Wednesday, 20 November, 2019 খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |




বিদায় ‘রক্তকরবী’র প্রেমিক ‘কিশোর’ টুটুল

লুৎফর রহমান রিটন।।

১৯৭২ সালের প্রসন্ন এক বিকেলে জয়কালী মন্দির রোডে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার গানের ক্লাশেই প্রথম দেখেছিলাম টুটুল নামের সদ্য তরুণ, টিংটিঙে স্বাস্থের হাস্যোজ্জ্বল মানুষটিকে।

দাদাভাই আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, বিটিভি থেকে একজন আসবেন স্ক্রিপ্ট নিয়ে। নাটকের স্ক্রিপ্ট। তিনি আমাদের পরীক্ষা নেবেন। আমরা উৎরে গেলে টিভি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পাবো।

ঘাড় উপচানো লম্বা চুল আর নবীন গোঁফে ঝিলিক দেয়া তারূণ্য উদ্ভাসিত কণ্ঠে তিনি আমাদের পাঠ করে শোনালেন পুরো স্ক্রিপ্ট। চিরচেনা সেই কাহিনি। মুরগি আর শেয়ালের গল্প। কিন্তু আলাদা একটা বিশেষত্ব আছে স্ক্রিপ্টের। সংলাপগুলো ছড়ার মতো করে মিলিয়ে মিলিয়ে লেখা। ওই বালক বয়েসেই আমার মধ্যে ছন্দ-দ্যোতনার একটা ব্যাপার ছিলো। কচি-কাঁচার আসরে বয়েস উল্লেখ করে আমার একটা দু’টো ছড়াও ছাপা হয়ে গেছে। ছড়ার মতো বলেই স্ক্রিপ্টটা আমার ভারি পছন্দ হয়েছিলো।

টুটুল ভাই এরপর আমাদের একেকজনকে একেকটা অংশ পাঠ ও অভিনয় করে দেখাতে বললেন। জীবনের প্রথম অভিনয় প্রচেষ্টা হলেও খুব অনায়াসেই উৎরে গেলাম আমি। আমাকে তিনি পছন্দ করলেন সবচে বেশি।

আমাকেই তিনি নির্বাচন করলেন প্রধান দু’টি চরিত্রের একটিতে। আমি নির্বাচিত হলাম শেয়ালের চরিত্রে। মুরগির চরিত্রটা পেলো শিল্পী মহলানবীশ।(এখন টিভি প্রেজেন্টার। টেলিভিশনের চেনা মুখ।) চিত্রনাট্য অনুসারে ওই নাটকে কয়েকটা গানও ছিলো। তার মধ্যে একটি গান ছিলো সলো, যেটা শেয়াল গাইবে। টুটুলের উপস্থিতিতেই আমাদের সঙ্গীত শিক্ষক সুখেন্দু চক্রবর্তী আমার জন্যে নির্ধারিত গানটায় সুর সংযোজন করলেন কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই। সুখেন্দু স্যার খুব গুণী সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। এক সময় উদীচীর সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। সবাই তাঁকে চিনতো খোকাদা নামে। কুমিল্লার বিখ্যাত খোকাদা।

তখন বিটিভি ভবনটা ছিলো ডিআইটিতে।সদ্য স্বাধীন দেশ। শাদাকালো টিভি। একটা মাত্র স্টুডিও। সেটাও খুব বেশি বড় পরিসরের নয়। এবং তখন ৯৯ ভাগ অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো লাইভ। অর্থাৎ কী না সরাসরি। কোনো রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা ছিলো না। কোনো কাট-এর সুযোগ নেই। যা করার এক টেকেই করতে হবে। কোনো ভুল করা চলবে না। কোনো ভুল হলে সেই ভুলটাই অন এয়ার হবে।

টানা কয়েকদিন কষে আমরা রিহার্সাল করলাম। টুটুল ভাই এসে দেখিয়ে দিলেন কী ভাবে কি করতে হবে। সংলাপগুলোর প্রক্ষেপণ কীরকম হবে। কণ্ঠের কোথায় ওঠানামা। এবং আমাদের মুভমেন্ট।

