Wednesday, 28 September, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




‘জাতীয় সংসদের কবি’

‘জাতীয় সংসদের কবি’

কাউসার চৌধুরী:  

দোকানে দোকানে টেপরেকর্ডারে ভাষণ বাজছে। জটলা করে লোকজন দাঁড়িয়ে শুনছে রেকর্ড করা সেই ভাষণ। শোনার পরও যেনো মন চায় আবারও শুনি। ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে এভাবেই লোকজনকে প্রয়াত জাতীয় নেতা প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভাষণ শুনতে দেখা যায়। তখন সরকারে আওয়ামীলীগ। অল্প ভোটে হেরে যান তিনি। ওই ঘটনাগুলো ১৯৯৬ সালের পরের। স্থানীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে তাঁর ভক্ত সাধারণের মনখারাপ। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর আইন ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা করা হল। সেসময়কার কথাই বলছি, সেই সময়ে আওয়ামীলীগের অধিকাংশ জনসভা হতো দিরাই বাজারের আখড়া পয়েন্টে। মনির আহমদ নামের এক রেকর্ডিং ব্যবসায়ী ওই জনসভাগুলোতে দেয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভাষণ রেকর্ড করতেন। এরপর শতশত লোক ওই ভাষণ ক্যাসেটে রেকর্ড করে নিয়ে যেতেন।স্বচক্ষে দেখা সেই ঘটনাগুলো এখন হারানো এক অতীত। অতীত হয়ে গেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও।

তাঁর সাথে স্মৃতির শেষ নেই। মনে পড়ে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ। দল সরকার গঠন করলেও মন্ত্রী পরিষদে তাঁর উপস্থিতি নেই। বছর দুয়েক পরে তাঁকে মন্ত্রী পরিষদে নেয়া হল, দেয়া হল নবপ্রতিষ্ঠিত রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু, দানবীর ড. রাগীব আলীকে দিরাইয়ে গণসংবর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি রোববার। দিরাই ডিগ্রি কলেজের উদ্যোগে কলেজ চত্বরে বিশাল ওই গণসংবর্ধনা হয়। তৎকালীন রেলপথ মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি প্রধান অতিথি, সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী বিশেষ অতিথি ছিলেন। ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ সকল দলের নেতৃবৃন্দও। যেন দলমত নির্বিশেষে জনতার মিলনমেলা। দানবীর ড. রাগীব আলীর পূর্ব পুরুষ দিরাইয়ের মাটিয়াপুরের সৈয়দ বাড়ীর বাসিন্দা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার ভাষণে এটি তুলে ধরলেন। দানবীর ড. রাগীব আলীর কাজের প্রশংসা করলেন। এরপর একদিন আমার সাথে কথায় কথায় বললেন, দানবীর ড. রাগীব আলীকে সংবর্ধনা দিতে তার আগ্রহ-ইচ্ছে অনেক দিনের। সমাজের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলা এমন মানবদরদীকে সম্মাননা জানাতেই এমন আয়োজন করেন। দানবীর ড.রাগীব আলীও তাঁর পূর্ব পুরুষের স্মৃতি চিহ্ন দিরাইয়ের দিরাই ডিগ্রি কলেজে ‘রাগীব-রাবেয়া ভবন’ নামের একটি সুরম্য দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে দেন। এরপরে একদিন দৈনিক সিলেটের ডাক পরিদর্শনে এসেছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি তখন মন্ত্রী। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা বক্তব্য দিলেন। আমরা সাংবাদিকরা অবাক বিস্ময়ে কেবল নীরবে শুনেই গেলাম। একজন শতভাগ রাজনৈতিক নেতা কিভাবে সাংবাদিকতার শাখা-প্রশাখার এতটা জ্ঞান রাখেন। পুরো বক্তব্যটা ছিল সাংবাদিকতাকে ঘিরে। আজকাল কোনো একটা বিষয়ের উপর একটানা ৩০ মিনিট বক্তব্য দিতে পারেন এমন নেতা কয়জন আছেন। কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এক্ষেত্রে ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। আইনের ছাত্র হলেও বাংলা ভাষায় তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। তাঁর মুখে চর্যাপদ নিয়ে বক্তব্য শুনেতো রীতিমতো অবাক। এ যেন বাংলা সাহিত্যের কোনো পন্ডিতের ক্লাস।

