Friday, 30 October, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানির ‘সাবেক’ এমডি মিছবাহ’র বিরুদ্ধে আর্থিক অস্বচ্ছতাসহ নানা অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

সিলেট: সিলেটে দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের ‘সাবেক’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমদ মিছবাহ কোম্পানিকে নিজের ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনা করছেন। এছাড়া তিনি কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এনামুল হক সরদারকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। এমনকি মিছবাহ’র বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অসচ্ছতাসহ নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে নগরীর মেন্দিবাগের একটি হোটেলের কনফারেন্স হলে কোম্পানীর চেয়ারম্যান, পরিচালক ও শেয়ার হোল্ডারদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে লিখিতভাবে এসব অভিযোগ করেন কোম্পানির চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, দি ম্যান এন্ড কোম্পানী ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম আব্দুল হাফিজ। এ সময় ফারুক আহমদ মিছবাহকে পাঁচ বছরের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কৌশলে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এমডি হিসেবে কোম্পানীকে নিজের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠানের মত পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হাফিজের মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশগণ উত্তরাধিকার সনদসহ প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিলেও তাদেরকে শেয়ার হোল্ডার হিসাবে নিবন্ধন করা হয়নি। তিনি বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত বা অন্যান্য পরিচালকের মতামতকে কোন গুরুত্বই দেন না। কার্যনির্বাহী কমিটি বারবার সভা আহ্বান করলেও তিনি অনুপস্থিত থাকেন।

