Wednesday, 13 November, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ ঐতিহ্য

জাকির হোসেন রাজু।।

হাজার বছরের চলে আসা বাঙ্গালিদের কিছু ঐতিহ্যবাহী জিনিস যা আমরা সেই প্রাচীন কাল হতে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছি। এই ঐতিহ্যবাহী জিনিস গুলি হাজার বছরের বাংলার সংস্কৃতির এক একটি উপাদান ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ধারক যা গ্রাম বাংলার গৃহস্থের সচ্ছলতা ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতিক হিসাবে প্রচলিত ছিল। আজ এই আধুনিক যুগে আধুনিক পণ্যের কাছে, আধুনিক কলা কৌশলের নিকট হেরে গিয়ে আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে।

বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জে এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। মাছে ভাতে বাঙ্গালির ঘরে এক সময় নবান্নের উৎসব হতো ঘটা করে। উৎসবের প্রতিপাদ্যটাই ছিল মাটির গন্ধ মাখা ধান। ঢেকি ছাটা ধানের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন মানুষের জীবনে বসছে আধুনিকতার ধারা। একে একে নতুনের চমকে পুরনোরা যেন আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে।

আগের সেই সৌম কান্তি চেহারায় এখন মাঞ্জা পড়ছে ধাপে ধাপে রঙের প্রলেপ। সব কিছু ঢেকে যাচ্ছে চাক্যচিক্ষ্যেতে। এত করে জীবন ধারায় সঞ্চালিত হয়ে উঠেছে রকেট গতির প্রতিযোগীতা। একটার পর একটা পরির্বতন এনে দিচ্ছে কী করে নিজেকে আরো বেশি প্রাপ্তির খাতায় নাম লেখানো যায়। ঐতিহ্যের ধারা আজ যেন বার্ষিক উৎসবে পরিনত হয়েছে।

প্রদর্শনী আর ক্ষনিকের হৈ চৈ জীবনকে নতুন করে তোলে তার ক্লান্তির ধারায়। মানুষ যেন আজ শারিরীক শ্রম ভুলে যাচ্ছে যান্ত্রিক সভ্যতার কারণে। খাঁচার পাখি বা খামারে লালন-পালন করা মুরগীর এ উৎপাদন করে যাচ্ছে তার চাহিদার মত করে। বেড়ে চলা মানুষের ভীড়ে আর প্রয়োজনের তাগিদে মানুষও যেন যন্ত্র হতে চলেছে।

তাই এই দূর্বলতাকে পাশকাটিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদেরই লালন করতে হবে। তা না হলে তখন হয়ত আমাদের নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্য থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। সত্যি কথা বলতে গেলে আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতি ঐতিহ্যের প্রতিক গুলির কথা আজ যেন রূপকথার গল্পের মতো করে শোনাতে হয় আমাদের নতুন প্রজন্মকে।

আগামি প্রজন্মের কাছে হয়তো এটা স্বপ্নের মত মনে হবে। তখন ইতিহাসের পাতায় ছাড়া বাস্তবে খুঁজে পাওয়া কল্পনীয়। নতুবা যাদুঘরের কোণে ঠাঁই করে নেবে নিজের অস্তিত্ব টুকু নিয়ে। হারিয়ে যাওয়া আমাদের বাঙ্গালীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর প্রতিক গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

গরুর গাড়ী

আমার গরুর গাড়ীতে বউ সাজিয়ে, গ্রামের পথে গরুর গাড়ী,বউ চলেছে বাপের বাড়ি বা গাড়িয়াল ভাই কথা গুলো গান বা কবিতার লাইন হলেও এক সময় তা বাস্তব ছিল। এখন এমন দৃশ্য এক কথায় দৃর্ভেদ্য ব্যাপার। কারণ গ্রাম-গঞ্জে গেলেও এখন এমন গরুর গাড়ী দেখা দুস্কর। এমন এক সময় ছিল যখন গ্রাম বাংলার জনপথে গরু বা মহিষের গাড়ীই ছিল একমাত্র যোগাযোগের বাহন।

কিন্তু কালের বির্বতনে আজ গরু বা মহিষের গাড়ী শুধুই স্মৃথি আর স্মৃথি। এক সময় গ্রাম বাংলায় কৃষকের ঘরে ঘরে শোভা পেত নানা ধরনের গরুর গাড়ী। মানুষের মালামাল বহন,নবান্ন উৎসবে কৃষকদের ধান বহনকারী একমাত্র বাহন ছিল গরুর গাড়ী। এমন কী বউ আনা নেওয়া করা হতো গরুর গাড়ী করে।

পহেলা বৈশাখসহ সকল অনুষ্টানে পরিবার নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে মেলা দেখতে যাওয়া, গরুর গাড়ীতে বসে গাড়ী ওয়ালার ভাটিয়ালী গান শোনা সে যে এক অন্য রকম অনুভূতি।

