Friday, 25 September, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




সফল উদ্যোক্তা দক্ষিণ সুরমার শাহীন

কেঁচো সার উৎপাদনে মাসে আয় দেড় লক্ষাধিক টাকা

ছাদেক আহমদ আজাদ।।

স্বপ্নের দেশ আমেরিকার মোহ তাঁকে আচ্ছন্ন করেনি বরং প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছিল; কৃষিক্ষেত্রে নিত্যনতুন উদ্ভাবন করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় তিনি পোল্ট্রি ফিডের ব্যবসা শুরু করেন। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও এ ব্যবসায় বেশিদিন তাঁর মন টেকেনি। ব্যবসা ছেড়ে কৃষিভিত্তিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাঁটাচলা শুরু করেন। এরপর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। স্বপ্নের উপর ভর করে তিনি এখন প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর মাসিক আয় দেড়-দু’লক্ষ টাকা।

কাহিনী শুনতে গল্পের মতো হলেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রচুর পড়াশোনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করে তিনি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছেন। স্বপ্ন বাস্তবের এ কারিগর হলেন, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার খালেরমুখ এলাকার মো. আব্দুল আহাদ শাহীন। ২০০৭ সালে ৩ রিং দিয়ে শুরু হলেও এখন তাঁর কারখানায় ৩০০ রিংয়ে দৈনিক ৫০০-৭৫০ কেজি কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে। এ সার কৃষি বিভাগ তাঁর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে ক্রয় করলেও খুচরা বাজারে তিনি বিক্রি করেন প্রতিকেজি ২৫-৩০ টাকা। এছাড়া, কেঁচো ও ভার্মি ওয়াশ বিক্রি করে তিনি প্রচুর টাকা আয় করেন। সবমিলিয়ে প্রতি মাসে তাঁর কাছে মুনাফা দাঁড়ায় দেড় থেকে দু’লক্ষাধিক টাকা।

সফল উদ্যোক্তা আব্দুল আহাদ শাহীন ২০০৯ সাল থেকে কৃষি বিষয়ক একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। এমনকি এ উদ্যোক্তা কৃষক বিভিন্ন সময় সিলেট অঞ্চলে কৃষি অধিদপ্তর আয়োজিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) থেকে কেঁচো সার উৎপাদনের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

কৃষি, মৎস্য, জৈব সার ও মাটির উর্বরাশক্তি কিভাবে বৃদ্ধি করা যায়, তা নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করেন আব্দুল আহাদ শাহীন। এজন্য তিনি বাসার একটি কক্ষে গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরি। তাতে স্থান পেয়েছে কৃষিনির্ভর বই-পুস্তক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত জার্নাল। ইতিমধ্যে কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য মধ্যবয়সী এ কৃষক সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসে কৃষিমন্ত্রণালয় তাঁকে ‘সয়েল কেয়ার এ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করে।

গত শুক্রবার সকালে কেঁচো সার উৎপাদনে সফল কৃষক আব্দুল আহাদ শাহীন তাঁর পৈতৃক নিবাস খালেরমুখ এলাকার মনির মঞ্জিলে এ প্রতিবেদকের সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।

গুণি কৃষক আব্দুল আহাদ শাহীন নিজ বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন ‘আমার পৃথিবী’ নামে একটি আধুনিক কৃষি প্রতিষ্ঠান। সেখানে ভার্মি কম্পোস্ট, অর্গানিক এগ্রো ফিসারিজ ও গ্রিণ বায়োগ্যাস ইনোভেটর উৎপাদন করা হয়। তাঁর এ কারখানা থেকে প্রতিদিন পৌণে এক টন নির্ভেজাল কেঁচো সার উৎপাদন হয়। এমনকি প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ঐ সারের কাঁচামাল থেকে বের করা হয় অনেকটা দুর্লভ তরল পদার্থ ‘ভার্মি ওয়াশ’। যা ব্যবহারে গাছপালা, শাকসবজির পোকামাকড় শতভাগ দমন করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে ‘ভার্মি ওয়াশ’ চা গাছে ব্যবহার অনেক ফলদায়ক। এজন্য বাগানে এ তরল পদার্থ ব্যবহারে চা বাগান মালিকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

এছাড়া, কেঁচো সারের পাশাপাশি কেঁচো বিক্রিও করেন তিনি। আবার, কেঁচো সার ফিশারিতে মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করেন কৃষক শাহীন।

কৃষি বিভাগ সূত্রমতে, মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি ও গুণাগুণ বজায় রাখতে কেঁচো সার বেশ উপকারি। এমনকি নার্সারি ও রবিশস্যে এ সার ব্যবহারে কম সময়ে অধিক ফলন হয়। গত কয়েক বছর থেকে সিলেটের প্রায় সবক’টি উপজেলায় কেঁচো সার উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ সার উৎপাদন করে অনেক কৃষক ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। সম্প্রতি কেঁচো সারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সিলেটে তা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন শুরু হয়েছে।

উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা কৃষক আব্দুল আহাদ শাহীন ২০০৭ সালে মাত্র ৩ রিং দিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন। প্রথমে কেঁচো সার শুধুমাত্র কৃষি বিভাগের কাছে বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে এর চাহিদা বাড়তে থাকায় তিনিও রিংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। এ ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় ২০১৪-২০১৫ সালে রিংয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় একশ’। বর্তমানে তাঁর ‘আমার পৃথিবী’ প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্যিকভাবে ৩০০ রিংয়ে কেঁচো সার উৎপাদন হচ্ছে। এ থেকে প্রতি মাসে গড়ে ২০ টন কেঁচো সার বিক্রি করেন তিনি। কাঁচামাল ক্রয়, উৎপাদন মজুরি ও প্যাকেটজাতসহ সকল খরচ শেষে মাসে প্রায় তাঁর দু’লক্ষ টাকা আয় হয় বলে জানান তিনি।

বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত কেঁচো সার

সরেজমিন ‘আমার পৃথিবী’ কৃষি কারখানা ঘুরে দেখা যায়, এখানে কেঁচো সার উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। সচরাচর কৃষকরা শুধুমাত্র গোবর, কলা গাছের টুকরো বা কচুরিপানার সাথে কেঁচো দিয়ে এ সার উৎপাদন করেন। অথচ এখানে, প্রথমে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গোবর থেকে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ‘পেথোজেন’ এবং বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে কচুরিপানা থেকে বিষাক্ত মিথেন দূর করা হয়। পরে গোবর ও কচুরিপানাকে হট কম্পোস্টিংয়ের মাধ্যমে একীভূত করা হয়। এরপর কেঁচো দিয়ে সার তৈরির সময় বের হয় একধরনের তরলজাত পদার্থ ‘ভার্মি ওয়াশ’।

শাহীনের কারখানায় উন্নত জাতের ‘রেড উইগলার’ কেঁচো এবং প্রযুক্তির ব্যবহার হওয়ায় ৩০-৪৫ দিনের স্থলে মাত্র ১৫-২০ দিনে কেঁচো সার উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এছাড়া, পলিস্টারের বস্তা ও প্লাস্টিকের ক্যারেটে কেঁচো সার উৎপাদন হয় কি-না, তা নিয়ে শাহীনের কারখানায় গবেষণা কার্য চলতে দেখা গেছে।

জানা যায়, গোবরের পরিমাণ যতো এর এক তৃতীয়াংশ কেঁচো সার উৎপাদন হয়। এমনকি গোবর প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় এ থেকে উৎপাদিত সার শতভাগ নির্ভেজাল এবং গুণগত মানের দিক দিয়েও ভালো হয়। শাহীনের কেঁচো সার উৎপাদনের তারিখ থেকে এক বছর ব্যবহার উপযোগী, প্যাকেটের গায়ে এ তথ্য লেখা রয়েছে। যদিও এ সার দু’বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জৈব সার কারখানার উন্নয়নে এ পর্যন্ত ১২ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। বাড়ির সম্মুখভাগে তিনি আধুনিকমানের আরও একটি কেঁচো সার উৎপাদন কারখানা করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন।

শাহীনের এ সাফল্যে বেশ উৎফুল্ল প্রতিবেশী বাড়ির এডভোকেট কবির আহমদ। তিনি জানান, তাঁর এ কর্মকান্ডে গ্রামবাসী উৎসাহী হয়ে গোবর ও কচুরিপানা দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।

‘আমার পৃথিবী’ কৃষি খামারের চেয়ারম্যান আব্দুল আহাদ শাহীন বলেন, কেমিক্যাল ব্যবহার করতে করতে মাটির উর্বরতা একেবারে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখনই জৈব সার ব্যবহার না করলে একসময় ব্যাপক হারে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, কেঁচো সার দিয়ে উৎপাদিত ফসলে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর কোন কিছু নেই। এতে ক্যান্সার, হার্ট এ্যাটাক, ডায়াবেটিসসহ মরণব্যাধি অনেক রোগ থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। তিনি বলেন, পুকুরে এমোনিয়াম নাইট্রেট তৈরি হলে মাছের ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ সময় পরিমিত কেঁচো সার ব্যবহার করলে তা দূরীভূত হয় এবং অল্প সময়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

সফল এ উদ্যোক্তা আরো বলেন, কেঁচো সার উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকারের অনুগ্রহতা রয়েছে। গোবরের পেথোজেন এবং কেঁচোর জীবনপ্রণালী সম্পর্কে ধারণা না থাকলে সার উৎপাদনে অনেকক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে বলেও জানান আব্দুল আহাদ শাহীন। তিনি অল্প পুঁজিতে অধিক মুনাফা এবং বেকারত্ব দূর করতে যুবকদের জৈব সার উৎপাদনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে তিনি কৃষক ও উদ্যোক্তাদের উন্নতর প্রশিক্ষণ প্রদানের দাবি জানান।

উল্লেখ্য, উদ্যমী কৃষক আব্দুল আহাদ শাহীনের বড় ভাই আব্দুল কাইয়ুম যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মাতাও যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি জমান। কিন্তু তিনি মার্কিন মুল্লুকে যেতে আগ্রহী নন। এজন্য স্ত্রী সালমা বেগমকে নিয়ে তিনি পৈতৃক নিবাস মনির মঞ্জিলেই বসবাস করছেন। সূত্র: দৈনিক সিলেটের ডাক।

 

Developed by :