Wednesday, 7 December, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ প্রকাশনা সংক্রান্ত মামলা

ড. রাগীব আলী ও আব্দুল হাই বেকসুর খালাস

সিলেট: দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকা প্রকাশ সংক্রান্ত মামলা থেকে পত্রিকাটির সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক ড. রাগীব আলী ও সম্পাদক আব্দুল হাইকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।

গতকাল বুধবার সিলেটের জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালত-এর বিচারক মোঃ শরীফ উদ্দীন এই আদেশ দেন।

ওই মামলায় ২০১৭ সালের ৯ মার্চ দৈনিক সিলেটের ডাক-এর সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি দেশের বরেণ্য শিল্পপতি দানবীর ড. রাগীব আলী ও পত্রিকার সম্পাদক তাঁর ছেলে আব্দুল হাইকে এক বছর করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়েছিলেন আদালত। আসামী পক্ষ সাজা ও দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করেছিলেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ভূমি সংক্রান্ত দুটি মামলায় ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট সিলেটের আদালত ড. রাগীব আলী ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই সময়ে চিকিৎসা নিতে ভারতে যান ড. রাগীব আলী ও আব্দুল হাই। গ্রেফতারি পরওয়ানা নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থানকালে রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকায় রাগীব আলীর নাম প্রকাশক ও তাঁর ছেলে আব্দুল হাইয়ের নাম সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়।

গ্রেফতারি পরওয়ানাভুক্ত হওয়ার পর বিদেশে থাকাবস্থায় পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে প্রকাশক ড. রাগীব আলী ও সম্পাদক আব্দুল হাই পাঠকদের সাথে প্রতারণা করেছেন এমন অভিযোগে ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নগরীর উপশহরের বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন তালুকদার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। পরের বছরের ৯ মার্চ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ৯ মার্চ ওই মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করেন ড. রাগীব আলী ও আব্দুল হাই। পত্রিকা প্রকাশ সংক্রান্ত মামলাসহ তিনটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন রাগীব আলী ও আব্দুল হাই। এরপর রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন আসামীপক্ষ। গতকাল বুধবার ওই মামলায় আসামী শিল্পপতি ড. রাগীব আলী ও আব্দুল হাইকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন স্পেশাল পিপি মো. নওশাদ আহমদ চৌধুরী এবং আসামী পক্ষে ছিলেন এডভোকেট ময়নুল ইসলাম।

অপরদিকে, ২০১৭ সালের ১৮ জুন পত্রিকা প্রকাশ সংক্রান্ত মামলা দায়েরের আগেই শিল্পপতি ড. রাগীব আলী সাজাপ্রাপ্ত অভিযোগ এনে এক দুষ্কৃতকারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁর মালিকানাধীন পত্রিকা ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’-এর প্রকাশনার অনুমোদন বাতিল করে দেন সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার। ৩৩ বছরের পুরনো পত্রিকাটি ৩২৫ তম সংখ্যা প্রকাশ করে তখন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পত্রিকাটি প্রকাশে কোনো বাধা নেই বলে আদেশ দেন। পরদিন থেকে সিলেট অঞ্চলের ব্যাপক পাঠকপ্রিয়, সর্বাধিক পঠিত ‘দৈনিক সিলেটের ডাক’ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

মামলার পর্যবেক্ষণে যা বলেছেন আদালত-

দৈনিক সিলেটের ডাক প্রকাশনা সংক্রান্ত মামলায় বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত ।

রায়ের পর্যবেক্ষণে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালত, সিলেট-এর বিচারক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আসামী রাগীব আলী ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন, ১৯৭৬ এর বিধান লঙ্ঘন করেছেন, উহা প্রতীয়মান হয় না। এমনকি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সিলেট এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় নাই।’

পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ‘আসামীদ্বয় জি আর ৯৭৪/২০০৫ এবং ১১৪৬/২০০৫ নম্বর মামলায় পলাতক হলেও তারা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসাবে পত্রিকাটি ছাপাতে পারবে না-এ রকম বিধান বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নেই। আসামীরা মামলায় পলাতক থাকিয়া তাদের সংবাদপত্রে তাদের নাম প্রকাশক ও সম্পাদক হিসাবে প্রকাশ করিয়া কোনো প্রতারণা করিয়াছে এবং কাউকে অসাধুভাবে প্রলুব্ধ করেছে যার দ্বারা কারো দেহ, মনে, সম্মানে ও সম্পত্তিতে ক্ষতি হইয়াছে উহা প্রতীয়মান হয় না। কাজেই দেখা যায়, অত্র মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪১৭ ধারার কোনো উপাদান নাই।’

পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ‘মূল মামলায় আসামী/আপীল্যান্টগণকে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারার বিধানমতে পরীক্ষা করা হয় নাই। অথচ বিজ্ঞ নিম্ন আদালত তর্কিত রায়ে উল্লেখ করেন যে, আসামীদের গত ০২.০৩.২০১৭ ইং তারিখে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়। ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারার বিধানমতে আসামীদের পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক এবং উহা প্রতিপালন না করিয়া বিজ্ঞ নিম্ন আদালত মূল মামলায় আইনগত ত্রুটি করিয়াছেন।

এই প্রসঙ্গে আসামী/আপীল্যান্টপক্ষে বিজ্ঞ কৌসুলী মহামান্য উচ্চ আদালতের 54 DLR AD Page-60, 43 DLR AD Page-62 এবং 64 DLR Page-438 এর উদ্ধৃত নজিরের সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন। উক্ত নজির পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিজ্ঞ নিম্ন আদালত আসামীদের ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারার বিধানমতে পরীক্ষা না করিয়া আইনত অন্যায় করিয়াছেন।

বিজ্ঞ নিম্ন আদালতের রায় ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মূল মামলায় বিজ্ঞ নিম্ন আদালত কোনো না কোনো কারণে অতি উৎসাহের বশবর্তী হইয়া আইনের বিধি বিধান সঠিকভাবে প্রতিপালন না করিয়া অন্যায়ভাবে আসামীদের সাজা প্রদান করিয়াছেন।’

‘সাক্ষীদের সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় ইহাই অত্র কোর্টের অভিমত হয় যে, প্রসিকিউশনপক্ষ আসামীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। এমতাবস্থায় বিজ্ঞ আদালত, বিজ্ঞ নিম্ন আদালতের তর্কিত রায় ও দন্ডাদেশ হস্তক্ষেপযোগ্য বিধায় অত্র মামলাটি মঞ্জুরের সিদ্ধান্ত হইল।’

 

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :