Wednesday, 18 September, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




আজ ভয়াল ২৫ জুন

‘জিএস ফারুকুল হকের রক্ত বৃথা যেতে পারে না’

ছিদ্দিকুর রহমান

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ একক প্যানেলে জয়লাভ করতো। ৯০’র দশকে স্বাধীনতা বিরোধীরা যখন ক্ষমতার মসনদে তখন ছাত্রলীগের খুবই দুঃসময় ছিল। সেই সময় বৃহত্তর সিলেটের বেশির ভাগ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাতক শিবির চক্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল।

শুধু তাই নয়, তারা তখন কবি শামসুর রহমান এবং ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক জাহানারা ইমাম-এর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সিলেটের মাটিতে করতে দেয় নি। সেই প্রতিকূল মূহূর্তে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ১৯৯৪ ছাত্র সংসদ (হেলিম-ফারুক) পরিষদ কবি শামসুর রহমান-কে অভিষেক অনুষ্ঠানে এনেছিলেন এবং সেদিন কবি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমার এই সংবর্ধনা বিয়ানীবাজারে না হয়ে যদি সিলেটের বুকে হত তাহলে আরও ভাল হত।’


এক সময় ছাত্রলীগের দুর্দিনে, নেতা-কর্মীদের বিপদে কিংবা আন্দোলন সংগ্রামের সম্মুখ পানে থেকে যিনি লড়াই করতেন তিনি ৯৪’র সংগ্রামী জি.এস ফারুকুল হক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল এই সৈনিক ঘাতক চক্রের জন্য ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তাই ফারুকুল হকের উপর সর্বদা তাদের অশুভ দৃষ্টি ছিল। ঘাতকরা একটি সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, কিভাবে এই ফারুকুল হককে চিরতরে শেষ করা যায়? ১৯৯৫ সালের ২৪শে জুন ছাত্রলীগের একজন নেতার উপর তৎকালীন শিবির সন্ত্রাসীরা হামলা করে তাঁকে গুরুতর আহত করে। তারা জানতো ফারুকুল হকেরা এর বদলা নিতে চাইবে।


অর্থাৎ পরদিন সংঘর্ষ হবে। তাই তারা ২৫শে জুন বৃহত্তর সিলেটের প্রশিক্ষিত ক্যাডারদের জড়ো করে। সকালে তারা কলেজ ক্যাম্পাস এবং তার আশপাশ ঘেরাও করে থাকে। এই দিন বেলা ১১টার দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে ছাত্রনেতা ফারুকুল হক তাদেরকে বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিরোধের এক পর্যায়ে ফারুকুল হককে ছাত্রশিবিরের প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা হত্যার প্রচেষ্টায় নির্মম-নৃশংস্য ভাবে আঘাত করে।


সে সময় তারা প্রায় মৃত ভেবে তাঁকে ফেলে যায়। হিংস্র সেই আঘাতের প্রায় ২৬টি চিহ্ন উনার শরিরে দৃশ্যমান। রক্তঝরা এই ঐতিহাসিক দিনে রক্তাক্ত হয়েছিল আমাদের প্রাণের সবুজ ক্যাম্পাস, রক্তাক্ত হয় চিরচেনা রাজপথ। সেই রক্তস্নাতে শিক্ত বিয়ানীবাজার উপজেলা ছাত্রলীগের দুর্লভ ইতিহাস। এই ইতিহাস মুজিব রণাঙ্গনের এক আদর্শিক সৈনিকের, এই ইতিহাস ছাত্রলীগের ত্যাগ ও সংগ্রামের।


