Friday, 20 September, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস আজ।। নির্মিত শহীদ স্মৃতিসৌধ এখনো অরক্ষিত!

ছাদেক আহমদ আজাদ  ।।  আজ ঐতিহাসিক নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস। বিয়ানীবাজারের সুনাই নদীর তীরে ১৯৪৯ সালের এই দিনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী পুলিশ। এতে সানেশ্বর-উলুউরি গ্রামের ৬ কৃষক ক্ষেতের কদমাক্ত জমিনে শাহাদাতবরণ করেন। তাদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৫০ সালে তৎকালিন সরকার জমিদারী প্রথা বাতিল করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দেয়।

কিন্তু রক্তক্ষয়ী এ সংগ্রামের ৭০বছরে এখনো ১৮ আগস্টের মিলেনি রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি। উপজেলা প্রশাসনও দিবসটি পালনে উদাসীন। আবার শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটি এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এজন্য শহীদদের পরিবারের সদস্যরা অনেকটা মর্মাহত।

এদিকে, প্রতিবারের মতো এবারও স্থানীয়ভাবে নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলক্ষে গৃহিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ১০টায় শহীদ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ১১টায় আলোচনা সভা। পরে মঞ্চস্থ হবে নানকার কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে আব্দুল ওয়াদুদ রচিত নাটক ‘বিদ্রোহী নানকার’। বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড, উলুউরী নানকার স্মৃতি পাঠাগার ও সানেশ্বর নানকার স্মৃতি সংসদ যৌথভাবে এসব কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

সূত্রমতে, বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল গৌরবমন্ডিত আন্দোলন বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তার মধ্যে নানকার কৃষক বিদ্রোহ অন্যতম। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সানেশ্বরে এসে নানকার কৃষক বিদ্রোহ আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করেন। তখন কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রস্তাবনায় স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক উমেশ চন্দ্র দাশ, মজির উদ্দিন আনসার, একেএম গোলাম কিবরিয়া তাপাদার, অধির চন্দ্র দাশসহ উপস্থিত নেতৃবৃন্দ শহীদদের স্মরণে সৌধ নির্মাণের জন্য ভূমি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর তিলপাড়া ইউনিয়নবাসীর আর্থিক সহায়তায় সুনাই নদীর তীরে ৩ শতক ভূমি ক্রয় করা হয়। পরবর্তীতে বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের উদ্যোগে ও দেশবিদেশে বসবাসরত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজস্ব ভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে নির্মম ও বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের ৫৮ বছর পর ২০০৯ সালে সুনাই নদীর তীরে রক্তাক্ত জমিনে নির্মিত নানকার কৃষক শহীদ স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন তৎকালিন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বর্তমান সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষযক মন্ত্রী আলহাজ মো. শাহাব উদ্দিন এমপি। এরপর ১০বছর অতিবাহিত হলেও নানকার কৃষক শহীদ স্মৃতিসৌধটি এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। তবে প্রতিবছর ১৮ আগস্ট এ স্মৃতিসৌধে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

নানকার কৃষক শহীদ স্মৃতিসৌধ ভূমিক্রয় উদ্যোক্তাদের অন্যতম সদস্য মজির উদ্দিন আনসার বলেন, এ আন্দোলন আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। এতোদিনে ১৮ আগস্ট রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু পাইনি। তারপরও আমরা বসে নেই। তিনি নিজস্ব ভূমিতে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণে এতদ্বঞ্চলের অগ্রসরমান যুবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বৃটিশ আমলের ঘৃণ্য নানকার প্রথা বিলোপ, কৃষকের জমির অধিকার আদায় ও জমিদারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৮ আগস্ট শহীদ হয়েছিলেন ব্রজনাথ দাস (৫০), কটুমনি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৪৫), অমূল্য কুমার দাস (১৭) এবং এ ঘটনার ১৫ দিন আগে সুনাই নদীতে জমিদারের পোষ্যদের লাঠির আঘাতে নিহত হন রজনী দাস নামের এক কৃষক। ১৮ আগস্ট এলেই তাদের পরিবারের সদস্যরা আবেগাপ্লুত হন। স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গনে ফুল হাতে সবার সাথে দাঁড়িয়ে থাকেন, মনোযোগ দিয়ে প্রাঙ্গজনের কথা শোনেন। এতেই তারা প্রীত হন।

বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ডের সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, আমরা গত দেড়যুগ থেকে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে ১৮ আগস্ট নানকার কৃষক বিদ্রোহ আন্দোলন দিবস পালন করে আসছি। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছি। এখন সেটি সংরক্ষণ করতে পারলেই আমাদের সার্থকতা আসবে।

স্থানীয়ভাবে নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস পালনের প্রধান উদ্যোক্তা সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বলেন, এটি ছিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের আন্দোলন। সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নানকার আন্দোলন হলেও পরিসমাপ্তি ঘটেছিল বিয়ানীবাজারের সানেশ^র-উলুউরি এলাকায়। এজন্য আমরা বীরত্বের অংশীদার।

তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আমরা এ দিবস পালন শুরু করেছিলাম এখন স্মৃতিসৌধে সাধারণ মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করছে। এতে আমি খুবই আনন্দিত। এমপি নাহিদ আরো বলেন, শহীদ স্মৃতিসৌধ এলাকা যাতে দৃষ্টিনন্দন এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব পায় সেদিকে আমার নজর রয়েছে। এজন্য সৌধ সংরক্ষণের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আমার সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

তিনি নানকার কৃষক বিদ্রোহ দিবস পালনে যারা অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানান।

 

Developed by :