Tuesday, 12 November, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




‘জন্মদিনে বুঁদ শিল্পের ঘোরে, ক্যাডেট কলেজ ক্লাবে’

শিল্পের ঘোর পয়সা দিয়ে কেনা যায় না 

মাহমুদ হাফিজ

পূর্বরাতের প্রথমপ্রহরে পরিবারদ্বারা আক্রান্ত হয়ে জন্মদিনের কেক কেটে মাঝরাতে অজস্র আকাশতুতো বন্ধুর ডিজিটাল শুভেচ্ছার জবাব দিয়ে রাত করেই ঘুমাই। শুক্রবার ছুটির সকালে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি শব্দের মধ্যে ঘুম ভাঙল, কিংবা জোর করে ঘুম ভাঙতে হলো। যেতে হবে গুলশান একনম্বরের ক্যাডেট কলেজ ক্লাবে। বন্ধু লেখক-ভ্রামণিক শাকুর মজিদ নিমন্ত্রণ করেছেন ক্লাব সদস্যদের সাহিত্য সোসাইটি আয়োজিত ‘বইদেখা’ শিল্প আয়োজনের সাক্ষী হওয়ার। দিনমানের আড্ডা, আলোচনা। রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চারুলতা’ হচ্ছে ‘বইদেখা’র বই এবং তাকে কেন্দ্র করেই দিনমানের আড্ডা-আলোচনা-বিতর্ক। আলোচক দেশবরণ্য নির্মাতা, বোদ্ধা, শিল্পসমালোচকগণ। সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান। নাস্তা থেকে শুরু করে দিনমানের খানাপিনার বন্দোবস্ত তিনতলার হলঘরেই। ফলে নো চিন্তা, শোনো আলোচনা, অংশ নাও প্রাণখুলে।

আয়োজনে সঙ্গী হতে আমাদের ভ্রমণ আড্ডার বাঁকি দুই উদ্যোক্তা বই-পোকা ভ্রামণিক সৈয়দ জাফর আর কবি, ভ্রামণিক কামরুল হাসানকে রাতেই নিমন্ত্রণ করে রেখেছি। কামরুল ভাই লেখক হিসেবে নিমন্ত্রণ পেয়েছেন, তবে যাবেন কি যাবেন না দোনোমনোতে ছিলেন। বললাম, অতিথিদের প্রবেশমূল্য-খানাপিনার খরচ বাবদ পাঁচশ’ টাকার যে টিকেট তা আমিই স্পন্সর করবো, মনে করুন এটা রেস্তোরা রেস্তোরায় আমাদের ভ্রমণ আড্ডার এক্সটেন্ডেড সংস্করণ, আসতেই হবে, আসুন। দু’জনই রাজি। বলে নেয়া ভাল, জাফর ভাইকে রাজি করানোর মূলে ছিল তাঁর বইপড়া, বইকেনা, বইপাগল মানসিকতা। একনজর কর্মসূচীতে চোখ বুলিয়েই ভেবে নিয়েছি , অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র দেখানো হবে আর ক্যাডেট লেখকদের লেখা বইয়ের স্টল বসিয়ে বই দেখানো হবে। ‘বইদেখা’ মানে যে সিনেমা বই, তা আগে থেকে ভাবিইনি। সাতসকালে আগেভাগে গিয়ে দেখি, বই তো দূর কী বাত, সেখানে চলছে বনসাই প্রদর্শনী। বইপাগল জাফর ভাই আমারও আগে উপস্থিত হয়ে ফোনে বললেন, বই দেখাতে দাওয়াত দিয়ে বনসাই দেখাচ্ছেন ভাই ! বললাম, এখনও অনুষ্ঠানের সময় হতে আধঘন্টা বাঁকি, উদ্যোক্তারা এলে নিশ্চয়ই টেবিলে টেবিলে বই সাজিয়ে বই দেখাবেন। পছন্দমতো, বই কিনতেও পারবেন।