[ক্যাপশন/ ২০০১৪ সালে অটোয়া ভ্রমণকালে পার্লামেন্ট হিল ক্যাম্পাসে সাইদুল আনাম টুটুল,লুৎফর রহমান রিটন এবং দিনু বিল্লাহ্‌। আলোকচিত্র/কুঞ্জ।]

নির্ধারিত দিনের সন্ধ্যায় আমরা কয়েকজন শিশুশিল্পী ডিআইটির ঘড়িঅলা বিল্ডিঙে চলে গেলাম সুখেন্দু স্যারের নেতৃত্বে। আমাদের গানের সঙ্গে সঙ্গত করতে বিটিভির মিউজিশিয়ানদের পাশে একটা মাদুর পেতে বসে গেলেন সুখেন্দু স্যারও। গানগুলো গাইলাম আমরা। যন্ত্রীরা সুরগুলো বুঝে নিলেন। সুখেন্দু স্যারকে যন্ত্রীদের সঙ্গে বাজাতে দেখে এক ভদ্রলোক খুব বিনয়ের সঙ্গে আপত্তি জানালেন। (যদ্দুর মনে পরে তিনি ছিলেন বেলাল বেগ।) তাঁর আপত্তি নিষ্পত্তি করলেন সুখেন্দু স্যার একটি মাত্র কথায়–চিন্তা করবেন না।

আমাকে কোনো চেক দিতে হবে না এই বাজানোর জন্যে। এটা আমি এমনিতেই করে দিচ্ছি। আমার কিউ ছাড়া ছেলেমেয়েগুলো ঠিক মতো গাইতে পারবে না। বিশেষ করে রিটনের সলো গানটা।

ঠিক কথাই বলেছিলেন সুখেন্দু স্যার।
আমার সলো গানটা ছিলো মুরগিকে পটানোর গান। গান গেয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে পাঁচিলের ওপর বসে থাকা মুরগিটাকে নামিয়ে আনার জন্যে রাজনীতিবিদদের মতো ভুয়া প্রতিশ্রুতির গান। গানের কথাগুলো ছিলো এরকম–
”হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া/মিলগিয়া সব মিলগিয়া/এক হুয়া সব এক হুয়া/নেই হিংসা শত্রুতা/আজকে সবার মিত্রতা/আজকে হাসির ফুলঝুরি/খুশির দিনের গান ধরি/…ব্যঘ্র মহিষ এক সাথে/কুকুর বেড়াল এক পাতে/ভোজ হবে ভাই মিলমিশে/মিলতে মোদের ভয় কিসে?/মিলগিয়া সব মিলগিয়া/এক হুয়া সব এক হুয়া”…

গানটির ‘নেই হিংসা শত্রুতা’ আর ‘ব্যঘ্র মহিষ এক সাথে’ গাওয়ার আগে হারমোনিয়ামে ‘টিডিডিং’ টাইপের একটা পিস সুখেন্দু স্যার বাজাবেন, তারপর আমি কলিটা গাইবো। এই টিডিডিং-টা খুব জরুরি ছিলো লাইভ অনুষ্ঠানে ঠিকভাবে গাওয়ার জন্যে।

স্টুডিওতে যথারীতি নাট্য রচয়িতা ও পরিচালক টুটুল ভাই উপস্থিত আছেন। প্যানেলে আছেন (পরে জেনেছি)কাজী কাইয়ুম। কাজী কাইয়ুম-এর সহযোগী হিশেবে বিটিভিতে তখন টুটুল, আলী ইমাম এবং রিয়াজউদ্দীন বাদশা নামের তিন মেধাবী তরুণ কাজ করতেন। লাইভ অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে যদি আমি কথা ভুলে যাই তবে তো ভারী বিপদ হবে! সেই বিবেচনায় একটা ব্ল্যাংক পোস্টার পেপারে কালো চক দিয়ে বড় বড় হরফে গানটা লিখিয়ে আনা হয়েছিলো ক্যালিগ্রাফি সেকশন থেকে। অনুষ্ঠান চলাকালে, গানের সময়টায় ক্যামেরার পাশে দাঁড়িয়ে দুই হাতে পোস্টারটাকে আমার দিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নৃত্যের ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে রিয়াজউদ্দীন বাদশা তাঁর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

