Monday, 24 February, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




১০০ বছর পর ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেট অঞ্চল

সাঈদ নোমান

১৯১৮ সালের পর ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হিসেবে সিলেট অঞ্চলে ভূকম্পন হয়েছে গতকাল সোমবার। গবেষকদের কাছে, ভূমিকম্পের ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে খ্যাত সিলেট অঞ্চলে ডাউকি ফল্টের পাশে বাংলাদেশের সিলেটের সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাট-কানাইঘাট এলাকায় গতকাল সোমবার বেলা ১টা ১০ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে রিখটার স্কেল ৪ দশমিক ১ মাত্রায় এ ভূ-কম্পন অনুভূত হয়।

সর্বশেষ সিলেটের শ্রীমঙ্গলে উৎপত্তিস্থল হিসেবে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই রিখটার স্কেলে ৭.৬ মাত্রার ভূকম্পন হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় ১শ’ বছর পর পর বেশি মাত্রার ভূকম্পন হয়ে থাকে। ডাউকি ফল্টে শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে সিলেট অঞ্চলে বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

নগরবাসীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে, গতকালের ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে তাদের মধ্যে অনেকটা আতংক তৈরী হয়। আতঙ্কে অনেকে বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে বের হয়ে আসেন রাস্তায়। ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার পর সিলেট নগরীর বিভিন্ন বাসা, মার্কেট ও অফিস থেকে আতঙ্কিত লোকজনকে রাস্তায় বের হয়ে আসতে দেখা যায়। এ সময় মার্কেটের ক্রেতারা দৌড়াদৌড়িও শুরু করেন। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

সিলেটের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমেদ চৌধুরী জানান, এ অঞ্চলে সাধারণত ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত ও মায়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে ভূকম্পন হয়ে থাকে। সর্বশেষ ১৯১৮ সালে উৎপত্তিস্থল হিসেবে সিলেট অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিলো। ৭.৬ রিখটার স্কেল মাত্রার এ ভূকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিলো বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। প্রায় শতাধিক বছর পর গতকাল সোমবার সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট উপজেলার মধ্যবর্তী স্থান থেকে ভূ-কম্পনের উৎপত্তি হয়েছে। তিনি জানান, শ্রীমঙ্গল ইস্টার্ণ ফল্টের সাইড লাইনে অবস্থিত। আর গোয়াইনঘাট অবস্থিত ডাউকি ফল্টে।

আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমেদ চৌধুরী আরো বলেন, ডাউকি ফল্ট হচ্ছে বাংলদেশের উত্তরপূর্ব কোণের সিলেট অঞ্চলে। কিন্তু, এই ফল্টের অবস্থান সিলেট জেলার সীমান্ত উপজেলা গোয়াইনঘাট থেকে ২৪ কিলোমিটার ছাড়িয়ে ভারতের ভিতরে। তিনি বলেন, সোমবারের কম্পন ছিল মৃদু। আগারগাঁওয়ে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব ছিল ২০৫ কিলোমিটার উত্তরপূর্বে। গতকালের ভূমিকম্পের ভার্টিকেল () মুভমেন্ট হয়নি। এ ভূমিকম্প হয়েছে নিচের দিকে ঝাঁকুনি দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আর্থ অবজারভেটরির’ গবেষক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার তাঁর গবেষণা মডেলে ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের দুই দিকের ভূ-গঠনে শক্তিশালী ভূমিকম্পের শক্তি জমা হয়েছে। এর একটা হচ্ছে উত্তরপূর্ব কোণে সিলেট অঞ্চলের ডাউকি ফল্টে, আরেকটা হচ্ছে পূর্বে চিটাগাং ত্রিপুরা বেল্টের পাহাড়ি অঞ্চলে। এখানে দুটি বড় ধরণের ভূমিকম্প বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ।

ইতিহাস বলছে, ১৫৪৮ সালে প্রচন্ড ভূমিকম্পে সিলেট এলাকায় ব্যাপক ভূ-পরিবর্তন ঘটে। উঁচু-নিচু ভূমি সমতলে পরিণত হয়। এরপর ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৮১২ ও ১৮৬৯ সালের ভূমিকম্পে সিলেটের মানচিত্র অনেকটাই পাল্টে যায়।

সিলেটে এ যাবৎকালের মধ্যে ১৮৯৭ সালের ১২ জুন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সংঘটিত ভূমিকম্প ‘ গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থ কোয়াক’ নামে পরিচিত। ৮ দশমিক ৭ মাত্রার সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পাকা দালানকোঠার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। শুধু সিলেট জেলারই ৫৪৫টি ভবন ভেঙে পড়ে। মারা যান অনেক মানুষ। ওই ভূমিকম্পের ফলেই সিলেট জুড়ে সৃষ্টি হয় বিশালাকারের হাওর, বিল, জলাশয়ের।

সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ১০০ বছর পর সোমবার সিলেটে যে ভূকম্পন হয়েছে, সেটাকে বিপদ সংকেত হিসেবে ধরে নিতে হবে। কারণ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল গোয়াইনঘাট ডাউকি ফল্টের কাছাকাছি।’

সিলেট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক কোবাদ আলী সরকার বলেন, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেটের গোয়াইনঘাট বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে। ভূমিকম্পে কোথাও কোন ক্ষয়-ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানান এ কর্মকর্তা।

 

Developed by :