Tuesday, 10 December, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম: নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শাকুর মজিদের লেখার পুনঃপাঠ

মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলামের ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

বরেণ্য এ ব্যক্তিকে নিয়ে সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি’র একটি লেখার খণ্ডিতাংশ এখানে প্রকাশ করা হলো। পাশাপাশি স্থপতি শাকুর মজিদের স্মৃতিলব্ধ ফেসবুক স্ট্যাটাস নিম্নে জুড়ে দিলাম।

আশা করি আমাদের অগণিত পাঠক লেখা দু’টি পড়ে আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাবেন। – সম্পাদক

নুরুল ইসলাম নাহিদ

“আমাদের স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণির জন্য আলাদা কামরা বা কোন পার্টিশন ছিল না। লম্বা ঘরে ও বারান্দায় চিহ্ন দিয়ে আলাদা করা ক্লাস। সুতরাং সকল শ্রেণির সব কিছুই ইচ্ছা করলে দেখা যায়। তবে শিক্ষকদের ভয়ে অন্যদিকে তাকানোর সাহস ক’জনের -ইবা ছিল। ক্লাসে প্রশংসিত হলেও সকলের চোখের সামনে,শাস্তি পেলেও সকলের সামনে। কান ধরে দাঁড়ানো, নিল-ডাউন, বেতের বাড়ি প্রভৃতি শাস্তি তো রোজই করো না করো ভাগ্যে জুটত।
…..
একদিন এস.আই (স্কুল ইন্সপেক্টর) সাহেব এক পরিদর্শনে এলেন আমাদের স্কুলে।

আমাদের ক্লাসে এসে কী একটা প্রশ্ন করলেন ছাত্রদের উদ্দেশে।
কী প্রশ্ন ছিল তা আমার আজ মনে নেই। আর কেউ বলতে পারেনি। আমি সঠিক উত্তর দিয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষকদের প্রশংসার দৃষ্টি অনুভব করেছিলাম—একটু গর্বও হচ্ছিল। তবে নার্ভাসও হয়েছিলাম। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে বড় ক্লাসের টেবিলের চারপাশে শিক্ষকরা এস.আই সাহেবকে নিয়ে বসে চা-নাস্তা সারছেন। চায়ের সাথে জেম বিস্কুট নিয়ে একজন শিক্ষক আমার কাছে এলেন এবং আমাকে দিতে চাইলেন। আমি নিতে চাইনি। তিনি জোর করে একটি জেম বিস্কুট আমার মুখে পুরে দিলেন এবং বাকি চারটি আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন।তখন আমি খুব নার্ভাস ও বিব্রত ছিলাম।আমাকে আদর করে যিনি বিস্কুট মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছিলেন তিনিই আমার শ্রদ্ধাভাজন প্রিয় শিক্ষক কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম।

তাঁর মহাপ্রয়াণের মাসখানেক পূর্বে তাঁকে দেখতে যেদিন তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম অর্থাৎ তাঁকে যেদিন শেষ জীবিত দেখেছিলাম সেদিনও তিনি একটা বিস্কুট আমার মুখে তুলে খাইয়েছিলেন, দুধের কাপটা হাতে তুলে দিয়েছিলেন। যখনই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেছি, সব সময়ই বা অসুস্হ অবস্হায় দেখতে গেছি, কিছু একটা তিনি মুখে তুলে দেবেনই। আমি দুধ খাই না, কিন্তু তাঁর বাড়িতে গেলে বাধ্য হয়েই খেয়েছি। শুধু তার বাড়িতে নয় যে কোনখানে। এমনকি সভায় বসেও যদি চা-নাস্তা খাওয়া হয় তা হলেও তিনি একটু মুখে তুলে দেবেনই।

….আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম ছোটবেলায়
আমার কাছে ছিলেন এক বিস্ময়।

