Tuesday, 10 December, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




সিলেটে গুণীজনে প্রাণবন্ত সৌহার্দ্য আড্ডা

দীর্ঘ ৫৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের গল্প শোনালেন প্রথিতযশা সাংবাদিক আবেদ খান

ছাদেক আহমদ আজাদ: দৈনিক জাগরণ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান প্রথিতযশা সাংবাদিক আবেদ খানের সাথে সৌহার্দ্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়েছে সিলেটে। প্রাণবন্ত এ আড্ডায় উঠে এসেছে সিলেটের শতবছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, দেশের সমকালীন রাজনীতি, সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিচিত্র। এতে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন অঙ্গনের অর্ধশতাধিক বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে স্থানীয় একটি অভিজাত হোটেলের হলরুমে দীর্ঘ ৫৭ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের দুঃখ, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়া, সরকারযন্ত্রের আরোপিত নির্দেশনা কিংবা বারবার প্রতারিত হওয়ার গল্পের চুম্বকাংশ শোনান বরেণ্য সাংবাদিক আবেদ খান। দৈনিক জাগরণ পত্রিকা নিয়েও জানালেন স্বপ্নের কথা।

এ সময় আবেদ খান বলেন, সবচেয়ে স্বল্পায়ু দু’টি পেশার একটি হচ্ছে সাংবাদিকতা। এখানে নীতি নৈতিকতা মেনে চললে পুরস্কৃত, না হয় তিরস্কৃত হতে হয়। ভুল সংবাদ হলে বাতিল এমনকি মানুষ এ পত্রিকা গ্রহণ করে না। তিনি বলেন, কেউ কেউ একটা কার্ডের জন্য সাংবাদিকতা করে। এটি পেলে সে সবকিছু করতে পারে। হয়তো আমরা অনেকেই তাতে অভ্যস্ত নয়।

পুঁজিপতিদের নির্দেশ বাস্তবায়নই হচ্ছে এখনকার সাংবাদিকতা উল্লেখ করে আবেদ খান বলেন, সাংবাদিক জহুর হোসেন কিংবা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তখন তা চিন্তাও করেননি। এখন কিন্তু ফরমায়েশী নিজউ না করলে বড় সাংবাদিক হওয়া যায় না। উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া সাংবাদিকতা করলে নৈতিক অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের আমলে সংবাদপত্রে লিখিত নির্দেশনা আসতো। তারপরও ভয়ভীতি নিয়ে আমরা সাংবাদিকতা করেছি। এখন কিন্তু এভাবে তা আসছে না। তবে অনেকেই সরকারের তোষামুদি করতে নিজ থেকে সংবাদ সেন্সর করছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. আব্দুল হাই শিবলী, দৈনিক সিলেটের ডাক এর নির্বাহী সম্পাদক লেখক ও গবেষক আব্দুল হামিদ মানিক, দৈনিক উত্তরপূর্বের প্রধান সম্পাদক আজিজ আহমদ সেলিম, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল ইসলাম সুয়েব, দৈনিক জাগরণ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সিলেটের সন্তান দুলাল আহমদ চৌধুরী, বালাগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সাংবাদিক লিয়াকত শাহ ফরিদী, এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য, জেলা সুজনের সভাপতি ফারুক মাহমুদ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সহ সভাপতি গল্পকার সেলিম আউয়াল।

পিআইবি চেয়ারম্যান আবেদ খান বলেন, সাংবাদিকতা এখন পাল্টে যাচ্ছে। সুস্থ চিন্তার পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা। অনলাইনের দাপটে প্রিন্ট মিডিয়া প্রভাবিত হচ্ছে। মোবাইল সাংবাদিকতায় ভুল সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। তার সত্যাসত্য যাচাই হয় না। ভুল থেকে নতুন নতুন ভুলের জন্ম নেয়। এতে ভিকটিম হচ্ছে নিরীহ মানুষ।

সিলেটে সংবাদকর্মীদের প্রশিক্ষণের দাবির প্রেক্ষিতে আবেদ খান বলেন, পিআইবি না এলেও আমি আসবো। আমি সংবাদকর্মীদের সাথে থাকতে চাই। সাংবাদিকতায় বিভাজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ১৯৬২ সাল থেকে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত। এ সময়ে দেখেছি এ অঙ্গনে সবসময় বিভাজন ছিল।

সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম রুকনের পরিচালনায় উন্মুক্ত আড্ডায় বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক তাপস পুরকায়স্থ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহিদ, শাবি’র অধ্যাপক ড. ফজলে এলাহী মো. ফয়সল, সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ, সিটি কাউন্সিলর এডভোকেট ছালেহ আহমদ সেলিম, এডভোকেট রফিক আহমদ, জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সিকান্দর আলী, সংবাদপত্র এজেন্ট ইসমাইল আলী।

