Thursday, 22 August, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৭ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




ডেঙ্গু মশা চিনার উপায় এবং ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে করণীয়

ডা. এমএ ছালাম 

ডেঙ্গুর মশা এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দু’ধরনের মশার দেখা মেলে। এছাড়াও পানামা, মেক্সিকো ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও এই দু’ধরনের মশা দেখতে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে এডিস ইজিপ্টাই ও অ্যালবোপিকটাস দুটিই আছে। প্রথমটা গৃহপালিত বাসাবাড়িতেই থাকে ও বংশবিস্তার করে এবং ডেঙ্গু রোগের মূল বাহক। দ্বিতীয়টা গাছের গর্তে, পাতায় জমানো পানি ও ঝোপঝাড়ে থাকলে ও বাসাবাড়িতে ও ইদানিং বংশবৃদ্ধি ও বসবাস করছে তবে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী ততটা নহে ।

এই দুই মশার মধ্যে পার্থক্য হলো— এডিস ইজিপ্টাই-এর পিঠে বীণার মতো চিহ্ন থাকে। আর এডিস অ্যালবোপিকটাসের মশার পিঠে সাদা রডের মতো অংশ থাকে। এই দু’ধরনের মশার শরীরে কালো-সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলের জন্য একে টাইগার মশাও বলা হয়। এই প্রজাতির মশা সাধারণত স্বচ্ছ-পরিষ্কার পানিতে থাকে। ফেলে দেয়া টায়ার, পাত্র, নির্মীয়মান বাড়ির চৌবাচ্চা ইত্যাদি জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে বা অন্য কোনও কারণে পানি জমলে এই মশা সেখানে ঘর বাঁধতে পারে। এরা সেখানেই ডিম পাড়ে। যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে এই মশাগুলোর। সমুদ্রপৃষ্ঠে যেমন থাকতে পারে, তেমনই ৬০০ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায়ও নিমেষে উড়ে বেড়াতে পারে। তিন মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে ডেঙ্গুর মশারা। প্লেন, ট্রেন বা যেকোনো গণপরিবহণে করে এক জায়গা থেকে অন্যত্র চলেও যেতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করা এই ধরনের মশাগুলো বংশবিস্তার করলে, তাদের সন্তানাদিও ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করতে থাকে। একে বলা হয় ট্রান্স ওভারিয়ান ট্রান্সমিশন। অন্যান্য মশার কিন্তু এই ক্ষমতা নেই। এইজাতীয় মশার ডিম শুকনো মৌসমে ১বছরের ছেয়ে ও বেশী সময় জীবিত থাকতে পারে এবং পানির সংস্পর্শে আসলেই ২৪ ঘন্টার মধ্যেই সতেজ হয়ে পুর্ন মশা হয়ে আবির্ভুত হতে পারে। কেবল স্ত্রী জাতীয় মশা তাদের ডিম পাড়ার প্রয়োজনের জন্য মানুষকে কামড়ায়।কামড়ের জায়গায় ব্যথা হয় না চুলকায় ও না । পিছন থেকে কামড়ায় তাই টের পাওয়া যায় না। একটা মশা ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত বেচে থাকে । একবার ডেঙ্গু জীবনু বহন করলে সারাজীবন সেটা ছড়ায়। সাধারণত ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কম হলে মারা যায়।

জুন থেকে অক্টোবর (২৫-৪৫ সেলসিয়াস ) তাপমাত্রায় তারা বংশ বিস্তার করে এবং অত্যন্ত সতেজভাবে বসবাস করে। শীতকালে এই জাতীয় মশা দেখা যায় না এবং বর্ষাকালে তারা সুপ্ত ডিম থেকে পুর্ন মশা হয়ে বিপুল সংখ্যায় আবির্ভূত হয় এবং ডেঙ্গু ও প্রচুর সংখ্যায় দেখা দেয়। মানুষের ঘরে ঘরে এদের বসবাস এবং বংশ বিস্তার। প্রতিটি ঘরে ঘরে এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার গড়ে তুলা ছাড়া এই রোগের নির্মূল /কন্ট্রোল করা সম্ভব নহে। কেবলমাত্র স্ত্রী মশা ডিম পাড়ার জন্য মানুষের রক্ত চোষে। রক্ত টানার পর ডিম পাড়ে।