টেলিভিশন তখন এমনই ছিলো। পারষ্পরিক ভালোবাসা আর আন্তরিকতার মিশেলে চমৎকার পরিবেশ বিরাজ করতো তখন। এই রিয়াজউদ্দীন বাদশা এবং আলী ইমাম পরবর্তীতে বিটিভিতে চাকরি পেয়েছিলেন। নিজেদের মেধা আর যোগ্যতায় প্রমোশন পেতে পেতে দু’জনেই এক সময় জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত হয়েছিলেন। কিন্তু টুটুল ভাই টিভিতে প্রযোজকের চাকরি না করে হতে চেয়েছিলেন অন্যকিছু।

আর তাই তিনি বিশেষ স্কলারশিপে চলে গিয়েছিলেন ভারতের বিখ্যাত পুনে ইন্সটিটিউটে, ১৯৭৩ সালে। সেখানে তিনি পাঠ নিয়েছেন সম্পাদনার। চলচ্চিত্র সম্পাদনা। তাঁর সমসাময়িক সহপাঠিদের মধ্যে ছিলেন সদ্য প্রয়াত আনোয়ার হোসেন(সিনেমাটোগ্রাফার), শফিকুল ইসলাম স্বপন (সিনেমাটোগ্রাফার), বাদল রহমান (ফিল্ম ডিরেকশন)এবং সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী (ফিল্ম ডিরেকশন)। এঁরা প্রত্যেকেই একেকটা রত্ন হয়ে ফিরে এসেছিলেন দেশে।

পুনে থেকে ফিরে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ চলচ্চিত্রের অনবদ্য সম্পাদনার জন্যে টুটুল পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া ঘুড্ডি, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, দুখাই, দহন, দীপু নাম্বার টু-র চলচ্চিত্র সম্পাদনাও সাইদুল আনাম টুটুলেরই করা।

মেধাবী ও নির্মহ এই মানুষটি পরবর্তীতে মন লাগিয়েছিলেন পরিচালনায়। টেলিভিশনের জন্যে বেশ কিছু নাটক ও টেলিফিল্ম তিনি নির্মাণ করেছিলেন। তে ভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত তাঁর পরিচালিত ‘আঁধিয়ার’ চলচ্চিত্রটি আমাদের একটি উল্লেখযোগ্য সম্পদ।


খুব আমোদ প্রিয় মানুষ ছিলেন টুটুল ভাই। হাসতেন প্রচুর। হাসাতেনও। তাঁর রসিকতার লেভেলটা ছিলো অতি উঁচু।

নব্বুই-এর দশকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইস্ফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে একটা অনুষ্ঠানে টুটুল ভাই এসেছিলেন বক্তা হয়ে। আমিও ছিলাম অন্যতম বক্তা। অনুষ্ঠান শুরুর আগে আমরা দু’জন বসেছিলাম পাশাপাশি চেয়ারে, দর্শক সারিতে। অনেক বছর পর দেখা হলো আমাদের। একই শহরে থাকলেও তাঁর পেশা আর আমার পেশার মিলা না থাকার কারণেই সম্ভবত আমাদের মধ্যে খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হতো না। মাঝখানে পনেরো কুড়ি বছর অতিক্রান্ত। লক্ষ্য করলাম টুটুল ভাই আমাকে খুব সম্মান দেখিয়ে আপনি আপনি করে কথা বলছেন। প্রথমে ভাবলাম স্লিপ অব টাঙ্‌। পরে দেখি তিনি খুব সচেতন ভাবেই আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করছেন। খুব নিচু স্বরে আমি তাঁকে বললাম–টুটুল ভাই আপনি আমাকে আপনি করে বলছেন কেনো? আমাকে কি চিনতে পেরেছেন আপনি?

সিরিয়াস চেহারায় তিনি বললেন, কেনো চিনবো না! আপনি বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত একজন ছড়াকার আর আপনাকে চিনবো না!

