Saturday, 5 December, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




শেষ সময়ে ‘ঐক্য’ ডাকসুতে

ডাকসুর কার্যকরী সভার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন ভিপি নুরুল হক নুর ও জিএস গোলাম রাব্বানী

আল সাদী ভূঁইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:  প্রায় তিন দশক পর আলোচিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু)। ডাকসুর ২৫ পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২৩টি পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ মনোনীত প্যানেলের প্রার্থী এবং সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সমাজসেবা সম্পাদক পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হন। এ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্র অধিকার পরিষদের যে বিরোধ চলছিল, তা দেখা যায় ডাকসুতেও। সেই বিরোধ-বিবাদে কেটে গেছে ডাকসুর ১১ মাস।

এ বিরোধের জমাট বাঁধা বরফ অবশেষে গলতে দেখা গেল শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি)। এদিন ডাকসুর বৈঠকের এজেন্ডায় রাখা হয় উভয়পক্ষের আলোচ্য বিষয়। এমনকি উত্থাপিত বিষয়ে উভয়পক্ষের নেতারাই একমত হন। বিরোধ মিটিয়ে সামনের দিনগুলোতে একসাথে কাজ করার কথা বলেছেন ভিপি-জিএস। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও আক্ষেপ করেছেন ফেলে আসা প্রায় ১১টি মাস নিয়ে।

প্রায় তিন দশক পর ২০১৯ সালের ১১ মার্চ বহুল কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আর সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুর প্রার্থী হন। জিতে যান নুরুল হক। জিএস পদে প্রার্থী হন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খান। এ পদে জিতে যান রাব্বানী।

ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে আসছেন, নির্বাচনের পর শোভনের অনুসারীসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নুরকে ভিপি মানতে পারেননি। সেজন্য নুর যেন ভিপি হিসেবে কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে ও গোপনে বিভিন্নভাবে বাধা দিতে থাকে। সেই সাথে নুরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত সমাজসেবা সম্পাদকের বিভিন্ন কার্যক্রমেও বাধা-বিঘ্নের সৃষ্টি করা হয়। সেজন্যই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর দুই নেতা তেমন কোনো কার্যক্রম দেখাতে পারেননি।

একই ধরনের অভিযোগ উঠছিল ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেও। তারা বলে আসছিল, ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদকের কারণে শিক্ষার্থীবান্ধব দাবি আদায়ে এগোনো যায়নি। সেজন্য ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত বিভিন্ন সম্পাদক আলাদাভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।

এ কারণে ছাত্রলীগের প্যানেলের নির্বাচিত সম্পাদকদের অনুষ্ঠানে ভিপিকে দাওয়াত দেয়া হতো না অথবা ভিপি যেতেন না। আবার ভিপি বা সমাজসেবা সম্পাদকের অনুষ্ঠানে জিএস-এজিএসসহ অন্য সম্পাদকরা আসতেন না।

ভিপি-সমাজসেবা সম্পাদকের কিছু কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগও পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়। এমনকি গত ২২ ডিসেম্বর ডাকসুতে হামলা চালিয়ে ভিপি নুরুল হক নুরসহ ৩৫ জনকে পিটিয়ে জখম করার ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে দায়ী করা হলেও অভিযোগের তীর যাচ্ছিল ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেনসহ ছাত্রলীগের নেতাদের দিকে

তবে সব বিরোধ যেন ‘মুছে’ যায় গত শনিবার অনুষ্ঠিত ডাকসুর কার্যকরী সভায়। সভায় দুই পক্ষের উত্থাপিত এজেন্ডা নিয়ে একমত প্রকাশ করতে দেখা যায় নেতাদের। উভয়েই সব দাবির সাথে একমত হন। যদিও এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে শুরুতে বাহাস দেখা যায়। পরে দুই পক্ষের মতৈক্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি উত্থাপিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তা মানার বিষয়ে আশ্বস্ত করে। এর আগে প্রশাসন ছাত্রলীগের নির্বাচিতদের বিভিন্ন দাবি মানলেও ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নির্বাচিতদের দাবি মানছিল না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এজেন্ডা নিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেলের ‘বিদ্রোহ’
ডাকসুর কার্যকরী সভায় উত্থাপিত দাবির বিষয়ে বিবদমান উভয়পক্ষ একমত হলেও শুরুতে এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধিতা দেখা যায়। ছাত্রলীগের প্যানেলের নির্বাচিত কয়েকজন সম্পাদককেও এই বিরোধিতায় দেখা যায়। তারা দাবি করেন, ডাকসুর জিএস (গোলাম রাব্বানী) নিজের ইচ্ছেমতো কারও সাথে আলোচনা না করে এজেন্ডা ঠিক করেছেন।

