Thursday, 6 October, 2022 খ্রীষ্টাব্দ | ২১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ |




সিলেটে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আউশ ধান উৎপাদন

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৩৭০০ কৃষক ॥ ক্ষয়ক্ষতি ১৭ কোটি টাকা ॥ কৃষক পুনর্বাসনে ১শ’টি ভাসমান বীজতলা

ছাদেক আহমদ আজাদ

বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও এবার সিলেট জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে। প্রণোদনার সুফল হিসাবে এমন সাফল্য এসেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জেলার ১২ উপজেলায় রোপা আমনের জন্য ১০০টি ভাসমান বীজতলাও তৈরি করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় ৬০ হাজার ৪শ’ ২৭ হেক্টর জমিতে এবার আউশ ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু, ধানের উৎপাদন হয়েছে ৭০ হাজার ৩শ’ ২৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮১৮১ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন বেশি হয়েছে।
কৃষি বিভাগ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে- হাইব্রিড ২২০ হেক্টর, উফশি ৫৭ হাজার ৯শ’ ৫২ হেক্টর, স্থানীয় জাতের ২ হাজার ২শ’ ৫৫ হেক্টর। এ থেকে এক লক্ষ ৩৭ হাজার ৭শ’ ৯৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের কথা ছিল।

কিন্তু, সরকার ২২ হাজার ৫শ’ ৮১ কৃষককে আউশ ধানে প্রণোদনা দেয়ায় উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম হয়েছে। এ অনুযায়ী উফশি ৬৮ হাজার ১০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২ হাজার ৩শ’ ১৫ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। এ হিসেবে সিলেট জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে, সিলেট সদর ৬২৩০ হেক্টর, দক্ষিণ সুরমা ৬৪২৫ হেক্টর, গোয়াইনঘাট ৬৮৭০ হেক্টর, বালাগঞ্জ ২৫৪৯ হেক্টর, ওসমানীনগর ৩২৬১ হেক্টর, কোম্পানীগঞ্জ ৩৫২০ হেক্টর, বিশ^নাথ ৭৬১৫ হেক্টর, ফেঞ্চুগঞ্জ ৪২৫০ হেক্টর, গোলাপগঞ্জ ৪৭৫৫ হেক্টর, জৈন্তাপুর ৭৮৩০ হেক্টর, কানাইঘাট ৬২৫০ হেক্টর, জকিগঞ্জ ৬৪২৫ হেক্টর, বিয়ানীবাজার ৪৩২০ হেক্টর এবং মেট্রোপলিটন ২৫ হেক্টর ধান চাষ হয়। সবমিলিয়ে জেলায় উফশি ৬৮ হাজার ১০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২ হাজার ৩শ’ ১৫ হেক্টর ধান চাষ হয়।

জেলা উপ-সহকারি কৃষি অফিসার ভূপেশ চন্দ্র দাস জানান, গত জুলাই মাসের বন্যায় পুরো জেলায় ১৭শ’ ১৭ হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট সদরে ২৯৬ হেক্টর, দক্ষিণ সুরমা ১০২ হেক্টর, গোয়াইনঘাট ১০০ হেক্টর, বালাগঞ্জ ৩৮০ হেক্টর, ওসমানীনগর ৩৩০ হেক্টর, কোম্পানীগঞ্জ ১৭০ হেক্টর, বিশ^নাথ ৮৫ হেক্টর, ফেঞ্চুগঞ্জ ৩৪ হেক্টর, গোলাপগঞ্জ ৮৫ হেক্টর, জৈন্তাপুর ২৫ হেক্টর, কানাইঘাট ৮৫ হেক্টর, বিয়ানীবাজার ২৫ হেক্টর। যা মোট ফসলি জমির ক্ষতির শতকরা ২.৪৪ ভাগ। এছাড়া, জকিগঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকায় বন্যার প্রভাব না পড়ায় কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানান তিনি।

সূত্রমতে, বন্যায় প্রায় ৪ হাজার ৮শ’ ৪২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এক লক্ষ ৫৬ হাজার ৪শ’ ৪৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে। যা এবার আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ হাজার ৬শ’ ৫৫ মেট্রিক টন চাল বেশি।

এদিকে, গত জুলাই মাসের বন্যায় ১৩ হাজার ৭শ’ ৩৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরমধ্যে সিলেট সদর ২৩৬৮ জন, দক্ষিণ সুরমা ৮১৬ জন, গোয়াইনঘাট ৮০০ জন, বালাগঞ্জ ৩০৪০ জন, ওসমানীনগর ২৬৪০ জন, কোম্পানীগঞ্জ ১৩৬০ জন, বিশ^নাথ ৬৮০ জন, ফেঞ্চুগঞ্জ ২৭২ জন, গোলাপগঞ্জ ৬৮০ জন, জৈন্তাপুর ২০০ জন, কানাইঘাট ৬৮০ জন, বিয়ানীবাজার ২০০ জন। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১৬ কোটি ৯৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ৯শ’ টাকা।

এ অনুযায়ী আর্থিক ক্ষতি সিলেট সদর ২ কোটি ৯২ লক্ষ ১৫ হাজার ২শ’ টাকা, দক্ষিণ সুরমা এক কোটি ৬৭ হাজার ৪শ’ টাকা, গোয়াইনঘাট ৯৮ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা, বালাগঞ্জ ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ ৬ হাজার টাকা, ওসমানীনগর ৩ কোটি ২৫ লক্ষ ৭১ হাজার টাকা, কোম্পানীগঞ্জ ১ কোটি ৬৭ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা, বিশ^নাথ ৮৩ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫শ’ টাকা, ফেঞ্চুগঞ্জ ৩৩ লক্ষ ৫৫ হাজার ৮শ’ টাকা, গোলাপগঞ্জ ৮৩ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫শ’ টাকা, জৈন্তাপুর ২৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫শ’ টাকা, কানাইঘাট ৮৩ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫শ’ টাকা, বিয়ানীবাজার ২৪ লক্ষ ৬৭ হাজার ৫শ’ টাকার।

জেলা উপসহকারি কৃষি অফিসার সৈয়দ আব্দুস সবুর জানান, বন্যায় আউশ ধানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে সিলেট জেলায় রোপা আমন ধানের ১০০টি ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট সদর ১২টি বীজতলা এবং জেলার অপর ১১টি উপজেলায় ৮টি করে বীজতলা রয়েছে। তবে, জকিগঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকায় কোন ভাসমান বীজতলা তৈরী করা হয়নি।

তিনি জানান, ভাসমান বীজ তলার একেকটি বেডের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার ও প্রস্থ ১.২৫ মিটার। এতে জেলার ২৫ জন কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। তিনি আরো জানান, একজন কৃষকের ৪টি বেডের জন্য ৪ কেজি বীজ দেয়া হয়েছে। যা দিয়ে কৃষক তার ৫০ শতক জমি রোপণ করতে পারবেন।

সূত্রমতে, বীজতলা তৈরির খরচ বাবদ সরকার সংশ্লিষ্ট কৃষককে ৫৪০০ টাকা দিয়েছে। এমনকি কৃষক চারা নিজে ব্যবহার না করলে বিক্রি করতে পারবেন।

সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, প্রথমত আমরা কৃষকদের মধ্যে ভালো জাতের বীজ এবং সার সরবরাহ করেছি। দ্বিতীয়ত ৪৪ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে বন্যায় ক্ষতির পরও এবার আউশ ফসল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এজন্য তিনি কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতারও প্রশংসা করেন।

 

Developed by :