Monday, 17 February, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




ফিজা’য় মূসক ফাঁকি : টাকা থেকে বঞ্চিত সরকার

সিলেট:  মাসের পর মাস মূসক (মূল্য সংযোজন কর) ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল নেতা নজরুল ইসলাম বাবুলের মালিকানাধীন ফিজা এন্ড কোং পরিচালিত সুপারশপগুলোতে। ব্যবসায় অধিক মুনাফা অর্জনের লোভে মূসক প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে সরকারকে।

বিক্রেতাদের সরবরাহকৃত চালানে সরবরাহ ভ্যাট ৫% ফাঁকির বিষয়টি পরিষ্কার থাকলেও বিষয়টি এতোদিন নজরে আসেনি কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট এর কর্মকর্তাদের। অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে ফিজা এন্ড কোং এর সুপারশপসমূহ।

নতুন আইনে দেশের সকল সুপারশপে মূসক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। মূসক প্রদানের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূসক প্রদানে বাধ্য করতে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সুপারশপসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানগুলোতে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) বাধ্যতামূলক করে।

কিন্তু, ফিজায় এ সিস্টেম মানা হচ্ছে না। তবে, অনেক প্রতিষ্ঠানে ইসিআর সিস্টেমেই চলছে বেশিরভাগ ভ্যাট সংগ্রহ কার্যক্রম। সর্বশেষ এনবিআর এবার ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) সংযোজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই সারা দেশে ১০ হাজার ইএফডি মেশিন সংযোজন করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ফিজা এন্ড কোং এর বিভিন্ন শাখায় মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার পরিবেশনও সংরক্ষণ এবং কারখানায় নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরীর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয় বিভিন্ন সময়ে।

তবে, দীর্ঘদিন থেকে মূসক ফাঁকি দিয়ে আসলেও রহস্যজনক কারণে এ বিষয়টি এড়িয়ে চলছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। নগরীর সুবহানীঘাট, সুবিদবাজার ও শহরতলীর মেজরটিলায় বৃহৎ একটি সুপারশপ পরিচালনা করছে ফিজা এন্ড কোং। এসব সুপারশপে মূসক গ্রহণ কিংবা প্রদানের কোন ধার ধারছে না। এতে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অভিযোগ রয়েছে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করলেও কারসাজির মাধ্যমে বিক্রি কম দেখিয়ে ভ্যাট ইন্সপেক্টর ও কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সরকারকে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে এ প্রতিষ্ঠান।

শহরতলীর মেজরটিলায় ফিজার সুাপারশপ থেকে পণ্য ক্রয় করেন মেজরটিলার বাসিন্দা হাফছা খানম। তার পয়েন্ট অব সেইল (পজ/চালান) পর্যালোচনায় দেখা যায়, পজ এ ভ্যাট অপশনটিতে শুন্য লেখা রয়েছে। অথচ এর বিপরীতে স্বপ্নসহ অন্য একাধিক সুপারশপেও পণ্যের সাথে সরবরাহ ভ্যাট ৫% যুক্ত করে বিল পরিবেশন করা হয়ে থাকে। ফিজার ক্রেতাকে দেয়া চালানে পরিষ্কার লেখা রয়েছে-ভ্যাট শুন্য।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পণ্যের গায়ে যদি ভ্যাট ইনক্লুড মূল্য লেখাও থাকে ; তবুও এর সাথে ৫% সরবরাহ ভ্যাট আদায় করার কথা। কিন্তু, অধিক ক্রেতা আকৃষ্ট করতে ফিজা সরবরাহ ভ্যাট যুক্ত করছে না। এতে ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার। একই অবস্থা ফিজার সুবহানীঘাট কিংবা সুবিদবাজার শাখায়ও।

ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, ফিজার সবকটি শাখায় ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সিলেট চেম্বার অব কমার্স এর পরিচালক ফিজার মালিক নজরুল ইসলাম বাবুল মূসক গোয়েন্দা দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাসোয়ারা দিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন। ফিজার ক্রেতাদের দেয়া চালানে সরাসরি সরবরাহ ভ্যাট উল্লেখ না থাকা ভ্যাট কর্মকর্তাদের নজরে না আসার বিষয়টিও রহস্যজনক বলে মনে করেন অনেকেই।

কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট এর একটি সূত্র জানায়, ফিজা এন্ড কোং এর সুপারশপ এর সুবহানীঘাট শাখা পরিদর্শন করেন কাস্টমসের ইন্সপেক্টর সাজেদুল করিম। মূলত ওই ইন্সপেক্টরকে ম্যানেজ করেই চলছে মূসক ফাঁকি। একইভাবে প্রদীপ নামের আরেক ইন্সপেক্টর ফিজার অন্য শাখা পরিদর্শনের সাথে জড়িত। এদের সাথে যোগাযোগ করা হলে একজন অন্যজনের উপর দায় চাপান। ইন্সপেক্টর সাজেদুল করিম জানান, সরবরাহ ভ্যাট কেন নেয়া হচ্ছে না তা জেনে জানাতে হবে।

কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট এর রাজস্ব কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম জানান, সাধারণত মাস শেষে ইসিআর মেশিন এর তথ্য বা রেজিষ্টার খাতা দেখে ভ্যাট সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। তবে প্রতিপণ্যে মূল্যের সাথে ৫% সরবরাহ ভ্যাট নেয়া বাধ্যতামূলক। ফিজার বিক্রয় চালানে ভ্যাট অপশনে শুন্য থাকার বিষয়টি অনিয়ম বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নজরে যখন এসেছে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ফিজা এন্ড কোং এর ডিজিএম আব্দুর রশিদ লস্করের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। ভ্যাট আদান প্রদানের বিষয়ে তার কোন তথ্য জানা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে জিএম ইহতেশাম মাবরুরও কোন মন্তব্য করতে চান না বলে জানান আব্দুর রশিদ।

সিলেট ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম পাঠান বলেন, ভ্যাট এখন বড়লোকের বড় লোক হওয়ার একটি সহজ মাধ্যমে রূপ নিয়েছে। দেশের বেশিরভাগ সুপারশপে শুভংকরের ফাঁকি চলছে। অনেকেই সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে ভ্যাট নিয়ে নানাভাবে ফন্দি এঁটে সরকারকে প্রদান করছে না। আবার কেউ কেউ ব্যবসায় অধিক মুনাফার জন্য ভ্যাট নিচ্ছেনই না। ফিজার সুপারশপগুলোতে পণ্যে সংযোজিত মুল্যের সাথে সরবরাহ ভ্যাট যুক্ত না করার বিষয়টি কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে আসেনি তা রহস্যজনক বলেও মন্তব্য করেন।

কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট সিলেট এর সহকারী কমিশনার রবীন্দ্র কুমার সিংহ জানান, ৪/৫ দিন আগে তিনি এ অফিসে যোগদান করেছেন। ফিজা সুপারশপের মূসক ফাঁকির বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। তথ্যে উপাত্তে অনিয়ম ধরা পড়লে অবশ্যই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফিজার ক্রেতাদের দেয়া চালানের ভ্যাটের অপশনটি শুন্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে এতে কোন ঘাটতি রয়েছে বলে তার ধারণা। -সিলেটের ডাক

 

Developed by :