Thursday, 4 June, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে অহেতুক নানা প্রশ্ন — ডা. আব্দুছ ছালাম

ডা. আব্দুছ ছালাম

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
করোনা নিয়ে আতংক,সরকারী তথ্য নিয়ে অহেতুক সন্দেহ, এসব নানা প্রশ্নের কি কোন উত্তর আছে?

বাংলাদেশে এত কম রোগী কেন? এত লোক বিদেশ থেকে আসলো, টেস্ট এতো কম হলো এতো মানুষ কাশি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, অনেকেই মৃত্যুবরন করছেন আইইডিসিআর

বলছেন সন্দেহভাজন এই সব অধিকাংশ রোগীদের মৃত্যুর পর ও পরীক্ষা করে কারো শরীরে কোভিড-১৯ পাওয়া যায় নি ! তাহলে কি সরকার তথ্য গোপন করছে? সিলেটে এখনও কোন রোগী সনাক্ত হয় নি । কিন্তু কেন? এই সব অনেক সন্দেহ,
বিভ্রান্তি, ভয় জন মনে বিরাজ করছে । কেন ছুটি বৃদ্ধি কিংবা কেন গনবিচ্ছিনতাকে আরো বেশী জোরদার করা হচ্ছে এসব নানা প্রশ্ন মানুষের মনে । এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ও সন্দেহ দুর করার জন্য অল্প কিছু তথ্য আমি দিতে চাই তাতে আশা করি কিছুটা হলেও সন্দেহ ও আতংক দুর হবে ।

১) করোনা মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি ড্রোপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সেটা যদি হয় ৩ ফুট দুরত্বের মধ্যে থেকে একজন আক্রান্ত মানুষ কথা বলে হাচি দেয় কিংবা কাশি দেয়। সেটা ৬ ফুট পর্যন্ত যেতে পারে যদি চিৎকার দিয়ে কথা বলে কিংবা খুব বেশী জুরে হাচি কিংবা কাশি দেয়। ড্রপলেটটা সেক্ষেত্রে সরাসরি সুস্থ পাশের লোকের নাকে মোখে ও চোখে গিয়ে লাগে এবং তিনি আক্রান্ত হন। একেকটা ড্রপলেটে ৩০০০ ও বেশী ভাইরাস থাকে এবং একটা হাচি/ কাশিতে হাজার হাজার ড্রপলেট তৈরী হয়ে উড়ে যায় এবং পতিত হয়। ৯০%ক্ষেত্রে এভাবেই রোগটি ছড়ায়।

২) মানুষের সংক্রমিত হাত চোখে মুখে কিংবা নাকে স্পর্শ করার মাধ্যমে।

*সংক্রমিত হাত বলতে করোনা রোগীর হাত এবং তাদের হাসি কাশি মোখের লালা, পায়খানা প্রস্রাব কিংবা অন্য কোন শরীরের নির্জাস( পুঁজ ইত্যাদি) যে সব হাতে লেগে যায় সেসব হাতকে বুঝায়। কিংবা যে সব জায়গায় করোনা রোগীর হাঁচি কাশির পর ড্রপলেট হিসাবে অবস্থান নেয় যেমন টেবিল চেয়ারের হাতল, দরজার হাতল, মোবাইল, চশমা, লিফ্টের কিংবা বৈদ্যুতিক বাতি বা ফেনের সুইচ, গাড়ির সিট , স্টিয়ারিং, এসির সুইচ , দরজার হাতল, খাবারের পাত্র, প্লেইট,পানির গ্লাস , চায়ের কাপ ,রোগীর কাপড়,
করোনায় মৃত ব্যক্তির শরীরের কোন অংশ, নির্জাস, কাপড় ইত্যাদির সংস্পর্শে আসা যে সব হাত।

* কি কারনে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সংক্রমণ কম?
কারণগুলি নিম্নরূপ

১) যদিও হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশে ঢুকেছেন বিমানে এবং বিভিন্ন স্হলবন্দরে ও নৌবন্দরে এমনকি অবৈধ পথে অগনিত সংখ্যক মানুষ বিদেশ ভ্রমন/ প্রত্যাগত হয়ে এসেছেন । তবে বিশ্ব মহামারি ঘোষনার পর এবং ১১ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী নিশ্চিত হওয়ার পর ক্রমেই এখন এইসব আসা যাওয়া কমে এসেছে। যখন এই ভ্রমণ কিংবা প্রত্যাবর্তন অবাধ ছিল তখন আল্লাহর রহমতে এই রোগ মহামারি রূপ ধারন করে নাই তাই এইসব প্রত্যাগতরা তেমন মাত্রায় সংক্রমণ নিয়ে বাংলাদেশে আসেন নি বলে আমার ধারনা। ১০০% সন্তুষ্টজনক না হলে ও আগতদের স্কিনিং করা হয়েছে এবং হোম কোয়ারেন্টাইনে কিংবা প্রতিষ্ঠানিক কোয়ারান্টাইনে রাখা হয়েছে । সেটা নিয়ে যে যত সমালোচনা করুক না কেন সেটা যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয়েছে।