মরিয়া হয়ে বললাম আমি, টুটুল ভাই আপনার নির্দেশনায় ১৯৭২ সালে বিটিভিতে আমি একটা নাটক করেছিলাম, ছোটদের নাটক। মনে নেই আপনার?
তিনি বললেন,
–কেনো মনে থাকবে না? মনে আছে তো!
–তাহলে আমাকে আপনি আপনি করে বলছেন যে!
–শুনেছি তুমি খুব ঠোঁটকাঁটা টাইপের। তোমাকে তুমি বলে শেষে আমি না কোন্‌ বিপদে পড়ি! তাই ভাবলাম আপনি বলাটাই নিরাপদ! হেহ্‌ হেহ্‌ হেহ্‌।

এই হচ্ছেন টুটুল ভাই। আমার সঙ্গে দীর্ঘকাল দেখা না হওয়ার মজাটা তিনি নিলেন অনবদ্য কায়দায়।
এইবার আমি সিরিয়াস হয়ে গেলাম, তো এখন কী মনে হচ্ছে আপনার? আমি কি ঠোঁটকাঁটা?
–না, এখন তো মনে হচ্ছে যতোটা খারাপ ওরা বলে ততোটা খারাপ তুমি নও। যথেষ্ট ভদ্রলোক বলেই তো মনে হচ্ছে তোমাকে। বলেই তাঁর বিখ্যাত গোঁফ ঝোলানো আকর্ণ বিস্তৃত হাসিটা হাসলেন টুটুল ভাই।


২০১২ সালে চ্যানেল আই কার্যালয়ে এক দুপুরে দেখা হলো টুটুল ভাইয়ের সঙ্গে, সাগর ভাইয়ের কক্ষে। সাগর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর পুরনো বন্ধুত্ব। সেই ডিআইটির আমল থেকে। দু’জনেই ছিলেন কাজী কাইয়ুমের ছায়াসঙ্গী, নিত্য সহচর। কতো অনুষ্ঠানই না করেছেন তাঁরা একসঙ্গে।

ওদের দুই বন্ধুর আলাপে এইটুকু বুঝতে পারলাম একটা কিছুর পরিকল্পনা হচ্ছে।

সেদিন রাতেই আমার ফোনে অচেনা নাম্বার থেকে কল এলো। আমি তো রিসিভ করি না। কলটা বারেবারে আসে। কি মনে করে রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে টুটুল ভাইয়ের কণ্ঠ–ফোন ধরো না কেনো? সাগরের কাছ থেকে তোমার নাম্বার নিয়ে একটা বিশেষ কাজে ফোন করেছি তোমাকে। রাবেয়া খালার (রাবেয়া খাতুন) উপন্যাস ‘বায়ান্ন বাজার তেপান্ন গলি’র নাট্যরূপ দিয়েছিলাম। শুটিং ও শেষ। নতুন এই ধারাবাহিকটা শুরু হবে চ্যানেল আইতে। সব রেডি। কিন্তু তোমার জন্যে আটকে আছি।

–আমার জন্যে আটকে আছেন মানে? আপনি ঠিক আছেন তো?

–আমি ঠিক নেই। একটা টাইটেল সঙ্‌ লাগবে না? সেইটা তো তোমাকেই লিখে দিতে হবে।

আমি হাসি, আপনার রসিকতার তুলনা নাই টুটুল ভাই। দিয়েছিলেন তো ঘাবড়ে। ঠিক আছে। কি কি চরিত্র আছে দৃশ্য আছে, কোন্‌ কোন্‌ কথা লাগবে এইসব একটা ব্রিফিং লিখে আমাকে দ্যান। আমি লিখে দেবো।
–ঠিক আছে, কাল চ্যানেল আইতে নিয়ে আসবো।

পরদিন দুপুরে কয়েকটা পয়েন্টস্‌ লেখা একটা কাগজ আমার হাতে দিয়ে টুটুল ভাই বললেন, দেরি করা চলবে না। আর ঘোড়ার গাড়ির টগবগ টগবগ রিদমটা য্যানো ব্যবহার করতে পারি সেইটা খেয়াল রেখো। তাড়াতাড়ি দিও। দেরি করা যাবে না একদম।

