Thursday, 22 October, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ৭ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




রায়হান হত্যা : এস আই আকবর কাণ্ডে উত্তাল সিলেট

পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট করেননি এস আই আকবর # ফাঁড়িতেই চলে নির্যাতন # আখালিয়াবাসীর মানববন্ধনে কঠোর হুঁশিয়ারি # সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে আইনজীবীর রিট

সিলেট: পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার মিছিলে মিছিলে উত্তাল ছিলো সিলেট নগরী। নিহতের পরিবারের দাবি, হত্যাকান্ডের জন্য মূল দায়ী বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লাপাত্তা বলে চাউর হয়েছে। মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এ স্থানান্তরের জন্য পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে নির্দেশনা এসেছে। অন্যদিকে নিহত রায়হানের উপর নির্যাতনের আলামত ও পুলিশ কর্তৃক তাকে তুলে আনার নানা তথ্য উঠে এসেছে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুসন্ধানে।

পিবিআইতে রায়হান হত্যা মামলা : বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান আহমদ (৩৩) মারা যাওয়ার ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেন সংশ্লিষ্ট সচেতন সমাজ। যাদের নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে তাদের কাছে তদন্তের ভার তুলে দেয়াকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন অনেকে। এর প্রেক্ষিতে রায়হান হত্যা মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের একটি নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স। সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র জ্যোতির্ময় সরকার জানান, সকালে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রায়হান আহমদের মারা যাওয়া ঘটনায় হওয়া মামলা পিবিআইতে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর আগে গত সোমবার রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) শাহরিয়ার আল মামুনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- কতোয়ালি থানার সহকারি কমিশনার নির্মল চক্রবর্তী ও বিমানবন্দর থানার সহকারী কমিশনার প্রবাস কুমার সিংহ। তদন্তে নেমে পুলিশ হেফাজতে রায়হান উদ্দিনের মৃত্যু ও নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এর প্রেক্ষিতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাড়ির ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এস আই আকবরের হদিস মিলছে না : এসএমপি’র একটি টিমের তাৎক্ষনিক তদন্তে সোমবার বিকেলে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। তদন্তকারীরা সোমবার দিনভর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। নিয়মানুযায়ী, বরখাস্ত কিংবা প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সদস্যদের সাদা পোশাকে এসএমপি পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট করার কথা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, আকবর ছাড়া বাকি ৬ পুলিশ সদস্য সোমবার পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট করেন। কিন্তু, আকবর মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট করেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, এস আই আকবরের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। তার ব্যবহৃত ফেসবুক অ্যাকাউন্টও ডিঅ্যাকটিভ (অকার্যকর)। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানান, এস আই আকবর হোসেনকে সোমবার বরখাস্ত করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার খোঁজ না মেলা প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করতেও রাজি হননি তিনি।

যেভাবে রায়হানকে তুলে আনে পুলিশঃ রায়হানের মৃত্যু সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর এবং গণমাধ্যম থেকে চাপ সৃষ্টির পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। সোমবার দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও বন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ সে সময় দায়িত্বে থাকা ৭ পুলিশ সদস্য বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছিলো সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। এরপর সিলেট পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সংগৃহীত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এর সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে রায়হানকে নির্যাতনের মূল রহস্য।

ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে এসে থামে। ঐ সিএনজি অটোরিকশায় ছিলেন রায়হান। এ সময় রায়হানকে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই পুলিশের সঙ্গে ফাঁড়িতে প্রবেশ করেন পুলিশের ঐ তিন সদস্য। এরপর সকাল ৬টা ২২ মিনিটে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা আসে বন্দর ফাঁড়ির সামনে। এর দুই মিনিট পর ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে দুই পুলিশের কাঁধে ভর করে রায়হানকে সেই অটোরিক্সায় তুলতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, এই ঘটনার মূল হোতা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আশেকে এলাহী বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। ওই আশিকে এলাহীই তুলে নিয়ে এসেছিলো রায়হানকে। অভিযোগ রয়েছে, রায়হান আশেকে এলাহীর পূর্ব পরিচিত থাকতে পারেন। কারণ আশেকে এলাহী এয়ারপোর্ট থানায় থাকাকালে রায়হানের সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। সেই জেরে রায়হানকে তুলে নিয়ে আসা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের অন্য একটি সূত্রও এ ঘটনার সাথে এ এস আই আশেকে এলাহীর জোর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে।