সেদিন রক্তাক্ত অবস্থায় জি.এস ফারুকুল হককে পরিচিতজনেরা স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। আশংকাজনক অবস্থায় সেখান থেকে তাঁকে তাড়াতাড়ি সিলেট ওসমানী মেডিকেলে প্রেরণ করা হয়। তখন বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকায় ওসমানীতে প্রতিপক্ষের আধিপত্য ছিল অনেক বেশি। সেখানে তাদের আহত সদস্যদের সু-চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর এদিকে ফারুকুল হকের চিকিৎসায় কোন তৎপরতা নেই বরং তাঁকে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছিল। সেখানে এই অবস্থায়ও তাঁর উপর শিবির ক্যাডাররা হামলা করার পরিকল্পনা করছিল, যেন এখানেই তাঁকে মেরে ফেলবে।

সেই প্রতিকূল পরিবেশে ক্রমশই যখন অবস্থার অবনতি হচ্ছে তখন তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে সিলেট নিরাময় ক্লিনিকে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা, আমাদের শ্রদ্বেয় নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ ভাই ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ফারুকুল হককে দেখতে নিরাময় ক্লিনিকে ছুটে আসেন। মমতাময়ী নেত্রী নাহিদ ভাইয়ের কাছ থেকে সার্বক্ষনিক চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়েছেন।


পরে তাকে ঢাকার সমরীতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য উনারই আত্মীয় মেজর আজিজুর রহমানের প্রচেষ্টায় তাঁকে ঢাকার সি.এম.এইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। টানা দুই মাস চিকিৎসার গ্রহনের পর তিনি বেশ কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন। তাঁর চিকিৎসার সার্বিক ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় নেতা নুরুল ইসলাম নাহিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই সময় উনার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা মোঃ আব্দুস শুকুর ভাই সর্বদা পাশে ছিলেন।


সহজ-সরল স্পষ্টভাষী চরিত্রের মানুষ জি.এস ফারুকুল হক। রাজনীতিতে ছাত্রলীগই তাঁর প্রাণের ঠিকানা। দেশের দুর্যোগপূর্ণ সময়ে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শিক সৈনিক হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাহসী-স্পষ্টবাদী নেতা হিসেবে জনগণের নিকট যেমন পরিচিত তেমনি ছাত্রলীগের সর্ব মহলে জনপ্রিয়। ছাত্র রাজনীতিতে তিনি জেলা ছাত্রলীগের সদস্য এবং উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি পরিবারের স্বজনদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং সেখানে নিউইয়র্ক সিটি আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।


ব্যক্তি জীবনে তিনি অত্যন্ত সাধারণ, নিরহংকারী একজন মানুষ। যারা একবার তাঁর সাথে মিশেছেন তারা তাঁকে মনে-প্রাণে ভালবাসেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে বার বার ত্যাগী সৈনিকের পরিচয় দিয়েছেন। এখনো দেশের প্রতিটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা-কে বিজয়ী করতে ছুটে আসেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। যেখানে রয়েছে তাঁর রক্তাক্ত ইতিহাসের অমর স্মৃতি।


তৃণমূলের এই ফারুকুল হকেরা রক্ত দিয়ে দলকে বাঁচিয়ে রাখেন কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি বার-বার দলের শৃঙ্খলাভঙ্গকারীরা ক্ষমতার মসনদে যায়। এক শ্রেণী স্বার্থলোভী, মোশতাক চক্র নির্বাচন আসলে দলের বিরুদ্ধে চলে যায়। তাঁরা একে-অন্যের বিরোধীতা করে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এজন্যে দিন-দিন দলের ঐক্য ও সক্রিয়তা নষ্ট হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে রক্ত, ঘাম-শ্রম বিসর্জন দেয়া এই ফারুকরা মুজিববাদী তারুণ্যের প্রেরণা। ছাত্র রাজনীতিতে জি.এস ফারুকুল হক অসংখ্য কর্মীদের কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।

আমারা ছাত্রলীগ পরিবার কিংবদন্তীতুল্য এই সাবেক ছাত্রনেতার সু-স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং আলোকিত ভবিষ্যৎ কামনা করি।

জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: ছাত্রলীগ কর্মী।

















 

Developed by :