আরও বলা হয়, ফারুক আহমদ মিছবাহ শাহ ডেভলপার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তাঁর পরামর্শে ঐ কোম্পানিতে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও তিনি ভেজাল জমি ক্রয় করেন। ঐ জমি সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশন অধিগ্রহণ করলেও সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানি পায়নি। তিনি এ বাবদ ১২ কোটি টাকা উত্তোলন করলেও মোটা অংকের টাকা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। এরমধ্যে কোম্পানির বিনিয়োগকৃত এক কোটি টাকার কোন হিসাব প্রদান করেননি।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, গার্ডেন টাওয়ার ও স্প্রীং গার্ডেনের ফ্ল্যাট মালিকরা সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলেও তিনি রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে গড়িমশি ও জটিলতা সৃষ্টি করে রেখেছেন। সার্ভিস চার্জ দিয়ে দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানিকে রক্ষণাবেক্ষন ও ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব দিলেও তিনি ভাড়ার টাকা আদায় করে মালিকদের না দিয়ে নিজের কাজে খরচ করেছেন। এছাড়াও গত ১০ বছরে কোম্পানির কোন এজিএম বা ইজিএম হয়নি। যার দায়িত্ব ছিল মিছবার। জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে তিনি দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানির কোন হালনাগাদ তথ্যও প্রদান করেন নি। তিনি ভুয়া অডিট রিপোর্ট ও বিভিন্ন সময়ে এজিএম বা ইজিএম অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে একসাথে ১০ বছরের রিটার্ন দাখিলের চেষ্টা করেছিলেন এ বছর। এ কারণে কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারগণ গত মার্চের ১৫ তারিখে তাকে একটি লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছিলেন। তিনি বেআইনীভাবে এবি ব্যাংক গার্ডেন টাওয়ার শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা তুলেছেন। এ বিষয়ে মামলা চলমান রয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসাবে আব্দুল মুক্তাদির গত ১৪ জুলাই নোটিশের মাধ্যমে ৫ আগস্ট কোম্পানির ইজিএম আহ্বান করেন। কিন্তু মিছবাহ হাইকোর্ট থেকে ইজিএমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এরপর আমরা জবাব দিতে গেলে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ফারুক আহমদ মিছবাহর অনিয়মতান্ত্রিক কাজের প্রেক্ষিতে কোম্পানির ২ জন পরিচালক গত ২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে দুটি মামলা করেন। এসব মামলায় দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানির নথি তলব, সম্পত্তি বিক্রি ও শেয়ার হস্তান্তরের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া, এয়ারপোর্ট খাসদবিরের রেহানা হাসান নাহার নামক একজন মহিলা মিছবাহর বিরুদ্ধে কোম্পানীর চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে মিছবাহ ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ফ্ল্যাট বিক্রির বিপরীতে টাকা গ্রহণ করে ফ্ল্যাট দিচ্ছেন না এবং নিজেকে মিছবার স্ত্রী এবং তার ঔরসজাত এক পুত্র সন্তান রয়েছে দাবী করে সন্তানের জন্মসনদসহ কিছু তথ্য প্রমান জমা দেন। এ বিষয়টি তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি রেগে যান এবং কোম্পানির রেজুলেশন বই নিজের কাছে রক্ষিত রাখেন। এ ব্যাপারে নাহার আদালতের শরণাপন্ন হলে বর্তমানে তা সিআইডি তদন্ত করছে বলেও জানানো হয়েছে। এরপর থেকে মিছবাহ তার হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কোম্পানির বিভিন্ন পরিচালকের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করছেন, জিডি করাচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান ড. এনামুল হক সরদারকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে মিছবাহ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। তিনি ১৫ বছর এই কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে কোম্পানির ৫ নম্বর টাওয়ার ভাড়া নিয়ে তিনি কলেজ পরিচালনা করছেন ও নিয়মিত ভাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু গত ২ বছর কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী পানি সরবরাহ না করায় এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল দেয়ায় কলেজের সুনাম নষ্টের পাশাপাশি তিনি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মিছবাহর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সমস্যাটির সমাধান হয়নি। ড. সরদার কোম্পানির ১৯০০ শেয়ারের মালিক, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। খাদিম প্রকল্পের দুটি প্লটের বিপরীতে তিনি ১২ লাখ টাকা নগদ জমা দিলেও তাকে কোন প্লট সমজে দেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে নিজের অনিয়ম আড়াল করতে তিনি গত ৪ অক্টোবর এনামুল হক সরদারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে একটি প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে। এই মামলায় যে পরিমাণ ভাড়া তার কাছে পাওনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তা মোটেও সঠিক নয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, বিনা অনুমোদনে কোম্পানির টাকা নেয়া, ফø্যাট ব্যবহারের ভাড়া, বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে উত্তোলিত ভাড়ার টাকা নেয়া ও শাহ ডেভলাপারের অফিস ভাড়া বাবদ ফঅরুক আহমদ মিছবাহের কাছে কোম্পানির মোট দেড় কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তাছাড়া সিটিসেল কোম্পানির সাথে ৬০ লাখ টাকা রফাদফার বিষয়ে কোন সঠিক জবাব এখনো দেননি তিনি। এনামুল হক সরদারসহ আমরা কোম্পানির শেয়ার হোল্ডাররা কোম্পানির কাছে ২ কোটি টাকা পাই। হিসাব চাইলে মিছবাহ সুষ্ঠ হিসাব দেননি।

এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে দি ম্যান অ্যান্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘বোর্ড মিটিংয়ে সর্বসম্মতভাবে আমাকে (মুক্তাদির) চেয়ারম্যান করা হয়েছে।’ ফারুক আহমদ মিছবাহ এমডি হিসাবে অবৈধ হলে সাংবাদিকরা জানতে চান, তাহলে তার মাধ্যমে ২০০২ সালের পর থেকে যত ব্যবসা-বাণিজ্য হয়েছে, পরিচালক হয়েছেন, শেয়ার হোল্ডার হয়েছেন সবাই অবৈধ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তাদির বলেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে; সেখানেই তা ফয়সালা হবে। সংবাদ সম্মেলনে মুক্তাদিরের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তাঁর পুত্র নওশাদ আল মুক্তাদির। এসময় কোম্পানির পরিচালক আব্দুস সামাদ, শেয়ার হোল্ডার সিরাজুল ইসলামসহ বেশক’জন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।

 

Developed by :