বই যারা লেখেন, যাদের লেখা ছাপা হয়, যাদের নাম ছাপার অক্ষরে লেখা, সে রকম মানুষ আমরা ছোটবেলায় কোথা থেকে দেখব। বইয়ের লেখকরা তো অনেক দূরের মানুষ, আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

হঠাৎ একদিন একটা অবিশ্বাস্য কথা শুনলাম—
আকদ্দাস সিরাজুল ইসলাম একটি বই লিখেছেন এবং তা ছাপা হয়ে বই হয়েছে।তাঁর প্রথম বই ‘নয়া দুনিয়া’ এর কথা বলছি।

আজকের পটভূমিতে আমার কথাটা কেউ বিচার করবেন না,তখনকার সময়ের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি অনুমান করলে হয়ত উপলব্ধি করতে পারবেন।
পরে জেনেছি, দেখেছি একটি বইয়ের লেখক নয়, তার অনেক বই লেখা ও ছাপা হয়েছে।

রাজনৈতিক জীবন,সাহিত্যকর্ম,সমাজ সংস্কার,স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এর বাইরেও –

তিনি ছিলেন এক প্রকৃত মানুষ, কুসংস্কারমুক্ত, প্রগতিশীল, অগ্রসর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী।

মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন, সংস্কৃতিবান, একজন আধুনিক মানুষ ছিলেন তিনি।

তিনি ছিলেন প্রকৃতই একজন আলোকিত মানুষ।

তিনি যেমন ছিলেন বাস্তববাদী তেমনি আবেগপ্রবণ,
মানুষের জীবনে এ এক বিরল সমন্বয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ যা সব সময় আমাকে প্রভাবিত করেছে তা হলো —মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বাস।

তাঁর ছিল অফুরন্ত দেশপ্রেম। সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকার। এসবই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর চিন্তায়,কর্মে এবং লেখায়।
….
এক অদ্ভুত মায়াবী স্নেহময়ী বৈশিষ্ট্য ছিল এই মহান ব্যক্তিটির,
যিনি আমার শিক্ষক এবং আমি তাঁর ছাত্র।”

শাকুর মজিদ

আমার দেখা প্রথম কোন লেখক হলেন আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম। আমাদের আকই চাচা। বাবার বন্ধু। সেই ছোট বেলা থেকেই তাঁর আদর নিয়ে বড় হওয়া, তাঁর লাইব্রেরি থেকে নিয়ে নিয়ে বই পড়তে শেখা আর আমার লেখা পড়ে তাঁর মুখ থেকেই প্রথম তারিফ পাওয়া।

আজ আকই চাচা চলে যাবার ঊনিশ বছর হয়ে গেলো। মনে পড়ে সেই বৃষ্টি বাদলার দিন, ভোরে খবর পেলাম, রাতেই মারা গেছেন। তাঁর মেঝ ছেলে খালেদ তখন ঢাকায়। আগের সন্ধায় একসাথে সময় কাটিয়েছিলাম। খবর পাওয়ার সাথে সাথে সকাল সাড়ে দশটার ফ্লাইটে টিকেট কেটে খালেদকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম সিলেট।

দেখতে দেখতে ১৯ বছর। চাচা- আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক।

পুণশ্চ: ১। ১৯৮৮ সালে আমি প্রথম SLR ক্যামেরা পাই। প্রথম সাদাকালো ফিল্মেই আমি তাঁর ছবি তুলি বাড়ি গিয়ে। এখনো এ ছবিগুলো আমার খুব প্রিয়।

২। চাচার মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকীর আগেই আমরা দুই খণ্ডে তাঁর রচনাবলী প্রকাশ করি। এখনো তাঁর কিছু কপি খালেদের কাছে আছে। ষাট দশকের এই কথাশিল্পীর লেখনী ইতিহাসের অনেক কিছুর সাক্ষী। কেউ চাইলে বইগুলো সংগ্রহ করতে পারেন।

 

Developed by :