একটা মশা ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ আয়ু পায় এবং সেই সময়ে ৫০০ থেকে ১০০০টি ডিম পাড়ে। সাধারনত সকালে ও সন্ধ্যার সময় এই মশা কামড় দেয়। রাত্রে ও কামড়ায় তবে কম। ঘাম ও আলকোহলের ঘন্ধে এরা আকর্শিত হয়। তাই শরীরের ঘাম মুছে রাখা কিংবা ফেনের মধ্যে/এসিতে বসবাস করলে এরা কম কামড়ায়। রংগিন ও ঘাড় রংয়ের কাপড় পড়া মানুষ কে তারা সহজে চিনতে পারে। তাই হালকা রংয়ের কাপড় পড়লে মশা এড়িয়ে চলা সহজ। এই মশা দমনের প্রধান উপায় হল পানি জমতে না দেয়া। বাড়ির টব, পট, চায়ের কাপ, ভাঁড় ইত্যাদি জায়গায় পানি জমা আটকাতে হবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মীয়মান বাড়ির গর্তে দিনের পর দিন পানি জমে থাকতে দেখা যায়। এই জায়গাগুলোতে পানি না জমার ব্যবস্থা করা চাই।

এখন বর্ষাকাল, তাই এই বিষয়টিতে আরো বেশি করে জোর দেয়া দরকার।ফ্লোরগুলো শুষ্ক রাখা ও প্রতিদিন ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা।ফুলের টবের পানি ৩ দিন পরপর পরিবর্তন করা। জমানো পানিতে সপ্তাহে ২ দিন কিটনাশক স্প্রে করা(Chlorpyriphos/ সিরাপ এসিমিক্স- ১০০এমএল)ও Cypermetrine/ সিরাপ ফাইটার ১০০এমএল কীটনাশক ঔষধের সাথে ১৫ লিটার পানি মিশিয়ে)।তাছাড়া বাসাবাড়িতে এরোসেল/এক্সপেল দিনে ও রাত্রে স্প্রে করা। ঘুমাবার সময় দিনে ও রাত্রে মশরী ব্যবহার করা।ঢাকায় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমন ত্যাগ করা। ভ্রমন করলে ভারী মোজা, হালকা রংগের কাপড় পরিধান করা এবং সংগে বাসে ট্রেনে ,স্টীমারে, প্লেনে এবং হোটেলে ব্যবহারের জন্য এরোসেল/ এক্সপেল স্প্রে রাখা উচিত। শরীরের খোলা অংশে Otomos ointment লাগানো যেতে পারে যাতে মশা আকর্শিত না হয় এবং কামড়াতে না পারে। নারিকেল তৈল মাখলে ও মশা repel হয় । গরীব মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত না হলে ও ডেঙ্গু মশা থেকে বাঁচার জন্য মশার কয়েল জালানো উচিত। কাপড়ের মধ্য দিয়ে ও মশা কামড়াতে পারে তাই কাপড়ের বাহিরে ও এরোসল অথবা repellent স্প্রে করা যেতে পারে। কিছু সেন্ট আছে ( যেগুলিতে lavender আছে) শরীরে / কাপড়ে স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার টাউনভিল এখন ডেঙ্গুমুক্ত তারা biologically একটা bacteriaপুরুষ মশার ভিতরে ডুকিয়ে দেওয়ার কারনে স্ত্রী মশাগুলি আর ডিম পাড়তে পারছে না এডিস মশার বংশ এভাবে ধংশ হয়ে গেছে। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে এরকম ব্যবস্থার চিন্তাভাবনা করতে হবে নতুবা প্রতিবছর এটা geometric হারে বাড়বে বৈকি কমার কোন সম্ভাবনা নাই।

লেখক: পরিচালক পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট। প্রাক্তন পরিচালক ডিজিএইচএস, ঢাকা।

 

Developed by :