একি! আয়োজনের মুখ্য উদ্যোক্তা শাকুর মজিদ সঙ্গে স্ত্রী, শিষ্যসাবুদ ও বন্ধু সমভিব্যহারে হলে ঢুকলেন…হাতে বইয়ের নাম নিশানা নেই। সঙ্গে ক্যামেরা, ল্যাপটপ, মোবাইল, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাকার জিনিসপত্তর। গোলটেবিল ঘিরে পাতা তিনটি করে লালরঙের সোফায় আমরা তিনজন করে ইতোমধ্যে বসেছি। কিছুক্ষণ বাদে আয়েস করে ব্যুফে নাস্তা খাই। চা পান শেষ না হতেই আকস্মিক হল অন্ধকার। সব লাইট একযোগ অফ। ভাবি, কী বেরসিক এই ক্লাবের কর্মচারীরা…নাস্তা সারতে না সারতেই বিপত্তি বাধালো! মিলনায়তনের একপাশের সফেদ দেয়ালে আধূনিক প্রক্ষেপনযন্ত্রের মাধ্যমে সিনেমার ট্রেইলার ভেসে উঠতেই নিজেকে আবিস্কার করি দারুন এক সিনেমাহলের দর্শক হিসেবে। ‘চারুলতা’ ছবির চারু, ভূপতি, মন্দা, আর অমলের আনাগোনা শুরু হয়েছে পর্দায়। হলঘরের এককোণে ছোট্ট মঞ্চ, পোডিয়াম বসানো, তা শূন্য… কেউ নেই, অনুষ্ঠানের উদ্বোধন-টুদ্বোধন বলতে গতানুগতিক কিছুই নেই।

ভেবেছিলাম, বন্ধুবর শাকুর মজিদকে মুখটি দেখিয়ে উদ্বোধনের পরই দেবো চম্পট। দিনের সিডিউলে পূর্বনির্ধারিত আরও বহু কাজ পড়ে আছে। নিজের জন্মদিন বলে কথা। সে গুড়ে বালি।এখানে তো উদ্বোধনেরই বালাইই নেই। চম্পটের বদলে নিজে থেকেই সোফায় সেঁটে রইলাম। একটু ছবি দেখি, আলোচনা শুনি, কখনো মাইক হাতে প্রতিক্রিয়া জানাই. কখনো চায়ের সঙ্গে টা টেবিলে এলে খাই ।

বইদেখার ফাঁকে ফাঁকে চলে আনোয়ার হোসেন পিন্টু, শামীম আকতার, মোরশেদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, তৌকীর আহমেদ, ডা. মিরাজুল ইসলাম, আবদুন নূর তুষার, অমিত মল্লিক, শাকুর মজিদের মতো নির্মাতা, অভিনেতা, বোদ্ধাদের প্রাণবন্ত আলোচনা। ফ্লোর থেকে মন্তব্য, প্রশ্ন প্রতিক্রিয়ায় আমরাও অংশ নিই। কারও বক্তৃতা-প্রতিক্রিয়ার জন্য সময় নির্ধারিত নেই। বক্তারা বলে যাচ্ছেন অনর্গল,অংশগ্রহণকারীরা শুনছেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। সকাল নয়টায় শুরু হওয়া একটি অনুষ্ঠান সকলের অজান্তে-অলক্ষে গড়াতে থাকে দিনের শেষভাগের দিকে। কখন যে ছয়টা বেজে গেছে টেরই পাইনি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও চলতে থাকে আরেক প্রস্থ আলাপচারিতা। যেন কেউ আর ফিরবে না ঘরে, শিল্পের ঘোরে সব কাজ আজ বন্ধক দিয়ে এসেছে সবাই।

বলাবাহুল্য, সাংবাদিক হিসেবে কয়েক দশক ধরে হাজারো অনুষ্ঠান দেখেছি, অংশ নিয়েছি। এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা একটা অনুষ্ঠানে মানুষকে সেঁটে থাকতে দেখিনি। এরপরও বিনেপয়সা নয়, পয়সা দিয়ে টিকেট কেটে। মনে হয়, সাহিত্য, সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র শিল্পের ফর্ম নিয়ে যে উঁচুমানের আলোচনা-বিতর্ক বিদগ্ধজনেরা মাত্র একদিনে ডেলিভারি দিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়েও তা অর্জিত হয় না। এই যে দিনমান সেঁটে থাকা, তার নেপথ্যে বোধ হয় শিল্পের ঘোর। যে ঘোর পয়সা দিয়ে কেনা যায় না।

 

Developed by :