DUCSU

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবন

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, শুরুতে সভার এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের পাশাপাশি ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে আসা কয়েকজন সম্পাদক ও সদস্যও অভিযোগ করেন, তাদের সাথে কোনো আলোচনা না করে জিএস ও এজিএস নিজেদের মনগড়া কিছু বিষয়কে সভার এজেন্ডা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ও ছাত্রলীগের প্যানেলের নির্বাচিত নেতাদের তোপের মুখে এজেন্ডা সংশোধনে বাধ্য হন ডাকসু জিএস-এজিএস।

ডাকসুর সভার এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী বলেন, ডাকসুর কার্যনির্বাহী সভায় যে এজেন্ডা রাখা হয়েছে তা নিয়ে ডাকসুতে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

আলোচনা না করে কীভাবে ও কোথা থেকে এসব এজেন্ডা কে আনলো সে প্রশ্ন তুলে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত আর্কাইভ সেখানে কেন মুক্তিযুদ্ধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলো না? ডাকসুর অনেক সম্পাদকের সাথে কথা না বলে এ এজেন্ডায় স্বাক্ষর করেছেন জিএস।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারও সাথে আলোচনা না করার অভিযোগ অস্বীকার করেন ডাকসু জিএস গোলাম রাব্বানী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা দুবার এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করেছি। কেউ যদি না থাকেন, তাহলে আমরা কীভাবে তাদের এজেন্ডা উল্লেখ করবো? যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের এজেন্ডা এখানে রাখা হয়েছে।

এজেন্ডা নির্ধারণ নিয়ে আগে আলোচনা হয়নি দাবি করে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, যদি ডাকসুতে এজেন্ডা নিয়ে কোনো আলোচনা হতো, ভিপি হিসেবে আমি জানতাম। জিএস কার সাথে আলোচনা করে প্রথমে এজেন্ডা ঠিক করলেন, তা আমি বুঝতে পারছি না। প্রথমে যেসব এজেন্ডা রাখা হয়েছে তাতে দেখা যায় ছাত্রদের কোনো আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। ডাকসুর অন্য নেতারা শেষ সময়ে হলেও বুঝতে পেরেছেন, ডাকসুতে থাকতে হলে ছাত্রলীগের স্বার্থ বাদ দিয়ে ছাত্রদের স্বার্থ ভাবতে হবে।

ঐক্য কীভাবে
ডাকসুর বর্তমান কমিটির মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। মাত্র ৪৪ দিন সময় আছে এই কমিটির। নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার্থীদের কোনো মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়নি। এতে সামনের নির্বাচনে উভয়পক্ষের ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে। সামনে ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের ‘ইমেজ ক্লিন’ রাখার জন্য উভয়পক্ষ ছাত্রদের সংশ্লিষ্ট কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী জাগো নিউজকে বলেন, ছাত্রদের অধিকার সংশ্লিষ্ট কাজ করার জন্য ডাকসুর নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ভিপির সাথে আমাদের মতবিরোধ আছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে আমরা শেষে হলেও এক হতে পেরেছি। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ভিপির রুমে গিয়েছি, তার সাথে কথা বলেছি। তাকে অনেক কিছু বুঝিয়েছি। তিনি বুঝতে পেরেছেন। আমরা এখন সবকিছু বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছি।

এক হওয়ার ব্যাপারটি কেন শেষ সময়েই হলো- এ প্রশ্নের জবাবে জিএস বলেন, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে। এখনও যদি একসাথে কাজ করি, তাহলে আমরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায় করতে সক্ষম হবো।

এ বিষয়ে ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, আমরা অনেক দিন পর ডাকসুতে একটি প্রাণবন্ত আলোচনা করেছি। এতে ছাত্রলীগের সাথে আমাদের তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি। আমরা একে অপরের কথা শুনেছি। প্রত্যেকে ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছি। শুরু থেকে এসব (বিরোধ) না চললে শিক্ষার্থীরা ডাকসু থেকে অনেক কিছু পেত। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত একসাথে কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করবো।

 




সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :