Wednesday, 20 November, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




আমার দেখা ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ, মৃত্যুটাও হলো ব্যতিক্রম

প্রিয় ছমির দাদা ছিলেন আমার দেখা একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ আর উনার মৃত্যুটাও হলো ব্যতিক্রম

নাজিম উদ্দিন।।

হাজী ছমির উদ্দিন সাহেব। বিয়ানীবাজারের মুড়িয়া ইউনিয়ন তথা অত্র অঞ্চলের একজন সুনামধন্য এবং অতি পরিচিত মুখ। কথাবার্তা এবং আচরনে ছিলেন সচরাচর অন্যান্য যেকোন মানুষ থেকে ব্যতিক্রমধর্মী একজন মানুষ। আর এজন্য পরিচিত সকল মহলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় একজন মানুষ।

বিগত কিছুদিন থেকে মরনব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে অবশেষে গত ২জানুয়ারী রাত ৮.২০ মিনিটের সময় তিনি সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

আমার বাবা এবং মা দুজনেরই সম্পর্কে উনি মামা সেই সুবাধে তিনি আমার দাদা। এছাড়া আমরা একই বাড়ির বাসিন্দা হিসাবে আমি জন্মের পর থেকে উনাকে দেখে বড় হয়েছি।

আমার জীবনে দেখা সম্পুর্ন ভিন্ন প্রকৃতির একজন মানুষ ছিলেন আমার ছমির দাদা। চারিত্রিক এবং ব্যবহারিক দিক দিয়ে তিনি অন্যান্য যেকোন মানুষ থেকে কতটুকু ভিন্ন ছিলেন তা বলে বা লিখে বুঝানো সম্ভব নয়।

যারা উনাকে চিনেন এবং জানেন একমাত্র তাদের পক্ষে উনার সম্পর্কে ভীন্নতা আচ করতে সক্ষম।আগেই বলেছি উনার কথাবার্তা ছিলো অন্য যেকোন মানুষ থেকে ভিন্ন। দাদা-নাতি হিসাবে আমার সাথে উনার সম্পর্ক ছিলো রসালো এবং ভালোবাসায় পরিপুর্ন।

আমার সাথে উনি কখনো ধমক ছাড়া কথা বলতেন না আবার সাথে ছিলো আদর মাখা উপদেশ।আমাকে দেখামাত্র উনি যখন ধমকের সুরে কথা বলতেন তখন উনার নিজের অজান্তে আমার প্রতি উনার স্নেহ-ভালোবাসার প্রকাশটুকু লুকাতে পারতেন না। যেমন আমি উনার বাড়িতে গিয়ে যখন উনার সামনে বসতাম তখন উনি ধমক আর বকুনি দিতেন যেকোন ব্যাপার নিয়ে সেই সাথে খোচা দিতেন খাবার সময় আসছো আমার ঘরে খাওয়ার জন্য, কথাটি বলার পরপর ঘরে অর্ডার দিতেন আমার জন্য খাবার রেডি করতে।

এমনকি তিনি মজাদার অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতেন আমাকে খাওয়ানোর জন্য যা আমি সামনে গেলেই হাজির করতেন।

আমার জীবনে মনে নেই খাওয়ার সময় আমি কখনো খাওয়া-দাওয়া না করে আসতে পেরেছি বলে।উনার মন যে খুবই নরম এবং সরল ছিলো তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাই উনার ধমক এবং বকুনির সাথে আদর ও ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রন ছিলো তা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার কারনে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়পাত্র আর এজন্যই আমি বলেছি তিনি ছিলেন আমার জীবনে দেখা একজন ব্যতিক্রম মানুষ।

বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে আমি সিলেট শহরে বসবাস করি। যার কারনে আমার বাড়ির ঘর তালাবদ্ধ থাকে ফলে বাড়িতে আসলে উনার বাড়িতে থাকি। ব্যস্ততার কারনে সবসময় আসতে পারতাম না ফলে যখন বাড়িতে আসি সাথে সাথে আমাকে ধমক দিয়ে বলতেন বেটা বনে গেছো তাই মনে পড়ে না বাড়ির কথা। তারপর শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা আমাকে কি খাওয়াবেন আর কোথায় রাখবেন।

সেই সব স্মৃতিগুলো কখনো ভুলার নয়। এমন ভালোবাসা আর স্নেহ কার কাছ থেকে পাবো? উনি যেমন সবকিছুতে ব্যতিক্রম তেমনি নিজের মৃত্যুটাকেও ব্যতিক্রম করে নিলেন। উনার মারাত্মক অসুস্হতার কারনে উনার সকল ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী ইংল্যান্ড-কানাডা থেকে দেশে এসেছেন।

গত সপ্তাহে তিনি প্রবাসী সকল ছেলে-মেয়েকে ডেকে বললেন বাড়িতে বসবাসকারী মেঝ ছেলের ঘরের বড় নাতির বিয়ে তিনি দেখে যেতে চান। যেই বলা সেই কাজ, এক সপ্তাহের মধ্যে বড় নাতির বিয়ে ঠিক করা হলো এবং ৩ জানুয়ারী বিয়ের তারিখ ঠিক হলো।

সেই উপলক্ষে ২ তারিখ বিয়ে বাড়ি সাজানো হলো, বাড়িতে আলোক সজ্জা আর বিয়ের গেইট লাগানো হলো। সকল আত্নীয়-স্বজন বিয়ে উপলক্ষে এসেছেন আর আমিও ২ তারিখ বিকালে সপরিবারে বিয়েতে যোগদানের উদ্দেশ্যে বাড়িতে এসেছিলাম।

বিয়ে বাড়িতে সকলে যখন হাসি-খুশী তখন রাত ৮.২০ মিনিটে আমাদের সবাইকে কাদিয়ে তিনি হেসে হেসে চলে গেলেন না ফেরার দেশে আর নিজের মৃত্যুকেও করে নিলেন ব্যতিক্রম। এযেনো নিজে বাড়িকে সাজিয়ে, আত্নীয়-স্বজনকে একত্র করে বিয়ের আগে নিজের যাত্রা নিশ্চিত করে নিলেন।

তাই বিয়ের দিন সকাল ১১ ঘটিকার সময় প্রিয় দাদার লাশ নিয়ে জানাজা এবং দাফনের জন্য সেই সাজানো গেইট দিয়ে নিয়ে গেলাম আর তারপর বেলা ২ঘটিকার সময় উনার আদরের নাতিকে বর সাজিয়ে অশ্রুসজল চোখে বরযাত্রা করলাম।

আর আমার প্রিয় দাদা যেমন ছিলেন একজন ব্যতিক্রম মানুষ তেমনি নিজের শেষটাও ব্যতিক্রম হলো। উনার বড় ছেলে ইংল্যান্ড প্রবাসী আহাদ চাচাও মন-মানসিকতায় অনেকটা উনার বাবার মতো উদার এবং সহজ-সরল প্রকৃতির।

আজ আমার বার বার মনে হচ্ছে আমি তো মনে হয় বিয়ে উপলক্ষে আসিনি আমার সাথে উনার সেই ছোটবেলা থেকে যে স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসার টান সেই টানই আমাকে নিয়ে এসেছে আর আমার কোলেই আমার প্রিয় দাদার মৃত্যু হয়েছে এটাই আমার পরম পাওয়া।

মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেনো প্রিয় দাদাকে জান্নাতের উচ্চ আসন দান করেন আমিন।

 

Developed by :