কিন্তু বর্তমান গ্রাম বাংলা থেকে গরুর গাড়ী হারিয়ে যাওয়ায় এসব অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বর্তমান যুগের ছেলে-মেয়েরা। এভাবে চলতে থাকলে ঐতিহাসিক এই গরুর গাড়ী একদিন বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেবে। বর্তমান প্রজন্মের কেউ গরুর গাড়ী চিনবে না।

লাঙ্গল-জোয়াল                         

কালের বিবর্তনে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার কৃষি কাজের অন্যতম যন্ত্র লাঙ্গল,জোয়াল,মইসহ নানান উপকরণ। কৃষিপ্রধান আমাদের দেশে এক সময় খেত- খামারে কৃষকের লাঙ্গল আর মই দিয়ে চাষাবাদের দৃর্শ্য সবার নজর কাড়তো। চাষাবাদের অন্যতম উপকরণ হিসেবে কাঠের লাঙ্গল ছিল অপরিহার্য।

হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদে ব্যবহারের বাঁশ,কাঠের হাতল ও লোহার ফাল বিশিষ্ট কাঠের লাঙ্গল আজ বিলুপ্তির পথে। এক সময় কাঠের লাঙ্গল ছাড়া গ্রাম বাংলার চাষাবাদের কথা চিন্তাই করা যেত না কিন্তুৃ কালের বির্বতনে বিজ্ঞানের যুগে পদার্পন করে চাষাবাদের যান্ত্রিক সব সরঞ্জামাদি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কৃষি কাজে ব্যবহারের ওইসব লাঙ্গল,জোয়াল,মই ও হালের বলদ।

নকশিকাঁথা:                                                                                                                                                  নকশিকাঁতা বাংলার ঐতিহ্য। পাখি,ফুল,লতা-পাতা ও বিভিন্ন চিত্র একে গ্রামের বউ ও ঝিয়েরা এককালে এক প্রকার আর্কষনীয় কাঁথা তৈরী করতো। এত ফুঠে উঠতো গ্রাম বাংলার দৈনন্দিন জীবনের চিত্র। সুখ-দুঃখ,আনন্দ-বেদনার গল্প। আর এই বিশেষ কাঁথাকে বলা হতো নকশি কাঁথা।

এই নকশিকাঁথা নিয়ে পল্লী কবি জসিম উদ্দিন ‘‘নকশি কাঁথার মাঠ’’ নামে একটি কাব্য রচনা করেছিল। নকশিকাঁথা সেলাই করা একদিকে যেমন মেয়েদের শিল্প নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করতো ,তেমনি অবসর কাঠানোর একটি মাধ্যম এই নকশিকাঁথা। সে সময় এটি ছিল শীত নিবারণে গরিবদের অন্যান্য বন্ধু ,কিন্তু আজ এই নকশিকাঁথা ধনীদের বিলাস পণ্যে পরিণত হয়েছে। যদিও এটি পাওয়া খুবই কঠিন তবে, বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় পাওয়া যায়।

পালকি:                                                                                                                                                              পালকি আগে অভিজাত শ্রেণীর চলাচলের জন্য বিশেষ করে মেয়েদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হত। তবে বর-কনের পরিবহন করতে এই বিশেষ যানটির ব্যবহার উল্লেখ যোগ্য। বাঁশ,কাঠ,টিন ও লোহার শিক দিয়ে তৈরী পালকি খুব দৃস্টিনন্দন ও শিল্প সমৃদ্ধ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ছয়জন বেহারা পালকি বহন করত। সেকালে পালকি ছাড়া বিয়ের সুন্দর আয়োজনটা যেন অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। আজ যান্ত্রিক সভ্যতায় যন্ত্রেও পরিবহন ব্যবস্থার কাছে হারিয়ে গেছে পালকি নামক বাংলার ঐতিহ্য।

পাল তোলা নৌকা:                                                                                                                                                    ও মাঝি নাও ছাইড়া দে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে- পাল তোলা নাও বা পালের নৌকা বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম একটি নাম। আগের দিনে ছোট-বড় সবধরনের নৌকাতেই পাল ব্যবহার করা হত। মূলত মাঝিরা যখন দাড় টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো বা বাতাস অনুকূলে থাকলে পাল তুলে খুব তাড়াতাড়ি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আসা-যাওয়া করা যেত। তবে বর্তমানে প্রত্যেক নৌকায় পালের জায়গায় দখল করেছে মেশিন।

নৌকা বাইচ:                                                                                                                                                                নৌকা বাইচ হলো নদীতে নৌকা চালনার প্রতিযোগীতা। একদল মাঝি এক নিয়ে একটি দল গঠিত হয়। এমন অনেকগুলো দলের মধ্যে নৌকা চালনার প্রতিযোগীতাই হলো নৌকা বাইচ। ফার্সি শব্দ বাইচ এর অর্থ বাজি বা খেলা। নৌকার দাঁড় টানা ও নৌকা চালনার কৌশল দিয়ে প্রতিযোগীরা জয়ের জন্য খেলেন বা বাজি ধরেন।

