Friday, 30 October, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




অভিযোগ মীমাংসা ছাড়া পূর্ণ কমিটি অনুমোদন নয়, নির্দেশ শেখ হাসিনার

নৃপেন রায়, ঢাকা: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগরের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। জেলা ও মহানগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা ‘এমপি লীগে’ প্রভাবিত হয়ে ‘মাই ম্যান নেতাদের নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রস্তাবিত কমিটি কেন্দ্রে অনুমোদনে জমা দিয়েছেন।

এতে বাদ পড়াদের নেতারা ও তাদের অনুসারীরা কেন্দ্রে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রতিটি কমিটির বিপরীতে অভিযোগ নিষ্পত্তি করে তৃণমূলের ত্যাগী, পরীক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের যাতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা পায়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

শনিবার (৩ অক্টোবর) গণভবনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেবেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা।

উল্লেখ্য, করোনা মহামারী সংক্রমণের কারণে আটকে থাকা সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ক্ষমতাসীন দলটির। শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন গণভবনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ৩২ জন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত থাকবেন।

গত ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগে-পরে ৩১টি জেলা ও মহানগরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সাংগঠনিক জেলাগুলোতে এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয়নি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা গত ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে তা কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেন। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর সভাপতিমণ্ডলীর সভায় এ সময় আরও এক সপ্তাহ সময় বাড়ানো হয়। এরপরও এখনো কয়েকটি জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রীয় দফতরে জমা পড়েনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের সভাপতিমণ্ডলীর দুইজন সদস্য সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে সব নেতারা মনে করেছেন এবার মাই ম্যানদের দিয়ে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করে জমা দিলেই পাস হবে, তারা ভুল করেছেন। তারা নেত্রীর মোটিভ বুঝতে ভুল করেছেন। এবার কমিটি জমা দিলেই কমিটি পাস হবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের প্রতি নেত্রীর কঠোর নির্দেশ হলো, অভিযোগ আমলে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই শেষে কমিটি অনুমোদন পাবে। না হলে দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা করতে হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘কিছু পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে। সে জন্য আমাদের কাছে কমিটি এলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখার চেষ্টা করছি। এখন কারও সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে। সেই কারণে কমিটিতে থাকবে এমন না। আমরা যেটাতে জোর দিয়েছি দুঃসময়ে যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছে, যারা ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে ছিল, যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে ছিল যাদের নামের কোনো অভিযোগ নেই যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেই, যাদের নামে মাদকের মামলা নেই, মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই, মানে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন ধরনের লোক দলীয় কোনো পর্যায়ে না থাকে সাংগঠনিক কোনো পর্যায়ে না থাকে এ ব্যাপারে নেত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা সেভাবে খেয়াল রাখছি। আমরা আশা করি যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে তারা কোনোভাবেই নেতা নির্বাচিত হবেন না।

এসএম কামাল আরও জানান, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে সেই অভিযোগগুলো তুলে ধরা হবে। সেই ক্ষেত্রে কার্যনির্বাহী কমিটি মনে করলে তারা বাদ যাবে। জমা দেওয়া মনেই কমিটি ফাইনাল হবে তেমনটা না। যত সময় পর্যন্ত এটা পাস না হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া সারাবাংলাকে জানান, যেহেতু দীর্ঘদিন পরে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেহেতু নিশ্চয়ই সেখানে জাতীয় রাজনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং কনোনা মহামারির কারণে পরিবর্তিত যে ব্যবস্থা এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কিভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয় এবং আমাদের ২১ তম জাতীয় কাউন্সিলের আগে-পরে আমাদের অনেকগুলো জেলায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের পরে করোনা মহামারির কারণে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। এ সব অপূর্ণাঙ্গ কমিটি কীভাবে সম্পূর্ণ করা যায় এবং সাৎগঠনিক তৎপরতা কীভাবে পরিচালনা করা যায় এবং জাতীয় রাজনীতির আলোকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবস্থান কি হবে সে বিষয়ে আগামীকালের বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

বিপ্লব বড়ুয়া আরও জানান, আমাদের ৩১টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলনের প্রায় অধিকাংশ জেলার প্রস্তাবিত কমিটি জমা হয়েছে। আমরা মাননীয় সভাপতির কাছে সেই সমস্ত কমিটি পাঠিয়েছি। অনেক জেলায় সেখানে যারা পদবঞ্চিত হয়েছে, তারা অভিযোগ দিয়েছেন। এই অভিযোগের সংখ্যাও কিন্তু অনেক। আমাদের নেত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, প্রতিটি অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে এবং যারা ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে আছেন এই ধরনের ক্লিন ইমেজের মানুষকে সংগঠনে সুযোগ দিতে হবে। যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি কিন্তু খুব বেশি সহজ নয়। এ কারণেই সময় নেয়া হচ্ছে। আশা করি, আগামীকালের বৈঠকে নেত্রী সেখানে নির্দেশনা দেবেন। এর পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এই অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত কমিটি অনুমোদনের কাজ তারা সম্পন্ন করবেন।

এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবিষয়ে তৃণমূল নেতাদের বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি দেওয়া হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা বাদ পড়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সবাইকে বলব সামনে যে কমিটিগুলো গঠন করা হবে, সেগুলোতে অবিতর্কিত এবং ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

এ ছাড়া গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সভায় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাও পছন্দমতো লোকদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে প্রয়োজনে জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে দেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, সিলেট জেলা ও মহানগর, হবিগঞ্জ, রাজশাহী জেলা ও মহানগরসহ অন্তত ২৪টি জেলা সাংগঠনিক ইউনিটের প্রস্তাবিত কমিটিতে মাই ম্যানদের জায়গা দিয়ে এবং দুর্দিনের নেতাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।কোন কোন কমিটিতে বিএনপি-জামায়াত ও অন্য দল থেকে আসা লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয়েছে। আবার কোন কোন কমিটিতে হাইকমান্ডের নির্দেশে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা পেশাজীবীদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে অভিযোগের উঠেছে তৃণমূলের পরীক্ষিত মাঠপর্যায়ের নেতাদের।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে দুর্দিনের দক্ষ সংগঠক, প্রবীণ ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ‘চার খলিফা’ খ্যাত বলয়ের নেতারা কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছে। এই চার খলিফা খ্যাত বলয়ে রয়েছেন, জেলার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সভাপতি ও দুই জন সংসদ সদস্য। রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে এদের অনুসারিদের ঠাঁই হয়েছে। তাই জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে ৪০ জন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে কেন্দ্রীয় দফতর অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগে এই ৪০জন নেতার অতীত-বর্তমান তুলে ধরে আমলনামা জমা দেওয়া হয়েছে। ১২ মার্চ অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা দেয় রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ। গত ৮ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে মেরাজ উদ্দিন মোল্লাহকে সভাপতি ও আবদুল ওয়াদুদ দারাকে সাধারণ সম্পাদক, লায়েব উদ্দিন লাভলু, আয়েন উদ্দিন এমপি ও মোস্তাফিজুর রহমান মানজালকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করে ৫ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।

একইভাবে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া কয়েকজন নেতাদের অভিযোগ উঠেছে। তার পরিপেক্ষিতে রাজশাহী মহানগরে বিভিন্ন সংগঠনে দুঃসময়ে নেতৃত্ব দেয়া ১০জন সাবেক নেতা কেন্দ্রে অভিযোগ জমা দিয়েছে। এমনকি দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে কমিটিতে পদ দেয়া হয়েছে সরকারি চাকরি করেন, এমন কাউকেও কমিটিতে রাখা হয়েছে।

একইভাবে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে প্রয়াত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজার অনুসারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এনিয়ে দুই দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সাথে। এরপর খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক নেতার বাসাতেও এক দফায় বৈঠক হয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে। কক্সবাজার জেলা কমিটিতে বাদ পড়েছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদপ্রত্যাশী ও সংসদ সদস্য জাফর আলমসহ তাঁর অনুসারীরা।

একই অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির এক নেতার বিরুদ্ধে দুর্দিনের ত্যাগী নেতাদেও বাদ দিয়ে ‘পরিবার লীগ’ গঠন করে তথা আত্মীয়-স্বজন পরিবারের সদস্যদের জায়গা দিয়ে প্রস্তাবিত কমিটি জমা দিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলার প্রস্তাবিত কমিটিতে জেলার এক সাবেক নেতা ও এমপির অনুসারীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই নেতা ইতোমধ্যে দলের কয়েকজন নেতাসহ কেন্দ্রীয় দফতরে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তাই জেলার কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে ঝামেলা মেঠাতে গত সপ্তাহে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ঝটিকা সফরে ঠাঁকুরগাঁও যান।সেখানে পাক বাহিনীর সহযোগী হিসাবে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, এমন একজনকে কমিটিতে জায়গা দেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শনিবার প্রায় সাত মাস পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৯ মার্চ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর করোনা মহামারী সংক্রমণ শুরু হলে সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত রেখে সীমিত পরিসরে কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছিল দলটি। -সারাবাংলা

 

Developed by :