Tuesday, 4 August, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




চারখাইয়ে টাকা আত্মসাৎ করতে ব্যবসায়ী কামাল হত্যা।। দু’জনের রিমান্ড মঞ্জুর

পরিকল্পনা হয় জকিগঞ্জের আটগ্রামে 

এক বছর পর তিন আসামী গ্রেফতার ।। কংকাল উদ্ধার

আদালতে দোকান কর্মচারীর স্বীকারোক্তি

পরিবারের দাবী, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

ছাদেক আহমদ আজাদ।।

নতুন বাড়ি কিনলেও সেখানে বসবাস করা হয়নি ব্যবসায়ী কামাল আহমদের। তার আগেই ঘাতকরা তাকে ঐ বাড়িতে হত্যা করে পাশের ডুবায় ড্রামভর্তি করে লাশ চেপে রাখে। এরপর ব্যবসায়ী নিখোঁজের ঘটনায় থানায় জিডি ও মামলা হয়। তবু এতদিনে ব্যবসায়ীর হদিস মিলেনি!

এভাবে প্রায় এক বছর যেতে না যেতে হত্যারহস্য উদঘাটন করতে সমর্থ হয় বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ। এ ঘটনায় গত সোমবার রাতে দোকান কর্মচারী আমির আলীসহ এজাহারভূক্ত ৩ আসামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের দেয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পরদিন মঙ্গলবার কামালের নতুন বাড়ির পাশের ডোবা থেকে পুলিশ তার কংকাল উদ্ধার করে।

বুধবার (০৮ জুলাই)  থানা পুলিশ দোকান কর্মচারী আমির আলীসহ ধৃত ৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট তাদের জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ সময় আমির আলী হত্যার দায় স্বীকার করে  আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। অপর দু’আসামীর দু’দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল হক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত অপর আসামীদের গ্রেফতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

হত্যা ঘটনায় ধৃত আসামীর  হলো, জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের দোকান কর্মচারী আমির আলী, ব্যবসায়ী  হেলাল আহমদ ও ব্যবসায়ী শহিদুর রহমান।

জানা যায়, গত বছরের ৫  জুলাই শুক্রবার নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের আলীনগর খলাগ্রামে। চারখাই বাজারের ক্রেতাপ্রিয় ‘কামাল স্টোর’ এর স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন দুর্ভাগা কামাল। তিনি একই ইউনিয়নের আদিনাবাদ (গিরদা) গ্রামের মৃত রকিব আলীর পুত্র। তিন ভাইয়ের মধ্যে কামাল আহমদ (৩৬) ছিলেন সবার ছোট এবং অবিবাহিত। দোকান মালিক কামাল ও কর্মচারী আমির আলী দোকানের ভেতরেই রাত্রিযাপন করতেন।

এদিকে, ব্যবসায়ী কামালের বৃদ্ধ মা আঙ্গুর বিবি পুত্র শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন। ছেলের কংকাল উদ্ধার এবং আসামী গ্রেফতারের খবর পেলেও তিনি অনেকটা ভাবলেশহীন অবস্থায় শুধুই চোখের পানি ফেলছেন এবং পুত্র হত্যাকারিদের ফাঁসি চেয়েছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রমতে, চারখাই বাজারের কামাল স্টোরে বেচাকেনা খুব ভালো ছিল। কামাল আহমদ একা কুলিয়ে উঠতে না পেরে কর্মাচারি নিয়োগ করেন। একপর্যায়ে গত বছরের জুন মাসে মালিকের অগোচরে দোকান কর্মচারী আমির আলী কামাল স্টোর থেকে ৮-১০ লক্ষ টাকার সিগারেট  ও দুধ চুরি করে জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের ফাতেমা স্টোরের জহুরুল, হেলাল স্টোরের হেলাল আহমদ ও শহিদ স্টোরের শহিদুর রহমানের কাছে বিক্রি করে। কিছুদিন পর চুরির বিষয়টি প্রকাশ পেলে কামাল আহমদ ঐ টাকার জন্য আমির আলীকে চাপ দেন। এতে তিনি টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করেন। শেষ পর্যন্ত টাকা আত্মসাৎ করতে দোকান কর্মচারি ও তার সহযোগিরা আটগ্রামে বসে কামালকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনামতে, গত বছরের ৫ জুলাই শুক্রবার বেলা ২-৩ টায় অত্যন্ত কৌশলে ব্যবসায়ী কামাল আহমদকে তার নতুন বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন আমির, হেলাল, ছাব্বির, শহিদসহ আরো কয়েকজন। পরে তার লাশ ড্রামভর্তি করে পাশের ডোবায় ফেলে দেয়া হয়। এরপর হত্যাকারিরা নিজ নিজ এলাকায় চলে যায় এবং কর্মচারি আমীর আলী যথারীতি দোকান খোলে ব্যবসা করে।

ঐদিন রাত থেকে কামালের খোঁজ না মেলায় আমির আলী প্রচার করে তিনি ব্যবসায়ীক কাজে সিলেট গেছেন। পরবর্তীতে বলে তিনি ভারতের আজমীর শরিফ জেয়ারতে চলে গেছেন। এভাবে মাস দেড়েক চলে যাবার পর হঠাৎ একদিন রাতে কর্মচারী আমির আলী দোকানের ২০-২৫ লক্ষ টাকার মালামাল ও দোকানে রক্ষিত নতুন বাড়ির দলিল চুরি করে পালিয়ে যায়। এতে কামালের পরিবারের সন্দেহ হলে গত বছরের ১০ অক্টোবর তার বড় ভাই চারখাই মাইক্রো স্ট্যান্ডের সভাপতি জালাল আহমদ বিয়ানীবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

এরপর গত জানুয়ারি মাসে স্থানীয় বাঘবাড়ি এলাকার সিএনজি চালক জুবের আহমদের সহযোগিতায় জালাল আহমদ আটগ্রামের নিজ বাড়িতে আমির আলীকে খোঁজে পান। এ সময় তাকে আটক করা হলেও তার চাচা তাজ উদ্দিন খুনিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে ২৩ জানুয়ারি ধৃত ৩ জনসহ আরো কয়েকজনের নামোল্লেখ করে জালাল আহমদ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এভাবে আরো প্রায় ৬ মাস কেটে গেলে পুলিশ কোন ক্লু উদঘাটন কিংবা আসামী গ্রেফতার করতে পারেনি। গত সপ্তাহে মামলার বাদী এ নিয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ অবনী শংকর করের সাথে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং সাংবাদিক সম্মেলনের হূমকী প্রদান করেন। এতে ওসি তাকে আরো এক সপ্তাহ ধৈর্য্য ধরার অনুরোধ করেন।

অবশেষে ওসির বেধে দেওয়া সময়ের দু’দিন আগেই গত সোমবার রাতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল হক সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে পৃথক অভিযান চালিয়ে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ থেকে দোকান কর্মচারীসহ এজাহারভূক্ত ৩ আসামীকে গ্রেফতার করে। পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ব্যবসায়ী কামাল হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। এ সময় তারা অপর আসামীদের নাম এবং টাকা আত্মসাৎ করতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলেও পুলিশকে জানান। পরদিন মঙ্গলবার আসামীদের সাথে নিয়ে ব্যবসায়ীর নতুন বাড়ির পাশের ডোবা থেকে পুলিশ তার কংকাল উদ্ধার করে।

এ নিয়ে মামলার বাদী পরিবহন শ্রমিক নেতা জালাল আহমদ বলেন, আমার ভাইয়ের খুনিদের চিহ্নিত করতে সিএনজি চালক জুবের আহমদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি না হলে হয়ত এ মামলা অন্ধকারে থেকে যেত। তিনি দীর্ঘদিন পর হলেও আসামী গ্রেফতার করায় পুলিশকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি আত্মস্বীকৃত খুনিদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবী জানান।

বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. জাহিদুল হক বলেন, আসামীরা চতুর হওয়াতে অল্প সময়ে তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে জকিগঞ্জ সার্কেলের এএসপি সুদীপ্ত রায় ও থানার ওসি অবনী করের নেতৃত্বে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হয়েছি। তিনি বলেন, ধৃতদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং জড়িত অপর আসামীদের শিগগির গ্রেফতার করা হবে। এলক্ষে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল হক।

 

Developed by :