কত রাত কেটেছে সিলেট সার্কিট হাউসে তাঁর সান্নিধ্যে। তাঁর সামনে বসা মানেই অনেক বিষয়, অনেক তথ্য জানা। জ্ঞানের সাগর।আর গণতন্ত্র নিয়ে বললে তো আর বলে শেষ করার মতো নয়। ২০১৪ সালে ভোটবিহীন সংসদ সদস্য হলেন। কিন্তু তাঁর মন খারাপ। একদিন তিনি বললেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচন হয় কেমনে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অসুস্থ হয়ে আমি যখন বিছানায় শয্যাশায়ী অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি আমাকে দেখতে ছুটে এলেন। আমাকে চিকিৎসা নিয়ে অনেক পরামর্শও দেন। আমার প্রয়াত চাচা সুনামগঞ্জে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী সুজাত আহমেদ চৌধুরীর সাথে তাঁর আন্তরিক হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। সংসদে তিনি যখন বক্তব্য দিতেন তখন জমে উঠত জাতীয় সংসদ। হাস্যরসে তিনি বিরোধী দলকে অনেক আক্রমণও করতেন। তবে, তাঁর আক্রমণাত্বক বক্তব্যেও বিরোধী পক্ষ কখনো ক্ষুব্ধ হননি। সমালোচনা করতে নিজ দলের নেতাকেও বাদ দেননি।এমনকি সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতেরও কত সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র, সংবিধানের রেফারেন্স থাকতো তাঁর বক্তব্যে। এ জন্যে তাঁকে বলা হতো ‘জাতীয় সংসদের কবি’। এখন আর সংসদে তাঁর মতো প্রানবন্ত আলোচনা শোনা যায়না। গণতন্ত্র আর সংবিধান নিয়েও সারগর্ভ বক্তব্যও শোনা যায়না। কেবল জাতীয় সংসদ নয়, দেশবাসীও তার বক্তব্য মিস করে -শুন্যতা অনুভব করে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলা সদরের আনোয়ারপুর গ্রামে ১৯৪৫ সালের ৫ মে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও মাতা সুমতি বালা সেনগুপ্ত। স্থানীয় স্কুল থেকে প্রাথমিক সমাপ্ত করা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, পরবর্তীতে দিরাই উচ্চবিদ্যালয় ও সিলেটের এমসি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করা সুরঞ্জিত পরে ঢাকার সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে আইন পেশা শুরু করেন।ছাত্রজীবনের প্রথমেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। হাওরাঞ্চলের ‘জাল যার জলা তার’ আন্দোলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয়, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদসহ মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এরমধ্যে শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসন থেকেই ৬ বার ও হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসন থেকে ১ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাংলাদেশের প্রথম খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের জনস্রোতের বিপরীতে ন্যাপ থেকে জয়ী হয়ে দেশবাসীকে চমকে দিয়েছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৫ নম্বর সেক্টরের সাব কমান্ডার হিসেবে তিনি অংশ নেন। নব্বই দশকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এর আগে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও একতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১২ সালে তাঁর সহকারীর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনার পর তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাঁকে দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রি পরিষদে রাখেন। সংসদে সব সময় সরব সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন অভিজ্ঞ সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশ-বিদেশে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রোববার রাত ৪টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

জাতীয় সংসদের কবি কিংবা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ-জনসভার ভাষণ এখন আর সেই টান নেই। মন্ত্রমুগ্ধতাও নেই। তাঁর আসন শূন্য। তাইতো জন্মদিন কিংবা মৃত্যুদিন শূন্যতায় তাঁর। স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক সিলেটের ডাক ও কোষাধ্যক্ষ – সিলেট প্রেসক্লাব।

 

Developed by :