Tuesday, 15 October, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




জ্বিন তাড়ানোর নামে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন, তরুণীর মৃত্যু

কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় শাহনাজ আক্তার শিখা (২৫) নামে এক তরুণীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। জ্বিন তাড়ানোর নামে হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় ঢুকিয়ে নির্যাতন চালানোর দুই দিনের মাথায় গতকাল বুধবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিখার তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে। স্বামী প্রবাসী হওয়ায় মা সুরাইয়া বেগমের কাছেই থাকতেন তিনি। গত রোজার ঈদের পর হঠাৎই অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন শিখা। যখন ভালো থাকে তখন মাকে জানান, ওই সময়ের কোনো কিছুই তিনি মনে রাখতে পারেন না। সব কিছু কেমন ওলট-পালট লাগে।



শিখা যখন অস্বাভাবিক থাকেন তখন নিজের গায়ের জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলেন। এমন অবস্থায় শিখাকে ডাক্তারের কাছে নেয় তার মা সুরাইয়া বেগম। ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি শিখার মা তাকে একজন হুজুরের কাছেও চিকিৎসা করান, যদি কোনো খারাপ আছর থেকে থাকে এই ভেবে। তবে কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। পরে শিখার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খোঁজ মিলে কবিরাজ ফারুক হোসেনের।

সুরাইয়া বেগম জানান, মেয়েকে সুস্থ করার জন্য গত শনিবার (১৫ জুন) এক কবিরাজের দ্বারস্থ হন। কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন দম্পতির সঙ্গে ১০ হাজার টাকায় চুক্তি হয় শিখাকে সুস্থ করার জন্য। তারা জানায়, এক সপ্তাহ চিকিৎসা চলবে। গত রোববার (১৬ জুন) ঢাকার কদমদতলিতে সাদ্দাম মার্কেটে সুরাইয়া বেগমের বাড়িতে ওঠেন কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন।



শিখার মা জানান, প্রাথমিক চিকিৎসায় কবিরাজ বলেন তার সঙ্গে একটি খারাপ জ্বিন আছে। তাকে তাড়াতে হলে বেশ কিছু নিয়ম পালন করতে হবে। এজন্য কবিরাজ অগ্রিম সাত হাজার টাকা নেন। এক পর্যায়ে শুরু হয় চিকিৎসা। প্রথমে ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে চলে চিকিৎসা। এতে কিছুটা কাজ হলে বিশ্বাস বাড়ে। ফলে তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা আসে। এক পর্যায়ে কবিরাজ দম্পতি বলে মেয়ের ওপর থেকে খারাপ আছর বিদায় করতে হলে তাদের বাসায় নিয়ে যেতে হবে। সেখানে নিয়ে গেলে ভালো চিকিৎসা হবে বলে জানায়।



এর পরই গত সোমবার (১৭ জুন) বিকেলে শিখাকে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি চৌধুরিপাড়ায় কবিরাজের ভাড়া বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন ভালো থাকার পর গত মঙ্গলবার (১৮ জুন) আবার শুরু হয় শিখার অস্বাভাবিক আচরণ। এ সময় কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন চিকিৎসার নামে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন বলেও জানান শিখার মা।



মারধর-নির্যাতনে মেয়ের চিৎকার দেখে শিখার মা প্রতিবাদ করলে ওই কবিরাজ দম্পতি জানান, তার মেয়েকে মারছেন না তারা, মারছেন শিখার সঙ্গে থাকা খারাপ জ্বিনকে। আর চিৎকারতো সে করছে না, করছে ওই খারাপ জ্বিন। সহ্য না হলে শিখার মাকে পাশের ঘরে গিয়ে বসে থাকত বলেন ওই কবিরাজ।

শিখার মা জানান, একপর্যায়ের কবিরাজ ফারুক ও তার স্ত্রী জেসমিন শিখার হাত-পা বেঁধে ফেলে। পরে বুকের ওপর উঠে আঘাত করতে থাকে। মুখে কাপড় ঢুকিয়ে গলা চেপে ধরে রাখে। এভাবে চলে দুদিন।



এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে শিখার মা মেয়েকে কবিরাজের বাড়িতে রেখে সাদ্দাম মার্কেটে নিজ বাড়িতে যায় ব্যক্তিগত কাজে। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কবিরাজ ফারুক শিখার মাকে ফোন করে জানান, শিখাকে খারাপ জ্বিন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি যেন তাড়াতাড়ি সেখানে পৌঁছান।

এ খবর শুনে শিখার মা কবিরাজের বাড়িতে গিয়ে দেখেন তার মেয়েকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। পরে দ্রুত শিখার মা তাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে খবর দিলে তিনি গিয়ে দেখেন শিখা মারা গেছে কয়েক ঘণ্টা আগে। এর পরে তারা বিষয়টি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অবহিত করেন।পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিখার লাশ উদ্ধার করে এবং কবিরাজ দম্পতিকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।



শিখার মা সুরাইয়া বেগম নিজের ভুল স্বীকার করে জানান, তার মতো আর কোনো মা যেন এমন ভুল না করেন। আর সেইসঙ্গে তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার প্রার্থনা করেন। ওই কবিরাজ দম্পতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে তার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে বলে মনে করেন তিনি।



এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) এইচ এম জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় শিখা নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে শিখার লাশ উদ্ধার করেছি।’




























 

Developed by :