Tuesday, 2 March, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




বৃটেনে এসাইলাম সিকারদের পক্ষে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়

সাঈদ চৌধুরী: বৃটেনের আদালতে একটি ঐতিহাসিক রায়ে এসাইলাম সিকার তথা আশ্রয় প্রার্থিদের মনে আশার আলো জেগেছে। কাজ করতে না দেয়ার বিষয়ে হোম অফিসের সিদ্ধান্ত যথাযত নয় বলে হাইকোর্ট একটি রায় দিয়েছেন। পাচার হয়ে আসা একজন মহিলা বিচারকের কাছে ক্লিনার হিসেবে কাজ করার অধিকার চেয়েছিলেন। উচ্চ আদালতে এটি অনুমোদিত হয়েছে। সে মহিলা গত ১৮ ডিসেম্বর গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় জয় পেয়েছেন।
এসাইলাম সিকারদের কাজ করার পক্ষে এই সিদ্ধান্ত কয়েক হাজার অসহায় মানুষের বাচাঁর পথকে প্রশস্ত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। যারা কাজের জন্য হোম অফিস তথা স্বরাষ্ট্র দফতরের অনুমতির প্রত্যাশায় রয়েছেন। এখন হয়ত সাধারণ কাজ করার বিষয়ে হোম অফিস তাদের অনুরোধ বিবেচনা করবে।

আশ্রয়প্রার্থী এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সাধারণত একটা পর্যায় পর্যন্ত হোম অফিস কর্তৃক কাজ করার অধিকার দেয়া হয়না। তাদের কেস নির্ধারণের জন্য অনেকে বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করেন।

বর্তমানেও সেখানে ৬০ হাজারের অধিক মানুষ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে জানা গেছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, পাচারের শিকার ৩৫ বছর বয়সী মহিলাকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে বৃটেনে আনা হয়েছিল। পাচারকারীদের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়ে সুরক্ষার জন্য হোম অফিসে গেলে তাকে অভিবাসন আটক কেন্দ্র ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। কিন্তু আশ্রয়ের জন্য তার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই বলে জানানো হয়। তবে তিনি পিটিএসডি এবং মারাত্মক হতাশা ও আতংক জনিত কারণে ভারসাম্যহীন (প্যানিক ডিসঅর্ডার) সনাক্ত হন।

এই মহিলা ২০১৯ সালের মে মাসে এবং ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ক্লিনার হিসেবে চাকরী করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। হোম অফিস তাকে কাজ করার অধিকার দেয়নি। যদিও এখন তিনি শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা পেয়েছেন এবং তাকে একটি ওয়ার্ক পারমিট দেয়া হয়েছে।

এই মামলার রায়টিতে মাননীয় বিচারপতি বোর্ন আশ্রয় প্রার্থী এবং পাচারের শিকারদের জন্য কাজ করার অধিকার সম্পর্কে বিস্তৃত বিষয়গুলি বিবেচনা করেছেন। তিনি দেখতে পেয়েছেন, হোম অফিসের গাইডেন্সে কাজ করার অনুমতি দেয়ার বিবেচনার পরিধি একটি বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করেছে। যাতে সাধারণ  কাজের জন্য অনুরোধগুলি যথাযথভাবে বিবেচনা করা যায় না।

বিচারক বলেছেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কোনও ব্যক্তির পক্ষে উচ্চ বেতনভুক্ত কাজ পাওয়া অনেক বেশি শক্ত বা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে তাদের জীবন ও আত্ম-সম্মান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আশ্রয়প্রার্থী এবং পাচারের শিকার উভয়ই উপযুক্ত এবং যোগ্য হয়ে উঠলে তাদের কাজ করা থেকে বিরত থাকাকে হতাশা জনক মনে করেন।

তত্ত্ব অনুসারে, হোম অফিস এক বছরের পরে তাদের প্রাথমিক দাবির পক্ষে সিদ্ধান্ত না নিলে শর্টেজ অকুপেশন লিস্টে (এসওএল) বিশেষ দক্ষতা রয়েছে এমন লোকদের কাজের অনুরোধ করার অধিকার রয়েছে। তালিকার দক্ষতার মধ্যে রয়েছে ব্যালে ডেন্সার, পাইপ ওয়েল্ডার, গ্যালিকের শিক্ষক এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানী ইত্যাদি। এই পেশা সমূহে শ্রম বাজারে প্রায় ১শতাংশ কাজ রয়েছে।

মহিলার প্রতিনিধিত্বকারী ডানকান লুইস সলিসিটারের সুলাইহ আলী এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন,  আশ্রয় প্রার্থীদের দাবি মুলতুবি থাকা অবস্থায় কাজের অধিকার দিয়ে তাদের দরিদ্রতা থেকে মুক্তির পথ এবং তাদের মর্যাদা ও আত্ম-পুনঃস্থাপনের সুযোগ দেয়। এটি পাচার থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক পুনরুদ্ধারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি শোষণের শিকার হওয়া থেকে তাদের রক্ষা করতে সহায়ক হবে।

কেসি সলিসিটর্স ফার্মের প্রিন্সিপাল সলিসিটর ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী এব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন দিয়েছেন। অনেক এসাইলাম সিকার কাজের সুযোগ না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন। কোন কোন ক্ষেত্রে সুযোগ পেলেও শর্টেজ অকুপেশন লিস্টের কঠিন ক্রাইটেরিয়া মোতাবেক কাজ পাওয়া সম্ভব হয়না। আদালতের দিকনির্দেশনা মোতাবেক হোম অফিস বিষয়টি সুবিবেচনায় নিলে অসহায় এই মানুষগুলো উপকৃত হবেন।

কারি অস্কার খ্যাত বৃটিশ কারি এওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা এনাম আলী এমবিই বলেছেন, উন্নত বিশ্বে যখনই কোন পলিসি করা হয়, তখন তা রিভিউ বা চ্যালেঞ্জ করা যায়। এ ব্যাপারে আমরা দীর্ঘদিন ধরে লবিং এবং প্রচার তৎপরতা চালিয়ে আসছি। এই মামলায় আদালত একটি কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন এবং মানবিক ও মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে বহু এসাইলাম সিকার সঠিক ভাবে কাজ করে জীবনধারণের সুযোগ পাবেন এবং সরকারকে যথাযত রাজস্ব প্রদানে সক্ষম হবেন বলে আশা করা যায়।

 

Developed by :