Monday, 26 September, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




বিয়ানীবাজার পৌর নির্বাচন: মেয়র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের না বিপক্ষের?

ছাদেক আহামদ আজাদ: বিয়ানীবাজার পৌরসভা নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দু’টি বিষয় ভোটারদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একটি মেয়র হবেন দেশি না প্রবাসী; অপরটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের না বিপক্ষের। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ১০ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন ইউরোপ ও আমেরিকা প্রবাসী এবং চারজন দেশি। আবার, তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান যেমন আছেন, তেমনি চিহ্নিত রাজাকার পরিবারের সন্তানও রয়েছেন। এজন্য মেয়র নির্বাচনে সচেতন মহল, সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিষয়গুলো নিয়ে বেশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।

অনেকের মতে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন দেশি এবং তিনজন প্রবাসী প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। এরমধ্যে, আলোচিত এক প্রবাসী প্রার্থী মেয়র হতে নানা কূটকৌশল অবলম্বন করছেন। মোড় প্রকৃতির কতিপয় ব্যক্তির মাধ্যমে কালো টাকার কাছে কাবু হচ্ছেন খোদ আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ অনেক নেতাকর্মী। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত তাকে একটু আশ্রয় দিলেই যেকোন মুহূর্তে ফলাফল চিত্র পাল্টে যেতে পারে। এসব কারণে নিবেদীত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন দলের খাঁটি দেশপ্রেমিক জনগণ এ বিষয়টিকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে দু’একদিনের মধ্যে প্রগতিশীল ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়েছে।

রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী মজির উদ্দিন আনসার বলেন, গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ত সৃজনশীল মনের যেকোন প্রার্থীকে ভোটার বেছে নিতে পারেন। তবে উন্নয়নের বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দেয়া উচিত। যোগ্য প্রার্থী হলে দেশি না প্রবাসী এটি দেখার কোন সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রা করছে। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের কোন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হবে আত্মঘাতি ও লজ্জার। তিনি উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে উদীয়মান ও প্রতিশ্রুতি কোন প্রার্থীকে ভোট দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা সুজন’র সভাপতি এডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ খুবই সুন্দর। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ধারা বিরাজমান রয়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করেন।

জানা যায়, বিয়ানীবাজার পৌরসভার ২০১৭ সালের প্রথম নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী যুক্তরাজ্য প্রবাসী মো. আব্দুস শুকুর। তিনি পেয়েছিলেন ৫ হাজারের বেশি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির ধানের শীষের আবু নাসের পিন্টু, তৃতীয় হয়েছিলেন সাবেক পৌর প্রশাসক মো. তফজ্জুল হোসেন। তিনি পেয়েছিলেন ৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট। ঐ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা জমির হোসাইন পেয়েছিলেন মাত্র ৫ শতাধিক ভোট। তবে, প্রথম নির্বাচনে চিহ্নিত রাজাকার পরিবারের কেউ প্রার্থী ছিলেন না।

কিন্তু এবারকার পৌর নির্বাচনের দৃশ্যপট ভিন্ন। এ নির্বাচনে দেশি ও প্রবাসী প্রার্থীদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ পরিবারের সন্তান তকমা পাওয়া প্রার্থীরা রয়েছেন। এছাড়া, নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দেয়নি। দিয়েছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি। তবে, আওয়ামী লীগ ব্যতীত অপর দু’দলের প্রার্থী ভোটের আয়োজনায় তেমন জায়গা করে নিতে পারেননি।

পৌর নির্বাচনে এবারও আওয়ামী লীগের নৌকা’র প্রার্থী যুক্তরাজ্য প্রবাসী মো. আব্দুস শুকুর। এ নির্বাচনে তিনি মোটামুটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। উন্নয়নের বিচারে মূল লড়াইয়ে থাকার কথা থাকলেও দলের অপর প্রবাসী তিন বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ে তিনি অনেকটা বিপাকে পড়েছেন। ভোটের মাঠে তারাও নৌকা’র সাথে টেক্কা দিচ্ছেন। এমনকি এখন পর্যন্ত মূল লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের কমপক্ষে একজন থাকার আভাস মিলেছে।

কঠিন এ সমীকরণের সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুরোধ করেছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মো. নাসির উদ্দিন খান। তিনি স্বাধীনতার প্রতীক নৌকা’র বিজয়ে কর্মী-সমর্থকদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করার আহ্বান জানান। এরপর থেকে ঘাম ঝড়ানো প্রচার-প্রচারণা ও রক্ষণভাগ কৌশলী হওয়ায় কিছুটা হলেও দক্ষিণা হাওয়ায় দোলছে পাল তুলা নৌকা।

গতকাল শুক্রবার পৌরশহরে হয়েছে নৌকার বিশাল মিছিল। এমনকি প্রতিদিন বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র এসে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। সদ্য সাবেক মেয়র আব্দুস শুকুর শুরুতে লড়াই থেকে ছিটকেপড়লেও শেষ মুহূর্তে এসে উন্নয়ন ও বঙ্গবন্ধুর প্রতীক নৌকা এখন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার খবর পাওয়া গেছে।

