Tuesday, 16 July, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ১ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




বিশ্বনাথে ‘পলো বাওয়া’ উৎসব পালন

প্রনঞ্জয় বৈদ্য অপু, বিশ্বনাথ।।

‘ঝপ-ঝপা-ঝপ’ শব্দের তালে তালে সিলেটের বিশ্বনাথে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালন করা হয়েছে চিরায়ত বাংলার বার্ষিক ‘পলো বাওয়া’ উৎসব। রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রতি বছরের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরী গ্রামের ‘বড় (দক্ষিণ) বিলে’ ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হয়।

 


উৎসবে অংশগ্রহণ করা ছোট-বড় প্রায় সবাই পেয়েছেন মাছ ধরার স্বাদ। তবে এবছর বিলে অধিক পানি ও কচুরিপানা থাকায় অন্যান্য বছরের তুলনায় মাছের সংখ্যা কম। তথাপি হাসি-টাট্টা আর মহিলাদের অপেক্ষায় সম্পন্ন হওয়া পলো বাওয়া উৎসবে শিশুদের আনন্দের কোন সীমানা থাকে না।

 


শীতের তীব্রতাকে উপক্ষো করে গ্রামবাসী পূর্ব পুরুষের আমল থেকে চলে আসা পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করেন ‘বাঁশ আর বেতের সমন্বয়ে তৈরী পলো ও উড়াল-ছিটকি-টেলা জাল হাতে। বার্ষিক পলো বাওয়াতে অংশগ্রহন করার জন্য বড়দের চেয়ে ছোটদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। আর দর্শক হিসেবে প্রতি বছরের ন্যায় এবার গ্রামের মহিলাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

 


এজন্য বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসবে এসময়টুকু প্রতি বছর গ্রামবাসীদের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়। আগামী ১৫ দিন পর্যন্ত চলবে ওই উৎসব। গ্রামবাসীর ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ১৫ দিন পর আবার ২য় ধাপে পলো বাওয়া হবে।

 


গোয়াহরী গ্রামে ঐহিত্য অনুযায়ী শত শত বছর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে বাংলা বছরের প্রতি মাঘ মাসের ১ তারিখ ওই বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবছর বিলে পানি বেশী থাকায় ১ মাঘের পরিবর্তে ১৪ মাঘ (রোববার) অনুষ্ঠিত হয় পলো বাওয়া উৎসব। পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই গোয়াহরী গ্রামে বিরাজ করে অন্য রকম এক উৎসবের আমেজ।

 


আর তাই পলো বাওয়া দেখতে বা এতে অংশগ্রহন করতে বছরের এসময় যেমন বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের মহিলারা বাবার বাড়িতে স্বামী-সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসেন, তেমনি প্রবাসে থাকা পুরুষরাও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেশে বেড়াতে আসেন নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী।

 


গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সকাল ৮টা থেকে সৌখিন মাছ শিকারীরা বড় বিলের তীরে এসে জমায়েত হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে বিলের পারে লোকসমাগম। আর সকাল ১১টায় হৈ-হৈ করে একসাথে পলো-জাল হাতে মাছ শিকারে নেমে পড়েন গ্রামের সব বয়সের পুরষরা। ঝপ-ঝপা-ঝপ শব্দের তালে তালে প্রায় ২ ঘন্টা চলতে থাকে পলো বাওয়া উৎসব।

 


গ্রামের ঐতিহ্য অনুযায়ী গ্রামের প্রতি ঘর থেকে একজন করে পুরুষ সদস্য পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করেন। যাদের পরিবারে পুরুষ সদস্য বাড়িতে নেই, তাদের পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে কোন আত্মীয় পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করেন।

 


এদিকে মাছ শিকারীদের শিকার করা মাছের মধ্যে ছিল- গজার, বোয়াল, শউল, রুই, মিরকা, বিগ্রেড, কার্পু, বাউশ, ঘনিয়া, তেরাপিয়াসহ ছোট-বড় বিভিন্ন জাতের মাছ। তবে এবছর শিকার করা মাছের মধ্যে বড় মাছের চেয়ে ছোট মাছের পরিমাণ ছিল বেশী। একেকটি মাছ শিকারের সাথে সাথে চিৎকার করে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করেন পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহন করা মাছ শিকারীরা। শিকারীদের ওই আনন্দের সাথে সাথে তাল মেলান বিলের তীরে অপেক্ষমান গ্রামের নারী-পুরুষরা। গ্রামের মুরব্বী ও শিশুদের আনন্দের পরিমাণ অন্যদের চাইতে একটু বেশিই থাকে।

 


পলো বাওয়া উৎসবের আনন্দ বৃদ্ধি পায় ‘বাবা-চাচা, ভাই-দাদা, মামা-ফুফার সাথে আসা বিভিন্ন বয়সী শিশুদের কারণে। নিজের আত্মীয়-স্বজনের কেউ মাছ শিকার করলে তাদের আনন্দ আর কে দেখে! বিলের তীরে শিশুরা অপেক্ষা করে কখন নিজের কেউ মাছ শিকার করে এনে তাদের হাতে দেবেন, আর তারা কখন মাছটি বহন করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে। মাছ ধরতে বড়দের পাশাপাশি অনেক শিশুরাও জাল নিয়ে নেমে পড়ে বিলের পানীতে। দূর থেকে কিংবা অন্য গ্রাম থেকে আসা গ্রামবাসীর অনেকের আত্বীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবরাও বিলের তীরে দাঁড়িয়ে থেকে মাছ শিকার দেখার পাশাপাশি আনন্দ ভাগ করে নেন নিজেদের আতœীয়-স্বজনদের মাছ শিকারের সফলতায়।

 


সাত বছরের শিশু সালমান আহমদ বলেন, আব্বার লগে আইছি মাছ ধরাত, ধরছিও কতটা (ছোট মাছ)। এবলা (এখন) বাড়িত নিয়ে হকলরে (সবার) লইয়া একলগে (একসাথে) ই মাছ খাইমু।

 


দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় মেম্বার গোলাম হোসেন বলেন, ‘পলো বাওয়া’ উৎসব আমাদের পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য। দীর্ঘকাল ধরে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় আমরা গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে ওই উৎসব পালন করে থাকি। এই উৎসবের আনন্দ অন্য কোন কিছুতে পাওয়া যাবে না।

 


গ্রামের প্রবীন মুরব্বী হাজী আবদুল আহাদ বলেন, পলো বাওয়া উৎসব আমাদের গ্রামের ঐতিহ্য। ওই উৎসবের সময় গ্রামবাসীদের মিলন মেলায় পরিণত হয় বড় বিলের তীর। পূর্ব পুরুষের আমল থেকে চলে আসা পলো বাওয়া উৎসবে এখন বয়সের কারণে অংশগ্রহন করতে পারি না। তবে প্রচুর পরিমাণ মাছ শিকার করেছি ওই বিলে।

প্রবাসী ক্বারী আবুল হোসেন, আবদুল আওয়াল, সাদিক হোসাইন, ফয়সল আহমদ, আবদুল মছব্বির জানান, তারা ‘দীঘদিন ধরে প্রবাসে বসবাস করে আসছেন। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দেশে আসতে না পরায় তারা প্রতি বছর পলো বাওয়াতে অংশগ্রহন করতে পারেন নি। পলো দিয়ে মাছ শিকার তাদের কাছে একটি মজার বিষয়। তাই এবার অংশগ্রন করতে পারায় তারা আনন্দিত।

 





সর্বশেষ সংবাদ

Developed by :