Monday, 3 October, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




মহানর আ'লীগের বর্ধিত সভায় ভোটে কমিটি গঠনের দাবি

‘সিটি নির্বাচনে কামরানের পরাজয় দলীয় লজ্জা’

ছাদেক আহমদ আজাদ     

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতা-কর্মীরা প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। তারা এও বলেন, দলের এখন যে করুণ অবস্থা, দলকে সুসংগঠিত না করলে আগামীতে খবর আছে। টাকা কামানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।

গতকাল বুধবার বিকেলে নগরীর একটি অভিজাত হোটেলের হলরুমে মহানগর আওয়ামী লীগের এ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। দলের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন-আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এমপি, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ , কেন্দ্রীয় সদস্য রফিকুর রহমান ও সংসদ সদস্য শামীমা শাহরিয়ার।

বর্ধিত সভায় ১৪নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট বিজয় কুমার বলেন, সাবেক এমপি আব্দুর রহীমের চালিবন্দরের বাসা থেকে আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে সেসব ত্যাগী নেতাদের স্মরণ করা হয় না। কামরান-আসাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি আগামীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে একটি সুন্দর কমিটি গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

২১নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক ইসমাঈল মাহমুদ সুজন বলেন, অনেকেই দেশপ্রেমিক কিংবা দলপ্রেমিক না হয়েও নেতা বনে গেছেন। তারা টাকা কামাতে ব্যস্ত। এসব দেখে তৃণমূল নেতাকর্মীরাও খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৮নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নজু বলেন, আমরা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম এবং নির্বাচনে সব কেন্দ্রে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করি। অথচ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নেতাকর্মী আহত কিংবা জেলে গেলে পরিবারের টাকা খরচ করতে হয়। তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, প্রথমদিকে নেতারা নির্যাতিতদের খোঁজখবর নিলেও পরে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তিনি এসব বিষয় দেখভাল করতে জেলা-উপজেলায় কমিটি গঠনের দাবি জানান।

২০নং ওয়ার্ডের সভাপতি মো. ছানাওর বলেন, আওয়ামী লীগের এখন করুণ অবস্থা। দলকে সুসংগঠিত না করলে আগামীতে খবর আছে। তিনি প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। এছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন নগরীর ২৭নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক সয়েফ খান, ৬নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ ফারুক।

বর্ধিত সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, শ্রদ্ধাবোধ রেখে এবং পরামর্শক্রমে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তিনি বলেন, ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর ২১টি ওয়ার্ডের সম্মেলন ও কাউন্সিল করেছি। সবক’টি কমিটি স্বচ্ছভাবে হওয়াতে কোথাও কোন ধরনের ঝামেলা কিংবা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়নি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, জাতির পিতা মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করে ৫৭ সালে দলের সাধারণ সম্পাদক হন এবং পায়ে হেঁটে, রিক্সা চালিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন। জেল-জুলুম, নির্যাতন, ফাঁসির মঞ্চ ছিল বঙ্গবন্ধুর নিত্যদিনের সাথী উল্লেখ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৪ বছর কারাভোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীত্ব না চেয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের গত নির্বাচন প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি তোফায়েল আহমেদ বলেন, কামরানের পরাজয় হওয়ার তো কথা ছিল না। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ না করায় এমনটা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক এ মন্ত্রী বলেন, অনেকেই চেয়েছিলেন কামরানের পরাজয়। এছাড়া, আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কাজ কামরানকে পাশ কাটিয়ে বিএনপির মেয়রকে দিয়ে করানোর কারণে তিনি কিছু সুবিধা পেয়েছেন। এমনকি সংখ্যালঘু প্রার্থীর বিরুদ্ধে এক নেতার বক্তব্য ভোটে প্রভাব পড়েছে।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন। দলের মধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে এবং তা চলবে। আওয়ামী লীগে নতুন লোকের দরকার নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বড় দল, নেতাকর্মীর অভাব নেই। তারপরও বিভিন্ন সময়ে সুবিধাভোগী যারা দলে এসেছে, তারা শুদ্ধি অভিযানে গ্রেফতার হচ্ছে এবং দলকে কলুষিত করছে। আগামীতে এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বলেন, সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য দীর্ঘ এবং অনেক পুরনো। এখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকা-ের প্রভাব পুরো দেশে পড়ে। তিনি বলেন, সিলেটে পার্টি মজবুত, শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হলে তৃণমূলে এর ঢেউ লাগবে।

