Monday, 17 June, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




বাংলাদেশীরা পাবেন বিনিয়োগের সুযোগ

উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ভিসা পদ্ধতি চালু করেছে যুক্তরাজ্য

মুহাম্মদ তাজ উদ্দিন: উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন ভিসা স্কিম চালু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। ‘বিজনেস স্টার্ট আপ’ নামের নতুন এই ভিসায় বিলেতের বাজারে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন বাংলাদেশীরাও।

দ’ুটি ক্যাটাগরিতে এই বিজনেস ভিসা প্রবর্তন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বৃটেনে বসবাসরত যে কোন দেশের নাগরিক ‘স্টার্ট আপ’ ক্যাটাগরিতে এবং বৃটেনের বাইরে থেকে যে কোন উদ্যোক্তা ‘ইনোভেটিভ’ ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারবেন বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ৫০ হাজার পাউন্ড বিনিয়োগ করে প্রাথমিকভাবে দু’বছর মেয়াদী এই ভিসা পেতে পারেন।

গত ৭ মার্চ নতুন এই ভিসা স্কিমের ঘোষণা দেন বৃটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী (হোম সেক্রেটারী) সাজিদ জাবেদ। বৃটেনে বসবাস করছেন বা সেখানে গিয়ে ব্যবসা করতে আগ্রহীরা এ ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। স্টার্ট আপ বা নতুন উদ্যোগ এবং এনোভেটর বা উদ্ভাবনী বিনিয়োগকারী- এ দু’টি ক্যাটাগরিতে এ ভিসার জন্য আবেদন করা যাবে বলে জানিয়েছে বৃটেনের হোম অফিস। তবে, নতুন এই দু’টি ক্যাটাগরির জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বৃটেনের ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ অফিস এবং হোম অফিস সূত্র জানিয়েছে, স্টার্ট আপ বিজনেস ভিসার ক্ষেত্রে বৃটেনের যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ¯œাতক ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যক্তি আবেদন করতে পারবেন। ইতোমধ্যে যারা যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তারা আবেদন করলে কোন সুনির্দিষ্ট পুঁজি বা মূলধনের প্রয়োজন হবেনা। কিন্তু, ভিসা লাভের জন্য তাদেরকে হোম অফিসের অনুমোদন নিতে হবে।

অন্য ক্যাটাগরির ভিসা হচ্ছে- ‘ইনোভেটিভ ভিসা’। এই ক্যাটাগরির ভিসার জন্য যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বা যুক্তরাজ্যের বাইরে থেকে যে কেউ আবেদন করতে পারবেন। এই ভিসা আবেদনের জন্য ন্যূনতম ৫০ হাজার পাউন্ড পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে। আবেদনকারীকে সেই বিনিয়োগ সক্ষমতা প্রদর্শণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বৃটেনের টিয়ার সিস্টেমের ভিসার ক্ষেত্রে চলমান টিয়ার-১ ক্যাটাগরির ভিসার পরিবর্তে চলতি মার্চ থেকে প্রবর্তিত হতে যাচ্ছে ‘স্টার্ট আপ বিজনেস ভিসা’। আগের গ্র্যাজুয়েট এন্টারপ্রেনিউর রুট বন্ধ হবে চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে। নতুন ভিসা ক্যাটাগরিতে আগের চেয়ে অনেক সহজ করা হয়েছে।

নতুন স্টার্ট আপ ভিসা হচ্ছে টিয়ার-১ এর যে গ্র্যাজুয়েট এন্টারপ্রেনিউরদের জন্য পূর্বে নিয়মের একটি বিকল্প পদ্ধতি। এই ভিসায় যারা বিলেতে ব্যবসা করতে যেতে চান তাদেরকে বিনিয়োগ সক্ষমতা প্রমাণের পাশাপাশি ইংরেজির সক্ষমতাও প্রদর্শন করতে হবে। ইংরেজির সক্ষমতা যাচাইয়ের পরীক্ষা ভি-২ এর সার্টিফিকেট অর্জন করতে হবে। আগের টিয়ার-১ ক্যাটাগরির ভিসার ক্ষেত্রে এন্টারপ্রেনিউরদের ভিসার জন্য ভি-১ ল্যাঙ্গুয়েজ সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হতো।

স্টার্ট আপ ভিসায় আবেদন করতে হলে, একটি চিঠির মাধ্যমে ব্যবসায়ীক ধারণা বা আইডিয়া প্রজেক্ট প্রোফাইল আকারে বিজনেস প্লান হোম অফিসে অনুমোদনের জন্য জমা দিতে হবে। এই বিজনেস প্লানে সন্তুষ্ট হলে আবেদনকারীকে দুই বছরের জন্য বৃটেনের বিজনেস ভিসা প্রদান করা হবে।

এই ভিসা দু’বছরের জন্য দেয়া হবে। তবে, ৫ বছর পর এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন লাভ করবে। ইতোমধ্যে যারা টিয়ার-১ এর আওতায় এন্টারপ্রেনিউর বা উদ্যোক্তা হিসেবে ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন, তারা ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই ক্রাইটেরিয়ায় অবস্থান করবেন এবং ২০২৫ সালে গিয়ে তারা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করবেন।

নতুন এই ভিসা সম্পর্কে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ভিনদেশী তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এই ভিসা পদ্ধতি আগের চেয়ে তুলনামূলক সহজ হবে এবং আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশাবাদী যুক্তরাজ্য সরকার।

যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন বিষয়ক মন্ত্রী ক্যারলিন নক্স তার টুইট বার্তায় ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাজ্য সরকার চায় মেধাবী ও প্রকৃত উদ্যোক্তারা বৃটেনে আসুক। তাতে বৃটেনের অর্থনীতি লাভবান হবে।

বৃটেনের বিদ্যমান টিয়ার পদ্ধতির ভিসার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদেরকে আগে টিয়ার-১ ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে হতো। তবে, জটিল বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ও কঠিন শর্তের কারণে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীদের জন্য এই ক্যাটাগরিতে ভিসা পাওয়া অনেক কঠিন ছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত টিয়ার-১ ক্যাটাগরিতে আবেদনকারী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ৪২ ভাগ আবেদনই প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাজ্যের ভিসা সেকশন। নতুন একই স্টার্ট আপ বিজনেস ভিসায় শর্ত শিথিল করায় ভিসা পাওয়া সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারী সাজিদ জাবেদ জানিয়েছেন, টিয়ার-১ ক্যাটাগরিতে বছরে ২ হাজার জনকে ভিসা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত বছর মাত্র ৮শ’ ৮৯ জনকে ভিসা দেয়া হয়েছে। বাকী আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। নতুন স্টার্ট আপ বিজসেন ভিসায় আবেদনকারীর যোগ্যতাকে শিথিল করায় বেশী সংখ্যক আবেদন জমা পড়বে এবং ভিসা ইস্যুর হারও বাড়বে।

সম্প্রতি জি-৭ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেও বলেছেন, বৈধ পন্থায় বৃটেনে আসা লোকজনের জন্য ইমিগ্রেশন পলিসিকে আবেদনকারীদের জন্য অনুকূল করতে নীতিমালাও শিথিল করা হবে।

এ সব কারণে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অদূর ভবিষ্যতে বিশেষ করে ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে বৃটেনের ভিসা ইস্যুর পরিমাণও বাড়তে পারে।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক অভিবাসী সহায়তা সংস্থা, সদ্যবিলুপ্ত ইমিগ্রেশন এডভাইজারী সার্ভিস (আইএএস)-এর ডিরেক্টর (অপারেশন) এবং বর্তমানে লন্ডনের হান্টার স্টোন ল’ ফার্মের কনসালটেন্ট আব্দুল হাসাদ চৌধুরী সিলেটের ডাক-কে বলেন, নতুন এই ভিসার মাধ্যমে বৃটেন বিশ্বব্যাপী তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মেধাবী, উদ্যমী ও উদ্ভাবনী শক্তি সম্পন্ন উদ্যোক্তারা যাতে বৃটেনের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন- এই ভিসার মাধ্যমে সেই সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে উদ্যোক্তাদের জন্য বৃটেনের বাজারটিও খুলে দিতে আগ্রহী বৃটেন সরকার।

লন্ডনভিত্তিক শাহজালাল সলিসিটরস এর লিগ্যাল কনসালটেন্ট ও ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হামিদ বলেন, নতুন এই ভিসা স্কিমের পলিসি ও গাইড লাইন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই, ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। যেমন- ভিসা আবেদনকারীরা কোথায় নিবন্ধিত (এনরোল) হবেন বা কিভাবে তারা অনুমোদন (এনডোর্সমেন্ট) নেবেন অথবা আগামী জুলাইয়ে এন্টারপ্রেনিউর ভিসা ক্যাটাগরি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই এটি চালু হবে কি-না এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে, এটি সুষ্পষ্ট যে বৃটেনের ব্রেক্সিট পরবর্তী অর্থনীতির মন্দাভাবের আশঙ্কাকে মোকাবেলা করতে এবং বিশ্বব্যাপী তরুণ উদ্যোক্তাদের যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে এই ভিসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আইএএস, সিলেট অফিসের সাবেক প্রধান, যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন আইন বিশেষজ্ঞ ও বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোজাক্কির হোসাইন সিলেটের ডাক-কে বলেন, বড় ধরনের কোন নাটকীয়তা না ঘটলে চলতি বছরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে যুক্তরাজ্য অর্থাৎ ব্রেক্সিট কার্যকর হবে। এটি হলে বৃটেনের বাজারে হঠাৎ করেই তারল্য সংকট বা বিনিয়োগ স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। এ কারণে আগে ভাগেই ব্যবস্থা নিয়ে রাখছে বৃটেন সরকার। নতুন এই ভিসা পদ্ধতির ফলে বিশ্বের সকল দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের বৃটেনে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এর সুযোগ নিতে পারেন বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশী কোটি টাকার বিনিয়োগে বৃটেন তথা ইউরোপের বাজারে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন তারা।

উল্লেখ্য, আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবার অর্থাৎ ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের কথা ছিল বৃটেনের। ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। ই-ইউ থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে দুই দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন হাউজ অব কমন্সে। কিন্তু, তার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন সে দেশের সংসদ সদস্যরা। তার পরিকল্পনা অনুমোদন না করলে শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের কোন ‘ডিল’ ছাড়াই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে হবে বৃটেনকে। তবে, বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় কিছুটা সংস্কার এনে তা আবারো সংসদে উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

সূত্র: দৈনিক সিলেটের ডাক।

 

Developed by :