অপরদিকে, সোমবার ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবরসহ অন্যরা তদন্ত কমিটিকে জানান, নগরীর কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাই হয়েছিলো বলে ওয়ারলেসের মাধ্যমে জানার পর এএসআই আশেক এলাহীর টিম মূলত অভিযানে যায়। ঐ টিমের অন্য সদস্যরা হলেন: কনস্টেবল তৌহিদ মিয়া ও হারুনুর রশিদ। তারা গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে রায়হানকে আটক করে। তার সঙ্গে থাকা দু’জন দৌড়ে পালিয়ে যায়। এছাড়া তদন্ত কমিটির কাছে এএসআই আশেক এলাহী ছিনতাইয়ের শিকার লোকের নাম-পরিচয় রাখেননি বলেও জানায়। অভিযোগ উঠেছে, আশেকে এলাহীর পরিকল্পনায় পুরো ঘটনাটি বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে রায়হানকে আটক করে নিয়ে আসা পুলিশ সদস্যরা কমিটিকে জানান, ফাঁড়িতে নিয়ে আসার পর এসআই আকবরের নেতৃত্বে রায়হানকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তার নির্দেশেই তৌহিদের ফোনে রায়হান তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন। এছাড়া, শেষ রাতে রায়হানের উপর নির্যাতন চলাকালে ফাঁড়ির কক্ষ থেকে আর্তনাদের আওয়াজ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

যদিও এর আগে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর হোসেন দাবি করে আসছিলেন, রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে আনাই হয়নি। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে তার মিথ্যাচার। পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনের প্রমাণ প্রাথমিকভাবে মিললেও এখনো অভিযুক্তদের মামলার এজাহারভূক্ত করা হয়নি।

ঘটনার সঠিক তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট : রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন এক আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ঢাকাস্থ জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সদস্য ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, সিলেটের পুলিশ কমিশনার, সিলেটের ডিসি-এসপিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। আবেদনে বিভিন্ন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়। রিটটি উচ্চ আদালতে শুনানীর অপেক্ষায় রয়েছে।

বিক্ষোভে উত্তাল ছিলো সিলেট : সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশি হেফাজতে রায়হান উদ্দিন হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে গতকাল উত্তাল ছিলো সিলেট। হত্যাকারীদের গ্রেফতার এবং বিচারের দাবিতে নগরজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। ‘সিলেটের সাধারণ ছাত্র জনতা’ সহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে হয় মিছিল মিটিং। সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয় রায়হানের বাসার সামনে। সিলেট সুনামগঞ্জ সড়কের এক পাশ বন্ধ করে বৃহত্তর আখালিয়া আবাসিক এলাকাবাসীর ব্যানারে সাধারণ জনতা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

মানববন্ধন চলাকালে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ব্যবসায়ী নেতা আমীর হোসেনের সভাপতিত্বে ও স্থানীয় কাউন্সিলর আলহাজ্ব মখলিছুর রহমান কামরানের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন দৈনিক সিলেটের ডাক এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ,সিটি কাউন্সিলর রেজাউল হাসান লোদী কয়েস লোদী, সাবেক সিটি কাউন্সিলর জগদীশ চন্দ্র দাস, লে. কর্নেল (অবঃ) আলী আহমদ, সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি মাসুক আহমদ, ব্যবসায়ী নেতা শওকত আলী, কাউন্সিলর রেবেকা বেগম, ডাঃ হোসাইন আহমদ প্রমুখ।

সমাবেশে এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়, যে অপরাধ করবে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। তিনি বলেন, নিহত রায়হানের সন্তানের মুখ দেখে আমি অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। মাত্র দুই মাস বয়সে তাকে এতিম হতে হয়েছে। এর বিচার অবশ্যই বাংলার মাটিতে হবে। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বজনহারাদের দুঃখ কষ্ট বুঝেন। এর জন্য এই পর্যন্ত অপরাধ করেছে এমন কাউকে ছাড় দেননি। পবিত্র ভূমি সিলেটের মাটিতে যারা অপরাধ করবে তাদের কোনভাবে ছাড় পাবে না। তিনি বলেন, পুলিশ প্রশান ইতোমধ্যে ৭ পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। জড়িত পুলিশ সদস্যরা শিগগিরই পুরোপুরি আইনের আওতায় আসবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। এর আগে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ নিহত রায়হানের পরিবারে সদস্যদের সমবেদনা জানাতে তাদের বাসায় যান। এ সময় রায়হানের মেয়ে আলফাকে কোলে নিয়ে আদর করেন এবং পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দেন। অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে নগরীর চৌহাট্টা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চৌহাট্টা পয়েন্ট, বন্দরবাজার পয়েন্ট ও বন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করে জনতা। এই ফাঁড়িতেই রায়হানকে ধরে এনে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার অভিযোগ ওঠেছে।

এ সময় বিক্ষোভকারীরা রায়হান আহমদ হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বক্তারা বলেন, রায়হান আহমদ হত্যায় যাদের নাম এসেছে তাদের অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার কার্য পরিচালনা করা হোক।

প্রসঙ্গত, রোববার ভোরে রায়হান আহমদ (৩৩) নামে সিলেট নগরীর আখালিয়ার এক যুবক নিহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইয়ের দায়ে নগরের কাষ্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন রায়হান। তবে কাষ্টঘর এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে গণপিটুনির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে আসারও প্রমাণ নেই সিসিটিভি ফুটেজে। রায়হান নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় এক চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারি হিসেবে কাজ করতেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী তামন্না আক্তার তান্নি বাদী হয়ে কতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

 

Developed by :