০ মিনিট আগে কাতার থেকে পিস্তল ইসমাইল ফোন করে সাক্ষ্য না দিতে বলে। সাক্ষ্য দিলে জিল্লুরের চেয়েও করুণভাবে তাকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেয়। তার হুমকি ও চাঁদাবাজিতে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। আওয়ামী লীগ নেতা মো. আইয়ুব আলী অভিযোগ করেন, বাবরকে চাঁদা না দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ও চট্টগ্রামছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের পাশাপাশি ফেসবুকেও হুমকি-ধমকি দেয় তারা। সূত্র: সমকাল।

 

Developed by :