Saturday, 23 January, 2021 খ্রীষ্টাব্দ | ১০ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি

জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের একবছর

ছাদেক আহমদ আজাদ

সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের একবছর পূর্ণ হলো আজ। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর নগরীর আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জনাকীর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় দলের জেলা এবং মহানগরের শুধুমাত্র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দেওয়ার আড়াই মাস পর সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে দেখা যায় আলোর ঝলকানি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন হবে কি-না সন্দেহ রয়েছে।

এদিকে, বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে গত ৯ মাস থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্তিমিত ছিল। এরপরও জেলা ও মহানগরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। করোনা মহামারি সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় দিবস এবং দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে করোনাকালে দায়িত্বশীল নেতারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। এসব কর্মসূচিতে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়। এরপর দু’শাখা কমিটির নেতাদের ঐক্যে কিছুটা হলেও ছন্দপতন ঘটে। এমনকি পরস্পর বিরোধী বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ এবং কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলে প্রায় ৪০টি পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জমা হয়েছে বলেও বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এমপিকে প্রধান করে সিলেট বিভাগীয় কমিটি করেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রের দায়িত্বশীল এ কমিটির নেতারা জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের পদপ্রাপ্ত নেতাদের সাথে সিলেট ও ঢাকায় কয়েক দফা বৈঠক করেন।

এরপর জেলার প্রস্তাবিত কমিটি একদফা রদবদল করে যুগ্ম’র স্থলে সিনিয়র সভাপতি পদে শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং প্রথম প্রস্তাবিত কমিটি থেকে বাদপড়া বৈদেশিক ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপিকে সদস্য পদে রাখা হয়েছে।

এছাড়া, গত বুধবার দলের কেন্দ্রীয় অফিসে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক এর উপস্থিতিতে বৈঠকে বসেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান। এ সময় কেন্দ্রীয় নেতারা প্রস্তাবিত কমিটির আরো কয়েকটি পদে সংযোজন-বিয়োজন করার প্রস্তাব দেন।

কিন্তু রাজনীতির পাকা খেলোয়াড় এডভোকেট নাসির খান পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে কেন্দ্রের প্রস্তাবে সায় দেননি। আবার, কিছুদিন পূর্বে কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ এর সাথে ঢাকায় বৈঠক করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন। এ বৈঠকে প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে স্থানীয় নেতাদের জমাকৃত বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।

তবে সিলেটের এ দু’নেতা এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেন। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশমতে, দলের জন্য ক্ষতিকর ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে সৎ, ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে বলেও সেসময় তাঁরা কেন্দ্রীয় নেতাকে অবহিত করেন। এরপর মহানগরের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি আরেক দফা রদবদল করা হয়েছে।

একাধিক সূত্রমতে, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি একদফা রদবদলের পরও নানা কারণে কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। আবার, কেন্দ্রের চাহিদামতো পথে হাঁটতে নারাজ এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান ও অধ্যাপক জাকির হোসেন। এজন্য বিজয়ের মাসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন, না কিছুটা বিলম্ব হবে; এ নিয়ে ধূম্রজাল কাটছে না। তবে, নেতাকর্মী আশাবাদি, সকল জল্পনা কল্পনা শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এ মাসেই জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি অনুমোদন দিয়ে চমক দেখাবেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন গতকাল এ প্রতিবেদকের সাথে আলঅপকালে বলেন, আমরা দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সাবেক ছাত্রনেতা ও ত্যাগী ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি করেছি। এরপর দলের দায়িত্বশীলদের পরামর্শে কিছুটা রদবদল হয়েছে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ হলেই আমার বিশ্বাস সবাই অভিনন্দন জানাবেন।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান বলেন, আমরা পরীক্ষিত নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে ৭৫ সদস্যের প্রস্তাবিত কমিটি কেন্দ্রে জমা দিয়েছি। এখন নেতাকর্মী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি বলেন, এ কমিটি অনুমোদন হলেই তৃণমূল পর্যায়ে দলকে গতিশীল করা সম্ভব হবে।

জানা যায়, সিলেটে আওয়ামী লীগের বিগত সম্মেলনে পদপ্রত্যাশী ৩৫-৪০ জন নেতার মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট লুৎফুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন এর নাম ঘোষণা করা হয়। এসময় কমিটি থেকে বাদ পড়েন জেলার সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী এবং মহানগরের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। মহানগরে কাক্সিক্ষত পদ না পেয়ে অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। সম্মেলন শেষে ঢাকায় ফেরার পথে ওসমানী বিমানবন্দরে ওবায়দুল কাদের জেলার সিনিয়র সহ সভাপতি পদে শফিকুর রহমান চৌধুরীকে রাখার নির্দেশ দেন।

এরপর ২০ ও ২১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নেতারা। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও সদস্য হিসেবে বদর উদ্দিন আহমদ কামরান পুরস্কৃত হন। এরপর এ দু’নেতার অনুসারিরাও রাজনীতিতে জলজ্যান্ত হয়ে ওঠেন। আবার, সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি ও উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত স্বপদে বহাল থাকেন।

এদিকে, মার্চ মাসে দেশে বৈশ্বিক করোনাভাইরাস হানা দেয়। ৭ মার্চ সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম কমপ্লেক্সে মুজিব জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষে ‘নব প্রজন্মের নব চেতনায় বঙ্গবন্ধু’ উৎসব থিম নিয়ে মাসব্যাপী জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ। তাদের এ যুগপৎ কর্মসূচির দূরদর্শী ও সৃজনশীল অনুষ্ঠানমালা দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি সুধিজনের দৃষ্টি কাড়ে। এ অনুষ্ঠানে জেলা ও কেন্দ্রের নেতারা এক কাতারে শামিল হন। সেসময় মহান মুক্তিযুদ্ধসহ নানাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আওয়ামী লীগের সাবেক ত্যাগী নেতাদের স্বীকৃতি ও সম্মান জানানো হয়। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দু’সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান ও অধ্যাপক জাকির হোসেন ‘মুজিব জন্ম শতবর্ষ’ অনুষ্ঠান করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রশংসা কুঁড়ান।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক বলেন, সিলেট জেলা ও মহানগরে নেতৃত্ব নিয়ে মতানৈক্য আছে কিন্তু বিদ্রোহ নেই। তারা সিনিয়র নেতাদের সাথে পরামর্শ করে দলীয় কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ছোটখাটো অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করে আমরা শিগগির দলের সভাপতি শেখ হাসিনার হাতে প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি তুলে দেব।

বিজয়ের মাসে কমিটি আলোর মুখ দেখবে, এমনটাই জানালেন কেন্দ্রীয় নেতা শফিক। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

প্রকাশ: দৈনিক সিলেটের ডাক

 




Developed by :