Tuesday, 2 June, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ইন্তেকাল।। এমপি নাহিদসহ বিশিষ্টজনের শোক

বার্তা ডেস্ক: জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ছেলে আনন্দ জামান জানান, বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে তার বাবার মৃত্যু হয়।

ড. আনিসুজ্জামানের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত ২৭ এপ্রিল হৃদরোগ সমস্যার পাশাপাশি কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতা, পারকিনসন্স, প্রোস্টেটের সমস্যা ও রক্তে সংক্রমণের সমস্যা নিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এরপর গত শনিবার অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার সেখানেই মারা যান তিনি।

আনিসুজ্জামান স্যারের প্রতি এমপি নাহিদ এর  শ্রদ্ধাঞ্জলি

অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এর মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি।

তাঁর মৃত্যুতে অশ্রুসিক্ত এমপি নাহিদ গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যার আমাদের দেশের এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, লেখক, প্রগতিশীল গণমুখী বুদ্ধিজীবি হিসাবে সর্বজন স্বীকৃত।’

নাহিদ বলেন, ‘ষাটের দশকে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি তখন তিনি তরুণ জনপ্রিয় শিক্ষক। প্রগতিশীল ভূমিকা ও ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের কারণে আইয়ুব খানের অনুগত ভিসি ওসমান গনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতে বাধ্য করে।স্বাধীনতার পরে তিনি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।’

সাবেক মন্ত্রী আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধসহ সকল প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই আনিসুজ্জামান স্যারের সাথে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। সব সময়ই তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করেছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আনিসুজ্জামান স্যারের মৃত্যুতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। স্যারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুন।’

এছাড়াও  অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দ্বারকেশ চন্দ্র নাথ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি লোকমান আহমদ, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সুয়েব, দৈনিক সিলেটের ডাক এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ, সিলেটস্থ বিয়ানীবাজার সমিতির সভাপতি ডা. ফয়েজ উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মহব্বত আলী, বিয়ানীবাজার থানা জনকল্যাণ সমিতি ইউকে’র সভাপতি মামুন রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল হোসেন মুন্না, জালালাবাদ এসোসিয়েশন ইউকে’র সাংগঠনিক সম্পাদক জুবের আহমদ, সাপ্তাহিক বিয়ানীবাজার বার্তা পত্রিকার সম্পাদক ছাদেক আহমদ আজাদ, বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামাল হোসেন প্রমুখ।

পৃথক শোকবার্তায় নেতৃবৃন্দ মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

একনজরে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান

কিছু মানুষ নিজের কর্ম ও পরিচয়ের গুণে ধীরে ধীরে একটি জাতির জন্য মহিরুহসম আকার ধারণ করেন। জাতির বাতিঘর, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তেমনই একজন। কয়েক প্রজন্মের প্রিয় শিক্ষক এই বাতিঘর তাই সর্বজনমান্য ‘স্যার’ হিসেবেই পরিচিত ও গণ্য ছিলেন। তিনি একাধারে বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক, ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, সংবিধানের অনুবাদক, স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রবর্তী মানুষ। দেশ ও মানুষের যে কোনো বিপর্যয়ে তিনি অতন্দ্র বাতিঘরের মতো যুক্তিনিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে নিরাবেগ মতামত ও দিকনির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এটিএম মোয়াজ্জেম ও মা সৈয়দা খাতুন। বাবা ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক আর মা গৃহিণী হলেও সাহিত্যের প্রতি ছিল তার আন্তরিক ভালোবাসা। আনিসুজ্জামানের পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন তার সময়ের একজন বরেণ্য লেখক ও সাংবাদিক।

ভারত ভাগের পর তার পরিবার এপার বাংলায় চলে আসে। তিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এছাড়া ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আনিসুজ্জামানের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

আনিসুজ্জামানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার পার্ক সার্কাস হাই স্কুলে। বাংলাদেশে চলে আসার পর খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে ঢাকার প্রিয়নাথ হাই স্কুল (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে আবার শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরে ভারত গমন করে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

আনিসুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে রয়েছে- মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, স্বরূপের সন্ধানে, Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity, , আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, পুরোনো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, কাল নিরবধি, বাংলা-ফারসি শব্দসংগ্রহ, আইন-শব্দকোষ ইত্যাদিসহ প্রায় পঞ্চাশটি গ্রন্থ।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও ১৯৮৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন। জীবনজুড়ে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আরও পেয়েছেন অলক্ত পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার। এ ছাড়াও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ও লাভ করেন।

 

Developed by :