প্রাজ্ঞ সাংবাদিক আবেদ খান আরো বলেন, আমি সম্পাদক হিসেবে অনেক পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত করেছি। দু’একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন আমার নামে থাকলেও পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হয়েছি। এ কারণে সরকার, মন্ত্রী বা শিল্পপতিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নয়, নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে পত্রিকা বের করার চেষ্টা করেছি। দৈনিক জাগরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতার পেটার্ন পরিবর্তন করতে চাই। এখানে অসাধুতা কিংবা অনৈতিকতা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য আমরা উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে চাই। জাগরণ পত্রিকায় মালিক বলতে কিছু নেই। ভুল হলে দায় সবার, ভালো হলেও তাই হবে।

অর্থশক্তির কাছে জাগরণ নতজানু হবে না উল্লেখ করে সম্পাদক আবেদ খান বলেন, দেরি হওয়া মানে বিনাশ নয়, অধিকতর প্রস্তুতি নেওয়া। ভুলগুলো শুধরে ভালো কিছু করার প্রচেষ্টায় ব্রত হওয়া। তিনি বলেন, আমার এতদিনের কর্ম ব্যর্থ হবে না। তবে উত্তরসূরি ছাড়াই আমার আদর্শ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। যাতে সাংবাদিকতার নামে মালিকের কর্মচারী, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিবেদিত দৈনিক পত্রিকা জাগরণ বের করতে পারি।

অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে আবেদ খান বলেন, আমি এখনো স্বাধীনতা কিংবা একুশে পদক পাইনি, হয়তো পাবো। তিনি বলেন, পদক বড় কথা নয়। মানুষের কাছে কতটুকু যেতে পেরেছি, সেটাই বড় কথা।

সৌহার্দ্য আড্ডায় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেট পর্যটন নগরী হলেও ঠিকমতো আমরা দেশবাসীর সামনে তা উপস্থাপন করতে পারছি না। রাস্তাঘাটের খারাপ অবস্থার কারণে পর্যটক আসতে চায় না। এ বিষয়টি সরকারযন্ত্রের নজরে আনা দরকার। তিনি বলেন, সিলেটে একটি শক্তিশালী সাংবাদিক ফোরাম দেখতে চাই। এখানে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন দেখলে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। তিনি বলেন, আমাদের সর্বক্ষেত্রে সম্প্রীতির বন্ধন রয়েছে। এজন্য যেকোন সময় আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারি। মেয়র বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যা চাচ্ছি তা পাচ্ছি। কিন্তু প্রশাসনের যারা দ্রুত রাজনীতিক হতে চাচ্ছেন তারা নগরীর উন্নয়নে অনেকক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন না।

উপাচার্য ড. আব্দুল হাই শিবলী বলেন, মালিকের কাছে দায়বদ্ধ না থাকায় আবেদ খান জাগরণ ঘটাতে পারবেন। তাঁর লেখনী পড়লে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত হয়।

দৈনিক উত্তরপূর্বের প্রধান সম্পাদক আজিজ আহমদ সেলিম বলেন, জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা অঙ্গনের আইডল বা আইকন হচ্ছেন আবেদ খান। আমি তরুণ সাংবাদিক আবেদ খানের কাছে পিআইবি’তে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বর্তমান সময়ে তাঁর নেতৃত্বে একটি পত্রিকার বড়ই প্রয়োজন।

অধ্যাপক বদরুল ইসলাম সুয়েব বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি দেশের অন্যান্য স্থানের মতো সিলেটেও একটি প্রকৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিং  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক বাবর হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক এম আহমদ আলী, মুক্তাদির আহমদ মুক্তা, লেখক ও গবেষক সুমনকুমার দাশ, সাংবাদিক আব্দুল আহাদ, ডা. মো. সাকির আহমদ, সৈয়দ মিনহাজুল আবেদিন, শিক্ষক ফখরুল খান, সমাজকর্মী আব্দুল লতিফ, প্রবাসী শাহিনুর আলী, মফিজুর রহমান মফি, পারভেজ আহমদ, এডভোকেট শাকী শাহ ফরিদী, রাজীব চৌধুরী, মো. সহিদুর রহমান, নাঈম হোসেন চৌধুরী, মো. আব্দুল হাই, খালেদ উদ-দীন, মুমিন আহমদ, ফরহাদ মো. রুবেন প্রমুখ।

 

Developed by :