২) দেরিতে হলেও স্কুল কলেজ ছুটি, অফিস আদালত বন্ধ, পরিবহন চলাচল সিমীত করা, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি বন্ধ করা , খাবারের দোকান, হোটেল- দোকানপাট বন্ধ, পর্যটন বন্ধ, রাস্তায় চলাচল সিমীত করা এইসব ব্যাপারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে আমার মনে হয়। সরকারে ঘরে ঘরে ত্রান বিতরনের সময়েউপযোগী পদক্ষেপ গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের ঘরে থাকাটাকে অনেকটাই নিশ্চিত করেছে। এইসব পদক্ষেপ অবস্থা অবলোকন স্বাপেক্ষে
আরো কয়েক সপ্তাহ ( মাস খানেক) দীর্ঘায়িত করা প্রয়োজন হতে পারে ।

৩) সর্বশেষ যে কারণটি বলতে চাই সেটা হলো বাংলাদেশের উষ্ণ ও গরম আবহাওয়ার জন্য রোগ বিস্তারে কিছুটা ধীর গতির সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। যদিও মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষেত্রে তাপমাত্রার কোন সুবিধাই নাই সেটা একদম সত্য। কিন্তু করোনার পরিবেশে টিকে থাকার ব্যাপারে কিছুটা সুবিধায় বাংলাদেশ আছে বলে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামত থেকে সেই সম্ভাবনার আবাস পাওয়া যায় -যেমন করোনা ভাইরাসটি একটি এনভেলাপ ভাইরাস যাহার বাহিরে একটা চর্বির আবরন রয়েছে যাহা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেশী তাপমাত্রায় এবং ৪০% এর বেশি আদ্রতায় পরিবেশে কোন শক্ত জিনিসের মধ্যে ( যেমন টেবিল, চেয়ার দরজার হাতল, লিফ্টের সুইস, কারেন্টের কিংবা ফেনের সুইস ইত্যাদিতে) ৩ দিনের বেশী বেচে থাকতে পারে না এবং কাপড় জাতিয় বস্তুতে ২ দিনের বেশী নহে। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে তৈরী করা সলোশন ( ০.০১%) ভাইরাসের চর্বির আবরনটা সহজেই নষ্ট করতে পারে এবং জীবানূটাকে অকেজো করতে পারে। এবং এই সহজলভ্য ব্লিচিং এর ব্যবহার অধিকাংশরাই করে যাচ্ছেন বলে আমার ধারনা । তাই আমরা আরো কিছুদিন (১মাস) জন বিচ্ছিন্নতা, ১মিটার দুরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যবিধিমালা, হাঁচি কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা হাত মেলানো ও কোলাকুলি পরিহার , সকল ক্ষেত্রে বারবার সাবান পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড যাবত হাত ধোয়ার অভ্যাস, অপরিষ্কার হাত দিয়ে নাক মুখ চোখ স্পর্শ না করার অভ্যাস করা এবং ক্ষেত্র বিশেষ মাস্ক ও হেন্ড গ্লাভস পরিধান করি বিশেষ করে হাসপাতালে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরার অভ্যাস করি এবং চিকিৎসক সহ সকল স্বাস্থ্য কর্মীকে এখনই সকল PPEব্যবহার করে রোগীর চিকিত্সা করার ব্যবস্থা যদি নিশ্চিত করা হয় তাহলে ইতালি ফ্রান্স আমেরিকার মতো অবস্থা আমাদের দেশে হবে না ইনশাল্লাহ।তাই আতংকিত না হয়ে আসুন সবাই মিলে সচেতন হই।

সবশেষে আরো একটা দীর্ঘ মেয়াদের আশংকা সম্বন্ধে বলতে চাই। করোনা বিশ্ব মহামারি ৩/ ৪ মাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত হলেও করোন ভাইরাস এই পৃথিবীতে বিভিন্নভাবে তার আচরন পরিবর্তন করে পেনডেমিক হিসাবে দেশে দেশে ১/২ বছর বিচরন করে পরবর্তীতে আবারো মহামারি রূপে আসতে পারে অথবা তার গোত্রের অন্যান্য যেকোন করোনা আবির্ভূত হয়ে নতুন মহামারি করতে পারে ।তাই এখন থেকেই সকলকে জাপানের মতো মাস্ক পরার অভ্যাস করতে হবে। সকল সংক্রমণ প্রতিরোধে চিরস্থায়ী ব্যবস্থা বিশেষ করে হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ (বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের) সঠিক এবং বিজ্ঞানসম্মত বর্জববস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সকল স্বাস্থ্যসেবাদাকারীকে universal precaution মেনে চলতে হবে এবং সে ব্যপারে নজরদারি জোরদার করতে হবে যেখানে সেখানে যেভাবে খুশি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক খোলা বন্ধ করতে হবে। অপরিকল্পিত এইসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক যদি একেকটা রোগের ষ্টোর হাউস হয় তবে ভবিষ্যতে এদেশে করোনার মতো সংক্রমণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

ডা. আব্দুছ ছালাম: পরিচালক, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

 

Developed by :