Friday, 13 December, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




৫০০ টাকায় ক্যান্সার পরীক্ষার পদ্ধতি আবিষ্কার, নেতৃত্বে ডঃ ইয়াসমিন

শর্মা লুনা: আমাদের দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর পরিমাণে বাড়ছে আশংকাজনক হারে। খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাদ্য প্রস্তুতে নিম্নমানের রাসায়নিকের ব্যবহার, মাটি দূষণ, ঔষধের অপর্যাপ্ততা, বাজে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম না করা, ধূমপান, মাদকাসক্তি এবং সর্বোপরি অসচেতনতার কারণে ক্যান্সার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে ক্যান্সার রোগী এবং রোগীর পরিবারের জন্য। কেননা, বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রচুর সময় ও লাগে শুধু চিহ্নিত করতেই। ক্যান্সার ধরা পড়ার পরেও চলে এর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। তখন রোগীর পরিবারের প্রচুর অর্থ খরচ হয়, বেশীরভাগই নিঃস্ব রিক্ত ও হত দরিদ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের পক্ষে ক্যান্সারের ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব, যদিও ক্যান্সারের অনিবার্য হাত থেকে এদের মুক্তি মেলেনা।

ডঃ ইয়াসমিন ও তাঁর দলের উদ্ভাবন

 এরকম একটি পরিস্থিতিতে ডঃ ইয়াসমিনের কাছ থেকে আমরা পেলাম দারুণ একটি আশার বানী। ডঃ ইয়াসমিন হক  একজন পদার্থবিদ, বিজ্ঞানী। তিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

গত ২৩ বছর ধরে তিনি এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল গবেষণার এক পর্যায়ে আবিষ্কার করেন ক্যান্সার চিহ্নিতকরণের সহজ উপায়। তারা মানবদেহের রক্তের মধ্যে এমন কিছু ‘বায়োমার্কার’ খুঁজে পেয়েছেন, যা ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে সাড়া দেয়। নন-লিনিয়ার অপটিকসে’র পদ্ধতি প্রয়োগ করেই রক্তের মধ্যে ওই ধরনের বায়োমার্কার খুঁজতে শুরু করেছিলেন, যাতে অবশেষে সাফল্য মিলেছে।

তাঁরা আশা করছেন যে ক্যান্সার পরীক্ষার একটি ‘ডিভাইস’ বা যন্ত্র এক বছরের মধ্যেই তৈরি করে ফেলা সম্ভব হতে পারে যার মাধ্যমে মাত্র ৫০০ টাকায় ৫ মিনিটের মধ্যে ক্যান্সার চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে কিনা  জানতে চাইলে তিনি বলেন,

“দেখুন, আমরা একটা যুগান্তকারী কাজ করেছি কিংবা ক্যান্সার শনাক্তকরণে বিপ্লব এনে দিচ্ছি – এত বড় বড় কথা আমরা বলতে চাই না।…কিন্তু আমরা অবশ্যই দারুণ এক্সাইটেড – কারণ আমরা ক্যান্সার রোগীদের রক্তে একটা মারাত্মক পরিবর্তন ধরতে পেরেছি, যেটা নীরোগ মানুষদের তুলনায় ভীষণ, ভীষণ আলাদা!”

নন-লিনিয়ার অপটিক্স কি

কোনো বস্তুর সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ায় বস্তুটিকে দৃশ্যমান করার বিষয় নিয়ে নন-লিনিয়ার অপটিক্স আলোচনা করে। তীব্র আলোর সংস্পর্শে এলে মাধ্যমগুলোর আলোকীয় ধর্মের পরিবর্তন হতে শুরু করে এবং তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বা মাধ্যমকে তখন তাদের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য দিয়ে শ্রেণি বিভাগ করা সম্ভব হয়। যেহেতু আলোর তীব্রতাই মূল বিষয়, সে কারণে লেজার প্রযুক্তি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নন-লিনিয়ার অপটিক্স বিকাশ লাভ করতে শুরু করে।

২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের নন-লিনিয়ার অপটিক্স গ্রুপ উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অর্থায়নে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীরা এই ল্যাবরেটরিতে ভিন্ন ভিন্ন লেজার ব্যবহার করে নানা ধরনের জৈব, অজৈব এবং বায়ো-স্যাম্পলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের কাজ শুরু করে। এই নমুনাগুলোর ভেতর দিয়ে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়। এভাবে কোনো পদার্থের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রেই বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া বা স্পেক্ট্রোস্কোপিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নমুনার গুণাগুণ বের করার চাইতে সহজতর ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব।

নন-লিনিয়ার অপটিক্স গবেষণার মাধ্যমে ক্যান্সার চিহ্নিতকরণ

২০১৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ গ্রুপ হেকেপের উইন্ডো ফোরের আওতায় ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বিত গবেষণার জন্য একটি উদ্ভাবনীমূলক পরিকল্পনা জমা দেয়। এই পরিকল্পনাটি ছিল ক্যান্সার রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে ক্যান্সারের সম্ভাব্য উপস্থিতি ও অবস্থা চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন। অর্থাৎ প্রচলিত বায়োকেমিক্যাল ক্যান্সার নির্দেশক বায়োমার্কারের পরিবর্তে একটি অপটিক্যাল বায়োমার্কার উদ্ভাবন করা। সহজ ভাষায় বলা যায়, ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্তে এমন কিছু একটা অনুসন্ধান করে বের করা যায়, যার নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি ক্যান্সার রোগের সম্ভাব্যতার একটি ধারণা দেবে। একই সঙ্গে খুব সহজে নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি অনুসন্ধানের জন্য একটা সহজ যন্ত্রও তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়। সজভাবে বলা যায়, এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শুধু ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্ত নয়, অন্য যে কোনও নমুনার নন-লিনিয়ার ধর্ম খুবই সহজে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি হেকেপের আওতায় সিপি-৪০৪৪ হিসেবে গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নামে একটি নতুন ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। এই ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার ধর্মের সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে।

পরিশেষে…

ডঃ ইয়াসমিন হক দেশের একজন সফল পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী। তার অজস্র স্নেহধন্য শিক্ষার্থী রয়েছে যারা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল। স্বামী প্রথিতজশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও কল্পকাহিনী লেখক, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ডঃ জাফর ইকবাল ও একই বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়িয়েছেন। ডঃ ইয়াসমিন হক পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

ডঃ ইয়াসমিন ও তাঁর দলের জন্য গোটা বাংলাদেশ এখন অপেক্ষায় কবে এই গবেষণার ফসল হাসপাতাল আর ডাক্তারদের সঠিক সহযোগিতায় মানুষের হাতের নাগালে আসবে। অজস্র লাখো কোটি মানুষ বাঁচার আশায়, একটু সুস্থ থাকার আশায় স্বপ্ন দেখতে পারবে আবার।

তথ্যসুত্রঃ বিবিসি, বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর। 

 

Developed by :