নদী মাতৃক আমাদের বাংলাশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আনন্দ আয়োজন, উৎসব ও খেলাধুলা সবকিছুতেই নদী ও নৌকার সরব আনাগোনা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কুতির সংস্করণ বাংলাদেশের নৌকা বাইচ। এক সময় এদেশে যোগাযোগ ছিল নদী কেন্দ্রিক আর বাহন ছিল নৌকা। কিন্তু কালের বির্বতনে নৌকা বাইচ হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে।

ঢেঁকি:                                                                                                                                                                        ও বউ ধান ভানিরে ঢেকিতে পাড় দিয়া গ্রাম বাংলার বৌ ঝিদের সেই ধান চাল ভাঙ্গার ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার ছবি ফুঠে ওঠে এ গানটিতে। ঢেঁকি আমাদের এই বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। আজকাল গ্রামের বাড়িগুলোতেও চোখে পড়ে না ঢেঁকির অথচ একদিন ঢেঁকি ছাড়া একটি বাড়িও কল্পনা করা কঠিন ছিলো।

চাল-ডালও মসলা ঢেঁকিতে বানতে বাড়ির বউ ঝিয়েরা। আজ ঢেঁকিতে ছাটা শস্যের বদলে এসেছে মিলে ছাটা চাল,ডাল ও মসলা। তাই আর আজকাল গ্রামের বাড়িগুলোতে ঢেঁকিতে পাড় দেবার ধুপধাপ শব্দও শোনা যায় না। তবে ঢেঁকি ছাটা চালের কদর এখনও কমেনি। কারণ ঢেঁকি ছাটা চালের উপরে আবরণ বা খোসা অন্নু থাকে যাতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন রয়েছে। ঢেঁকি চালাতে সাধারণত দু’জন লোকের প্রয়োজন হয়।

এক্ষেত্রে সাধারণত মহিলারাই চালায় ঢেঁকি। একজন থাকেন কাঠের সাথে লাগানো অংশ যার প্রান্ত উঠে যায় এবং যার পাশে হাত দিয়ে ধরার নির্দিষ্ট খুটি থাকে এটা পা দিয়ে চাপ দিতে আবার ছাড়তে হয়। অপরজন থাকেন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে ঢেঁকির আঘাতে ধান থেকে চাল বের হয় । সেখানে সতর্কতার সাথে ধান দিতে হয় আবার প্রতি আঘাতের পর ধান নড়াচড়া করে উল্টে – পাল্টে দিতে হয় যাতে সবগুলোতে ঢেকির পাড় লাগে।

মাথাল বা মাথল:                                                                                                                                                 মাথাল বা মাথল (আমাদের সুনামগঞ্জ জেলায় অনেকে পাথলা বলেও ) চেনে। মাথাল গ্রামীণ কৃষকদের বর্ষা ও রোদ মৌসুমে বৃষ্টি ও রোদ হতে বাচঁতে মাথায় দিয়ে বের হবার একটি ছাতা বিশেষ। বাঁশ, শাল পাতা ও পলিতিন কাগজ দিয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। রোদ ও বৃষ্টি হতে রক্ষা পেতে গ্রামীণ র্কষকদের নিকট এটি স্মরণীয়। অনেকে এটি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু কালের বির্বতনে আজ মাথাল আমাদের সমাজে শুধুই স্মৃথি।

বাবুই পাখি:

বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই,কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই- বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিপুণ বাসা তৈরীর কারিগর বাবুই পাখি। এ পাখি সুনিপণভাবে খড়ের ফালি, ধানের পাতা, তালের কচি পাতা, ঝাউ কাঁশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু তালগাছ, নারিকলে গাছ বা সুপারি গাছের মতো বড় বড় গাছে চমৎকার আকৃতির বাসা তৈরী করে। বাবুই পাখির বাসা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি মজবুত।

প্রাকুতিক দৃর্যোগ প্রবল ঝড়ে বাতাসের সাথে মোকাবিলা করেও টিকে থাকে তাদের বাসা। মুক্ত বুননের বাবুই পাখির বাসাটি টেনেও ছেঁড়া খুব কঠিন। বাবুই একাধারে শিল্পী, স্থপতি এবং সামজিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। কালের প্ররিক্রমায় বাবুই পাখির বাসা বর্তমানে পাওয়া খুব কঠিন। আমাদের এই ঐতিহ্য গুলো রক্ষার দায়িত্ব আমাদের না নিলে এক সময় শুধু বইয়ের পাতায় ছাড়া বাঙ্গালীর ঐতিহ্য গুলো আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

তাই সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমাদের ঐতিহ্যগুলো নিয়ে বিশেষ মেলা, প্রর্দশনী, সেমিনারসহ নানান ধরনের আয়োজন করলে একদিকে বর্তমান প্রজন্ম যেমন আমাদের এই হারানো ঐতিহ্যগুলো চিনতে পারবে অন্যদিকে রক্ষায় এগিয়ে আসবে। -দিরাই-শাল্লা

 





Developed by :