Monday, 23 September, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৮ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




সাংবাদিকতায় সততা উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে গেছেন গোলাম সারওয়ার

ঢাকা: বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় সততা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে গেছেন গোলাম সারওয়ার। সেই আলোর রেখায় পথ চললে এ দেশের সাংবাদিকতা যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম পেশাগত উৎকর্ষতায় সমৃদ্ধ হবে।

শুক্রবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁও সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জীবনেরে কে রাখিতে পারে আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহাতে……গোলাম সারওয়ার স্মরণসভা’ শীর্ষক স্মরণসভায় আলোচকরা এসব কথা বলেন।

স্বাগত বক্তব্যে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, সৃষ্টিশীল মানুষের মৃত্যু নেই। তারা বেঁচে থাকেন কর্মের মধ্য দিয়ে।

গোলাম সারওয়ার যে পথ দেখিয়ে গেছেন- সেই পথ দিয়ে চলছে সমকাল। গোলাম সারওয়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতেন। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কথা বলতেন। সমকাল আজীবন সে কথাগুলো বলে যাবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, গোলাম সারওয়ারের মতো একজন ছাত্র পেয়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে গর্বিত।

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, গোলাম সারওয়ার যত বড় মানের সাংবাদিক ছিলেন, তারচেয়েও বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তিনি আজীবন লড়াকু ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। রাজনীতিকদের প্রশংসা করতে, আবার কড়া সমালোচকও ছিলেন।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, গোলাম সারওয়ারের মধ্যে যে সততা দেখেছি, দৃঢ়তা দেখেছি তা ভোলার নয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে রিপোর্ট করেছেন। তিনি উঁচু মাপের একজন মানুষ ছিলেন।

নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকতায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেমন স্থাপন করেছেন, তেমনি তিনি দেশের শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রেও অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার প্রচেষ্টায় তার এলাকায় বড় স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার দেখানো পথ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করবে।

আ স ম আবদুর রব বলেন, গোলাম সারওয়ারের তুলনা হয় না। তিনি হৃদয়ের মানুষ, আত্মার চেয়েও নিকটতম মানুষ। তিনি রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কৌশলী ছিলেন। সংবাদপত্রে কৌশলী রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে তার তুলনা তিনিই।

সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন নির্ভীক, নিরপেক্ষ এবং গণতন্ত্র ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন। তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত বাঙালি ছিলেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গভীরভবে ধারণ করতেন এবং এ চেতনায় দেশ গড়ায় তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ভালো সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ ছিলেন।

Sarwar-(2)

আবেদ খান বলেন, গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছি ইত্তেফাকে। তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি। গোলাম সারওয়ারকে অনুসরণ করে তা যদি সার্বিকভাবে ক্যামেরা এবং ভাষায় প্রয়োগ করতে পারা যায়, তাহলেই কেবল এই ক্ষয়রোধ করা সম্ভব।

সমকালের প্রকাশক এবং হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, আপাদমস্তক পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন গোলাম সারওয়ার। সবচেয়ে কঠিন পেশা সাংবাদিকতা করেছেন সাহসের সঙ্গে। কোনো সংবাদ কারও পক্ষে গেলে, তা তার প্রাপ্য মনে করে। কিন্তু বিপক্ষে গেলে যেভাবে পারে সংবাদপত্রের মালিককে দেখে নেয়। গোলাম সারওয়ার সংবাদে আপোস করতেন না। গোলাম সারওয়ার যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা বেঁচে থাকুক।

মাহফুজ আনাম বলেন, গোলাম সারওয়ারের প্রতি সম্মান জানানোর একটিই উপায় হচ্ছে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রসার, সাংবাদিকতার মূল্যবোধ ও স্বাধীনতাকে সুদৃঢ় করা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সত্য কথা বলায় দৃঢ়তা নিয়ে আসা।

জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সারওয়ার ভাই এক সময় ইতেফাকে ছিলেন তখন ইত্তেফাক পড়তাম। এরপর তিনি যুগান্তরের গেলেন, যুগান্তর পড়তে শুরু করলাম। এরপর সমকাল প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন সমকাল পড়তে শুরু করলাম। এর অর্থ গোলাম সারওয়ার যেখানে যেতেন, তার সঙ্গে সেখানে পাঠকরাও যেতেন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলাল বলেন, গোলাম সারওয়ার তার অভিভাবক ছিলেন। তার কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছেন, যাকে ঘৃণা করা হয় তার কিছু হয় না। কিন্তু যে অন্তরে ঘৃণা লালন করে, তার দহন হয় বেশি।

বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়া বলেন, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল মানুষ ছিলেন গোলাম সারওয়ার। যা বিশ্বাস করতেন, তা অনুসরণ করতেন

অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, কৌশল এমন একটি শিল্প যে আপনি কাজ করবেন কিন্তু শত্রু তৈরি হবে না’-এই আদর্শের সার্থক মানুষটি ছিলেন গোলাম সারওয়ার।

অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সংবাদ প্রকাশ, উপস্থাপন এবং সৃজনশীল শিরোনাম দেয়ার ক্ষেত্রে গোলাম সারওয়ার ছিলেন অনন্য।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, গোলাম সারওয়ার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সবার কথা শুনতেন। প্রচণ্ড চাপের মধ্যেই থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, তিনি যথার্থ অর্থে সম্পাদকের পাশাপাশি সাংবাদিকতার শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। সাংবাদিকতার সংকট, উৎকর্ষতার কথা সবকিছুতেই মনে পড়ে সারওয়ার ভাইয়ের কথা।

গোলাম কুদ্দুস বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন সাংবাদিকতার পথ প্রদর্শক। এর বাইরে তিনি বড় মানুষ ছিলেন।

স্মরণসভায় গোলাম সারওয়ারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা পাঠ করেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান। ‘জয় তোমার হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী হে বন্ধু আমার গোলাম সারওয়ার’ লাইনে কবিতা শেষ করেন তিনি।

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, তিনি ছিলেন মানবিকবোধ সম্পন্ন একজন সম্পূর্ণ মানুষ। গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে স্বর্ণপদক চালু করা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি সমকালকে অনুরোধ করব এই পদক চালু করার।

জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবনকে তৈরি করা মানুষ গোলাম সারওয়ার। গণমাধ্যমে যে ক্ষয়িঞ্চুতা সৃষ্টি হয়েছে তা রোধে গোলাম সারওয়ারের আদর্শের বিকল্প নেই।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকতার বাতিঘর ছিলেন। তার আলোয় পথ চলছেন।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সেনাল বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন সজ্জন মানুষ। বাইরে কাদার মতো নরম। কিন্তু ভেতরটা দৃঢ় কঠিন। নত হতেন না।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শাবান মাহমুদ বলেন, গোলাম সারওয়ারের চলে যাওয়ায় অভিভাবকহারা হয়েছেন সাংবাদিকরা।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকরা ন্যায্য অধিকারের দাবিতে লড়ছেন, এ সময়ে গোলাম সারওয়ারের উপস্থিতি খুব দরকার ছিল।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি ইলিয়াস হোসাইন বলেন, গোলাম সারওয়ার ছিলেন ডিআরইউর অভিভাবক, সাংবাদিক সমাজের অভিভাবক।

ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্মরণসভার আলোচনায় পর্ব সঞ্চালনা করেন সমকালের ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ।

 





সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :