Wednesday, 27 May, 2020 খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |




স্মরণ

‘বিউটি অব পলিটিক্স’ সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

সাইফুল হক মোল্লা দুলু   

স্বচ্ছ ও নির্মোহ রাজনীতির প্রাণপুরুষ, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর এই দিনে দীর্ঘ রোগভোগের পর থাইল্যান্ডের বামরুদগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি তার পিতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের যোগ্য উত্তরসূরি, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। পিতার কর্মস্থল ময়মনসিংহ শহরে তার জন্ম। তার পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের বীরদামপাড়া গ্রামে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৬৮ সালে ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা সফরে লন্ডন যান। এ সময় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম শহীদ হলে তিনি লন্ডনে থেকে যান।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ময়মনসিংহ শহরে স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরবর্তীকালে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র রাজনীতি শেষে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিমান, পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০১ সালে সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এক-এগারোতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় মুখপাত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল কারাগারে থাকায় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগের সেই দুঃসময়ে। দলকে আরও শক্তিশালী করে শেখ হাসিনাকে মুক্ত ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় সরকার ও পলল্গী উন্নয়ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে অতিকথন ও ক্ষমতার দম্ভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। কূপমণ্ডূকতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি একজন উদার পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদের মতোই নীরবে-নিভৃতে পথ হেঁটেছেন। তদবিরবাজ, মতলববাজ, সুবিধাবাদীরা যেমন তার কাছে ভিড়তে পারেননি, তেমনি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারে নূ্যনতম কলঙ্কের ছিটেফোঁটাও তার গায়ে লাগেনি।

কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা শিলা ইসলাম ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর পর থেকেই অন্তরালে চলে যান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজনীতির এই বরপুত্র।

কিশোরগঞ্জের আধুনিকায়নে তার ভাবনা ছিল অসাধারণ। এ মাটির ফুসফুস বা প্রাণপ্রবাহ নরসুন্দার নব্য ফিরে পেতে তার আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। এ জন্য উদ্যোগও তিনি গ্রহণ করেছিলেন। শহরের উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিকায়নে একটি মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু কূটিল-জটিল রাজনীতি ও সীমাহীন লোভ-লালসার অন্তরালে অধিকাংশ আশাই তার পূরণ হয়নি।

তার একান্ত আগ্রহ ও বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে কিশোরগঞ্জে গড়ে উঠেছে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। যেমনটি তার বাবা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিল প্রতিষ্ঠা করে হাজার হাজার শ্রমজীবীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণের আগেই তাকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মনে করতেন, জনগণই রাজনৈতিক দলের গণভিত্তি হবে, শুধু কোনো পোশাকী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক সরকার পরিচালনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সততা ও সহিষুষ্ণতা রাজনৈতিক নেতাদের আদর্শ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলেও তিনি বিশ্বাস করতেন। তিনি ছিলেন একজন সৎ ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতার রোল মডেল। মৃত্যু দিবসে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

 

Developed by :