শহীদ পরিবারের সন্তান সাবেক পৌর প্রশাসক মো. তফজ্জুল হোসেন। একমাত্র দেশি জনপ্রতিনিধি হিসেবে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এবারও মেয়র নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর ‘জগ’ প্রতীকের প্রত্যেক ঘরোয়া বৈঠকে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। স্থানীয়ভাবে তফজ্জুল হোসেনকে অনেকেই ভোটের কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রতিবেশী দু’টি ওয়ার্ডে তাঁর আশানুরূপ ভোট পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে, জয়ের বন্দরে পৌঁছতে তাঁর নিকটাত্মীয় মেয়র প্রার্থী যুক্তরাজ্য প্রবাসী মো. অজি উদ্দিন কিছুটা ‘বাগড়া’ দিচ্ছেন। তাও নিষ্পত্তির সবরকমের চেষ্টা অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে তিনি ১৯ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ ’৯৪ এর জিএস ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ফারুকুল হক শুরু থেকে চামচ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে আলোচনায় রয়েছেন। তাঁর বাড়ি সংলগ্ন কেন্দ্রে পৌরসভার সর্বোচ্চ ভোট ৩৬৫৩। ছাত্রলীগের সাবেক এ ত্যাগী নেতার প্রতি সিংহভাগ সাবেক ছাত্রনেতাদের গোপনে সমর্থন রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেকেই সমর্থন করছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফারুকুল হককে।

এছাড়া, ২, ৩ ও ৪ নং ওয়ার্ডের ভোটে তাঁর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রত্যেক ওয়ার্ডে বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের একটি অংশ এবং সদ্য সাবেক মেয়র এন্ট্রি ভোটার গোপনে তাঁর পক্ষে কাজ করছেন। তাঁর প্রচার-প্রচারণায় থাকে মানুষের ব্যাপক সমাগম। শেষ পর্যন্ত এসব ভোট ধরে রাখতে পারলে তিনিও মূল লড়াইয়ে থাকার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তিনি এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. আব্দুস শুকুর, দলের প্রতিবাদী প্রার্থী ফারুকুল হক ও কমিউনিস্ট পার্টির এডভোকেট কাশেম আহমদ একই ‘কসবা’ গ্রামের সন্তান। তবে, তাঁরা আলাদা আলাদা ওয়ার্ডের ভোটার। আঞ্চলিক ইস্যুতে এ তিন প্রার্থীর মধ্যে ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐক্য হলেই জয়ের বন্দরে তাদের একজন থাকার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিবে।

পৌরসভার শ্রীধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌরসভার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট ৩৩৫৪। এ কেন্দ্রের ভোটার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হাজি আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। বিগত নির্বাচনে একই কেন্দ্রের ভোটার ছিলেন বিএনপির পিন্টু। তিনি ঐ কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। পিন্টুর মতো এবার হেলমেট প্রতীকের টিটু ঐ কেন্দ্রে ভোট পাওয়ার কথা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এমনটাই হলে তিনিও মূল লড়াইয়ে থাকতে পারেন। ইতিমধ্যে ১৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন আব্দুল কুদ্দুছ টিটু। তিনি বিজয়ী হলে প্রবাসীদের জন্য ‘এনআরবি সেন্টার’, শহরে সিসিটিভি ক্যামেরা, বিনোদন পার্ক, আইটি সেন্টার ও ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর কথা উল্লেখ করেছেন।

হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. আব্দুস সবুর। নানা কারণে আলোচিত পরিবারের এ সন্তান মোবাইল প্রতীক নিয়ে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী বক্তব্য রসে টইটম্বুর হওয়াতে সর্বমহলে স্থান পেয়েছে।  কূটকৌশলে আয়ত্বে নিচ্ছেন বিএনপি, জামায়াতের অনেক ভোট মেকারদের। এবার চেষ্টায় রয়েছেন গোপনে বিএনপি ও জামায়াতের দলীয় সমর্থন। যদিও জামায়াত ঘরাণার অপর এক প্রার্থী রয়েছে। এ অবস্থায় তিনি দু’দলের সর্শন আদায় করতে পারলে ‘হিরো’ নতুবা নির্বাচন দৌঁড় থেকে খসেও পড়তে পারেন।

একাডেমিক দিক দিয়ে এ নির্বাচনের সর্বোচ্চ শিক্ষিত স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী প্রভাষক আব্দুস সামাদ আজাদ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) এমফিল গবেষক ও দেশি প্রার্থী হিসেবে সামাদ হ্যাঙ্গার প্রতীক নিয়ে প্রচারণায় রয়েছেন। জামায়াত ঘরাণার উদীয়মান এ প্রার্থী দল কিংবা আঞ্চলিক, দু’টিতেই এখন পর্যন্ত তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না। এ অঞ্চলের আরেক প্রার্থী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কানাডা প্রবাসী আহবাব হোসেন সাজু। এলাকাবাসী দফায় দফায় বৈঠক করলেও এ দু’জনের মধ্যে ঐক্য গড়তে পারেননি। তবে শেষ মুহূর্তে একটি রহস্যময় ‘গুটি’ কাজ করার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ চালে দু’জনের একজন ধরাশায়ী হতেও পারেন। আর এমনটি হলে তাদের একজন আঞ্চলিক প্রার্থী হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে উঠে আসবেন মূল লড়াইয়ে। এ বিষয়টি প্রতিদ্বন্দ্বী অপর প্রার্থীরাও গভীর পর্যবেক্ষণে রাখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এছাড়া, পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকের দেশি প্রার্থী এডভোকেট আবুল কাশেম। সম্প্রতি তার নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রেখেছেন সিপিবি’র কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিল ইসলাম সেলিম।

জাতীয় পার্টির দেশি প্রার্থী মো. সুনাম উদ্দিন (লাঙ্গল) নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আলহাজ কুনু মিয়া বিয়ানীবাজারে গণসংযোগ ও নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি গ্রামবাংলার উন্নয়নের প্রতীক লাঙ্গলে ভোট দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, আগামী ১৫ জুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) পৌরসভার দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মোট ভোটার ২৭ হাজার ৩৬৯ জন। এতে ১০ মেয়র ও ৫৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

 

Developed by :