এমপি নাহিদ বলেন, বর্তমান সরকার দেশকে উন্নয়নের আবরণে সমৃদ্ধ দেশে বদলাতে চায়। এখন দেশ ডিজিটাল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে ডিজিটাল হতে হবে। তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পশ্চাৎপদতা থাকবে না।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এমপি বলেন, এক সময় বাংলাদেশ দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের খেতাব পেয়েছিল। পরে বিএনপি-জামাতকে হটিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের হাল ধরেন এবং উন্নয়ন, অগ্রগতিতে এখন বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল। তিনি বলেন, ক্যাসিনো খেলা হয় ক্লাবে। এর সঙ্গে যুবলীগ কিংবা আওয়ামী লীগকে জড়ানো ঠিক নয়। যে অপরাধ করবে-তাকেই কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন হানিফ।

তিনি বলেন, সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নির্যাতিত হওয়া মানেই এখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। গত সিটি নির্বাচনে কামরানের পরাজয়কে দলীয় লজ্জা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভেদ নেই মুখে বলবেন-আর কাজ করবেন উল্টো তা হয় না। দলকে ভালোবেসে রাজনীতি করুন। তিনি চলতি মাসের মধ্যে সবক’টি ওয়ার্ডের সম্মেলন করার নির্দেশ দেন।

দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগকে পুনঃগঠন করে আগামী সিটি নির্বাচনে জিততে হবে। এজন্য ত্যাগী নেতাকর্মীদের কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত করুন। তিনি বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মহানগরের সম্মেলন হবে। তিনি সকল ব্যথা বেদনা ভুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, বিএনপি-জামাত জোট সরকারকে হটাতে সিলেট থেকে আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করেছিল। তখন তারা আমাদের নিশ্চিহ্ন করতে বোমা হামলা করেছে। আমরা রক্তাক্ত হয়েছি, দলের নিবেদিত প্রাণ কর্মী ইব্রাহীম প্রাণ দিয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সুদিনে দেশি-বিদেশি কথিত শুভাকাঙ্খী নেতার অভাব নেই। তারা দলকে বিভাজিত করে ব্যক্তিস্বার্থের মাধ্যমে সিলেটে নেতা হতে চায়। অনুপ্রবেশকারীরা যাতে আওয়ামী লীগে ঢুকতে না পারে-সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানান তিনি।

দলের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক রফিকুর রহমান বলেন, যারা মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগ করে তারা নৌকার প্রশ্নে আপসহীন। কিন্তু সংসদ কিংবা উপজেলা নির্বাচনে অনেক নেতাকে নৌকার বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। এসব চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতে তিনি দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, নির্বাচন এলে নেতা নৌকার পক্ষে আর তাঁর ছেলে, ভাই-ভাতিজাকে ধানের শীষের বিজয়ে মাঠে কাজ করতে দেখা যায়। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মী বিভ্রান্ত হন। এজন্য তিনি ঘরের প্রত্যেক সদস্যকে আওয়ামী লীগের কর্মী বানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ৬টি ওয়ার্ডের সম্মেলন এ মাসেই এবং কেন্দ্রের নির্দেশমতো মহানগরের সম্মেলন করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুস সোবহান ও গীতা পাঠ করেন শ্রী প্রশান্ত ঘোষ দীপ। সভায় বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও সিলেটের নেতা-কর্মীদের স্মরণ করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

 

Developed by :