Friday, 22 November, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




‘নুরুল ভাই ক্রীড়া সংগঠক, শিক্ষানুরাগী ও সমাজকর্মী ছিলেন’

।। আলী আহমেদ বেবুল ।।

জাতীয় বিদ্যোৎসাহী, বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও বিয়ানীবাজার উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণপুরুষ নুরুল হক ১২ জুলাই শুক্রবার ঢাকার একটি হাসপাতাল স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দাঁতের চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে গিয়েছিলেন গত সপ্তাহে। অত্যন্ত ভদ্র অমায়িক, সজ্জন,সদাহাস্য উজ্জল ও প্রাণবন্ত এ মানুষটি লাশ হয়ে ফিরলেন বাড়ীতে।

শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে ওঠে নুরুল ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।কোন ভাবেই এ দু:সংবাদটি মেনে নিতে পারছিলাম না। সরাসরি ফোন করলাম নুরুল ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আমার ফুফাতো ভাই বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার সাধারণ সম্পাদক ইসলাম ভাইকে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, নুরুল আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে। ইসলাম ভাই তখন শ্রীধরায় নুরুল ভাইদের বাড়ীতে অবস্হান করেছিলেন। কথা হলো সাবেক ফুটবলার আলম ভাইয়ের সাথে (নুরুল ভাইয়ের চাচাতো ভাই)। আলম ভাই বিলাপ করে কান্না করছেন এবং বলছেন নুরুল আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে ভাই। আমি নিজেকে ও সামলিয়ে নিতে পারলাম না বিলাপ করে কাঁদতে লাগলাম। বললেন দোয়া করিও তার জন্য এবং নুরুজ্জামানকে (সে লন্ডন থাকে, নুরুল ভাইয়ের ইমিডিয়েট ছোট ভাই ) সান্তনা দিয়ে রাখিও ভাই। আর কোন কথা বলতে পারছিলেন না।

নুরুল ভাই এ রকম আকস্মিক ও অকালে চলে যাবেন তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁর মৃত্যু সংবাদটি ফেইসবুকে দেয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছি। মোবাইল যত বারই হাতের কাছে নিয়েছি। আমার হাতটি কেঁপে ওঠে।মানসিক ভাবে আমি প্রচন্ড ভেংগে পড়ি।শুক্রবার ফেইসবুকে নুরুল ভাইয়ের ওয়ালে গিয়ে তাকে বারবার দেখার চেষ্টা করেছি।তাঁর স্টেটাসগুলো পড়েছি। একবার ও মনে হয়নি তিনি আর বেঁচে নেই। এইতো প্রায় ১৮ দিন আগে ২৫ জুন তাঁর সাথে প্রায় ৩০ মিনিট ফোনালাপ হলো।কোন ধরণের অসুখ- বিসুখের কথাও বললেন না। পারিবারিক কুশালাদি ছাড়া ও ফোনালাপে বিয়ানীবাজার উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের সার্বিক বিষয়ে অনেক কথা তাঁর সাথে হয়েছিল।

নুরুল ভাই আপনার মৃত্যুতে বিয়ানীবাজারের উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে আপনার প্রাণচাঞ্চল্য তৎপরতা আর দেখা যাবে না। বাঁশি নিয়ে আর আপনি ফিরে আসবেন না এ মাঠে।বিয়ানীবাজারের মানুষ আপনার অনুপস্হিতি অনুধাবন করবে দারুণ ভাবে। ইসলাম ভাই হারালেন তাঁর দীর্ঘ সময়ের একজন বন্ধু, দক্ষ ও আস্হাভাজন সংগঠককে।

নুরুল ভাই আপনি ছিলেন বিয়ানীবাজারের উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের একজন নিবেদিত প্রাণ সংগঠক।সামাজিক সম্পর্ক ছাড়া পারিবারিক ভাবে আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। একজন বড় ভাই হিসেবে আপনার নিকট থেকে অনেক স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি। বিয়ানীবাজারের উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনে সম্পৃক্ত থাকার সময় আপনার সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে সেই সব দিনগুলোতে। বারবার স্মৃতিগুলো মনে পড়ছে। ১৯৯৭ সালের কথা সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্হার কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচনে দিলদার হোসেনের সেলিম ভাইয়ের প্যানেল থেকে ইসলাম ভাই (বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার সাধারণ সম্পাদক) সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।নির্বাচনে সিলেটের ১১ টি উপজেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে ২ জন করে প্রতিনিধি এবং সিলেট স্টেডিয়ামে অংশগ্রহণ কারী মোহামেডান, আবাহনী ও মোহনবাগান ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাব এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রায় শতাধিক ভোটার ছিলেন। দিলদার সেলিমের প্যানেলের প্রতিপক্ষ ছিলেন আব্দুল হালিম সুনু ভাইয়ের প্যানেল।

তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ( মরহুম)’র সমর্থনপুষ্ট প্যানেল ছিল দিলদার সেলিমের প্যানেল।আব্দুল হালিম সুনু প্যানেলের পক্ষে ছিল্ন জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী( মরহুম)।সিলেটের দুই হেভিয়েট নেতার সমর্থনের কারণে জেলা ক্রীড়া সংস্হার নির্বাচন তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ন ও মর্যাদার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।ইসলাম ভাইয়ের ছিল এটা প্রথম নির্বাচন।বিষয়টি আমাদের ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জিং। সেলিম ভাইয়ের প্যানেলকে নির্বাচিত করার জন্য ইসলাম ভাই, নুরুল ভাই ও আমি প্রায় দু’সপ্তাহ সিলেটে অবস্হান করে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নেই।

উপজেলা প্রতিনিধিদের ভোট আদায়ের জন্য বিরতিহীন ভাবে দু’দিনে সিলেটের ১০ টি উপজেলা সফর করি এবং সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করি।নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দিলদার সেলিমের প্যানেল জয়লাভ করে।ইসলাম ভাই প্রথম বারের মতো জেলা ক্রীড়া সংস্হার কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন।বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার কোন কর্মকর্তার নির্বাচিত সদস্য হিসেবে জেলায় প্রতিনিধিত্ব করা এটা ছিল সর্ব প্রথম।পরবর্তীতে বেশ কয়েক বার ইসলাম ভাই জেলা ক্রীড়া সংস্হার কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন।

আমি যখন ৭ম শ্রেণীতে পড়ি ১৯৮৪ সাল।সে বছর সিলেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেরে বাংলা কাপ জাতীয় ফুটবলের ফাইনাল খেলা।গ্যালারিতে বসে আমি, ইসলাম ভাই ও নুরুল ভাই এক সাথে খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। কানায় কানায় পূর্ন ছিল সিলেট স্টেডিয়াম।স্বাগতিক দল হিসেবে সিলেট জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়।সে সময় সিলেট জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন কার্জন। এছাড়া বহুবার ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে নুরুল ভাই, ইসলাম ভাইসহ আমি এক সাথে খেলা দেখেছি।

ক্রীড়া পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে পারিবারিক একটি ঐতিহ্য ছিল।নুরুল ভাইয়ের চাচা মরহুম মহব্বত আলী কুতিল ছিলেন সাবেক ফুটবলার ও রেফারী। চাচাতো ভাই নুরুল আলম ও কয়েছ আহমদ ছিলেন সাম্প্রতিক সময়ের কৃতি ফুটবলার। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় নুরুল হক একজন সফল ক্রীড়া সংগঠক ও ফুটবল রেফারী হিসেবে বিয়ানীবাজার উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মাতিয়ে রেখেছিলেন। বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার আয়োজনে ঐতিহ্যবাহী পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বড় বড় ফুটবল টুর্নামেন্টে জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের নামীদাম ফুটবলার অংশ নিতেন। ৩০/৩৫ হাজার মানুষের সমাগম হতো এসব টুর্নামেন্টে। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এসব টুর্নামেন্টে নুরুল হক ফুটবল রেফারী কিংবা সহকারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এ মাঠ থাকবে। আয়োজন হবে অনেক ফুটবল টুর্নামেন্টের। থাকবেন না শুধু নুরুল হক।

আপনি একজন ক্রীড়া সংগঠকই ছিলেন না। শিক্ষানুরাগী ও সমাজকর্মী হিসেবে আপনার পরিচিতি ছিল। দক্ষতার এ প্রমাণ আপনি রেখেছেন। এটার দৃষ্টান্ত শ্রীধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষানুরাগী সদস্য হিসেবে পিছিয়ে পড়া এ বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেক বহুদূর। এ বিদ্যালয়কে জাতীয় শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিণত করতে আপনার নিরলস প্রচেষ্ঠা ছিল।আপনি অর্জন করেছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক বিদ্যোৎসাহীর পুরস্কার অর্জন করেছেন। এটা ছিল গোটা পঞ্চখণ্ডের গৌরব।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আপনার পদচারণা ছিল।তরুণ বয়সে যাত্রা নাটকে আপনি অংশগ্রহন করেছেন। আপনার অভিনীত অনেক যাত্রা নাটক আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। অভিনয় ছিল চমৎকার।

রাজনীতিতে আপনি সামনের সারিতে না থাকলে ও সক্রিয় ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এক সময় বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আপনার পরিচিতি ছিল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিয়ানীবাজার আবাহনী ক্রীড়াচক্রের একজন নীরব সংগঠক ছিলেন। ক্রীড়াঙ্গন ছাড়াও বিয়ানীবাজারের সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে আপনার পদচারণায় মুখরিত ছিল।আপনার সৃজনশীল কর্মকান্ড ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুনাবলীর প্রকাশ আমাদের চোখেই দেখেছি।আপনি বেঁচে থাকবেন অনন্ত কাল।আপনার কর্মের মধ্যে।

মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি ছুটে যান নুরুল হকের শ্রীধরার বাড়ীতে। শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। এসময় বিয়ানীবাজার পৌর মেয়র আব্দুস শুকুর, উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান মাকসুদুল ইসলাম আওয়াল ও বিয়ানীবাজার উপজেলা ক্রীড়া সংস্হার সাধারণ সম্পাদক মো: ইসলাম উদ্দিন উপস্হিত ছিলেন।

১২ জুলাই শুক্রবার রাত ১০টায় বৈরি আবহাওয়া উপক্ষো করে নুরুল হকের জানাজার নামাজে শরিক হতে শ্রীধরা নবাং শাহী ঈদগাহ ময়দান লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।চির বিদায় নিয়েছেন আমাদের নুরুল ভাই। আর কথা হবে না । দেখা হবে না তাঁর সাথে। পরপারে ভালো থাকুন নুরুল ভাই।আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।

লেখক: সাংবাদিক। বৃটেন প্রবাসী কমিউনিটি নেতা।

 

Developed by :