Thursday, 28 May, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




‘শহীদ নাহিদ আমার প্রথম মিছিলের প্রেরণা’

রুহুল আলম চৌধুরী উজ্জ্বল

ধর্মনিরেপক্ষ বৈষম্যহীন, গনতান্ত্রিক বাংলদেশ বি-নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে বহু ত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব তালিকায় যুক্ত হয়েছিল শেখ মুজিবের দেশ নামে একটি রাষ্ট্র “বাংলাদেশ’’ । সেই রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ সিলেটের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত হাওর-বাহর, টিলা,আনারস ও কমলা বাগান শোভীত একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা বিয়ানীবাজার। যার পূর্ব নাম ছিল পঞ্চখন্ড।

সিলেটের প্রথম রায় বাহাদুর হরে কৃষ্ণ রায় চৌধুরীর পুত্র কৃষ্ণ কিশোর পাল চৌধুরী এখানে একটি বাজার প্রতিষ্টা করেছিলেন । সেই সময়ের বাস্তবতায় বিহান বেলা অর্থাৎ সকাল বেলা এই হাট বসতো সেই থেকে বিয়ানীবাজার শব্দটি প্রচলিত। আর যুগে যুগে এই বিয়নীবাজার নামকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই এলাকার সময়ের সাহসী সন্তানেরা।

ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহের নেতা কমরেড অজয় ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে স্বাধীকার আন্দোলনের বীর শহীদ মনু মিয়া আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পূর্ণ মানবতাবাদী দার্শনিক শহীদ বুদ্ধিজীবীগোবিন্দ চন্দ দেব সহ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী অনেক বীর শহীদদের রক্তে লেখা একটি নাম “বিয়ানীবাজার”।

মুক্তিসংগ্রাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য,গৌরব আর অর্জনের অংশীদার সুরমা কুশিয়ারার আর সুনাই বেষ্টিত এই জনপদ সে অনেক কথা…!

আজকে আমার লিখার বিষয় কিন্তু বিয়নীবাজার নয়, আজকে লিখতে বসেছি একটি স্লোগানের স্মৃতি, একটি মিছিলের স্মৃতি আর কৈশরের প্রথম প্রহরের স্বপ্নযাত্রার একটি স্মৃতি রোমন্থন করতে।

কৈশরের প্রথম প্রহরের সেদিন বড় ভাই সিলেট “ল” কলেজের সাবেক জি.এস শফিউল আলম চৌধুরী সাগরকে দেখলাম ঘর হতে ব্যতি ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে। তার পিছন পিছন ছুটলাম আমরা দুই ভাই রফিকুল আলম চৌধুরী বাবু ও আমি। আমরা আবিষ্কার করলাম চাচাত ভাই শাহেলুর রেজা চৌধুরীকে নিয়ে একদল তরুণ আর যুবদের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আবেগ আর রাগে অভিমানে, প্রিয় বড় ভাইয়ের কন্ঠে উচ্চারিত একটি স্লোগান “খুনি তোদের রক্ষা নাই, খুন হয়েছে আমার ভাই,আমরা সবাই নাহিদ হব, নাহিদ হত্যার বদলা নিব”।

বলা বাহুল্য, যেহেতু আমার জন্ম বিয়নীবাজার উপজেলার ১নং আলীনগর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামে। সে সুবাদে আমার সম্মুখে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আলীনগর কেন্দ্রিক। সে যাক, আমরা দুই ভাই অবলোকন করলাম ক্ষুদ্র এই মিছিলটি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এই অঞ্চলের আওয়ামী লীগের অন্যতম সংগঠক হারুন হেলাল চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধকালীন একমাত্র হস্তলিখিত সাপ্তাহিক পত্রিকা “বাংলাদেশ” সম্পাদক আব্দুল মতিন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবহান খান কাঁচা, আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল জলিল, সেই সময়ের জাদরেল ছাত্রনেতা গোলাম মর্তুজা, আহবাবুর রহমান খান শিশু, ফজল আহমদ সহ অনেকের কথাই মনে পড়ছে।

মিছিলের পিছন সারিতে দাঁড়িয়ে অতি উৎসাহী আমরা দুজন আগ্রহ ভরে শুনেছিলাম মিছিল পরবর্তী প্রতিবাদ সভার আলোচনা । তাও পুরোপুরি বুঝতে না পেরে দারস্ত হয়েছিলাম আমার রাজনীতির প্রথম গুরু হারুন হেলাল চৌধুরীর। তিনি বললেন অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও গনতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শহীদদের তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত হল।

তারিখটি ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী তৎকালীন বি.এন.পি সরকারের পাতানো অবৈধ ও প্রহসনের নির্বাচনকে প্রতিহত করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ঘোষিত “মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্টার সংগ্রামে” চারখাইয়ের পল্লীশাসন সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সূর্যসেনানী, বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজ ছাত্রলীগ নেতা হুমায়ুন কবির চৌধুরী নাহিদ। যার আত্মত্যাগ বহুধা বিভক্ত আওয়ামী পরিবারকে শুধু ঐক্যবদ্ধ করে নাই, করেছিল এক পরিবার। সে সময়ের ছাত্র ও যুবনেতারা সেই শোক কে শক্তিতে পরিনত করে যে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছেন তা এখনও মুখে মুখে। সে সময়ের ছাত্র ও যুব নেতাদের মধ্যে হারুনুর রশীদ দিপু, জাদরেল ছাত্রনেতা আব্দুল বারী, বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি সারোয়ার আহমদ, দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আউয়াল, আব্দুল কুদ্দুছ টিটু, জেবুল আহমদ, আব্বাছ উদ্দিন, জুবের আহমদ প্রমুখ।

আন্দোলন সফলে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন বলেই পরবর্তীতে তার ফসল ঘরে তুলেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ভাবতে কষ্ট হয় ১৫ ফেব্রুয়ারী না আসলে অনেকে স্মরনই করেন না আমার প্রথম মিছিলের প্রেরনা হয়ে থাকা শহীদ নাহিদকে। আজকে অগ্রজ একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আমেরিকা প্রবাসি সারোয়ার ভাই আর আমি সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে কেবল হতাশ হই নি বরং হয়েছি বাকরুদ্ধ। মনে কেবল একটি অপরাধবোধ নূর হোসেন, আসাদ, মিলন, ওয়াজিল্লাহ আর শহীদ নাহিদদের রক্তের সাথে আমরা আপোষ করছি না তো?

লেখক: সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, শহীদ নাহিদ ব্লক ছাত্রলীগ।

 

Developed by :