আমি বললাম, কবে লাগবে?
–সাতদিনের মধ্যে দেবে।
আমি বললাম, সাআআআআত-দিইইইইন! একটু কম হইয়া গেলো না টুটুল ভাই?
–কতোদিন লাগবে তোমার? জানি তুমি ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের হাতে তো সময় একদম নেই।
খুব কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে আমি বললাম–কাইল দুপুরেই দিয়া দিলে কেমন হয়?
শুনে টুটুল ভাই আমাকে মারতে আসলেন–ওরে শয়তান! এতো পাজি ক্যান্‌ তুমি?
আমি হাওয়া এক দৌড়ে।

সে বছর জুলাই থেকে চ্যানেল আইতে রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে সাইদুল আনাম টুটুল পরিচালিত ‘বায়ান্ন গলির এক গলি’ নামে ঢাকাইয়া ভাষার ধারাবাহিক নাটকটা প্রচারিত হয়েছিলো। আমার লেখা সেই সূচনা সঙ্গীতটির সঙ্গীতায়োজনে ছিলেন ফরিদ আহমেদ।

এর দু’বছর পর সাইদুল আনাম টুটুল স্ত্রী বুশরাসহ বেড়াতে এসেছিলেন কানাডায়, বুশরার বড়বোন কুঞ্জদের বাড়িতে। কুঞ্জর স্বামীর নাম দিনু বিল্লাহ। তাঁরা থাকেন সেইন্ট ক্যাথেরিন অর্থাৎ নায়াগ্রা ফল্‌স অঞ্চলে। দিনু বিল্লাহ্‌ আর কুঞ্জ ভাবী তাঁদের দু’জনকে অটোয়ায় নিয়ে এসেছিলেন। চমৎকার সময় আমরা কাটিয়েছিলাম একসঙ্গে। এক বিকেলে টুটুল ভাই, বুশরা, কুঞ্জ আর দিনু বিল্লাহদের নিয়ে অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলসহ বেশ কিছু জায়গায় চক্কর দিয়েছিলাম আমরা। বিপুল হাস্যরসে মশগুল ছিলাম আমরা। আমি বলেছিলাম, টুটুল ভাই, পৃথিবীতে অনেক ড্রাইভার পাইবেন কিন্তু ছড়াকার ড্রাইভার পাওন অতো ইজি না। ড্রাইভার হিশেবে আমাকে খুবই পছন্দ করেছিলেন টুটুল ভাই। জিপিএ ফাইভ ধরণের একটা সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন তিনি আমাকে। সন্ধ্যায় ফারুক-নীনাদের বাড়িতে জমে উঠেছিলো আরেকপ্রস্থ দীর্ঘ আড্ডা আর খানাপিনা। শার্লি মহা উচ্ছ্বসিত ছিলো বহুকাল পরে টুটুল ভাইকে পেয়ে।


এই গুণী ও নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ মানুষটা দীর্ঘকাল মুস্তাফা মনোয়ারের সহযোগী ছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে তিনি পাপেট শো করতেন। বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের একটা পাপেট সিরিজ ছিলো ‘বাঘা মেনি’ নামে। টুটুল ছিলেন মেনির ভূমিকায়। বাঘার চরিত্রটা মুস্তাফা মনোয়ার নিজেই করতেন। খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো সিরিজটা। মুস্তাফা মনোয়ার আর টুটুলের ভিন্ন ধাঁচের কণ্ঠস্বর খুবই পরিচিত ছিলো দর্শকদের কাছে।


১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল আনাম টুটুল। ছিলেন ৮ নম্বর সেক্টরে। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে গিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার ও টুটুল জুটি পাপেট শো করে আনন্দে প্লাবিত করতেন দর্শকদের। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ওখানে আশ্রয় নেয়া দুঃস্বপ্ন তাড়িত অসহায় বাঙালিদের মনোরঞ্জনে সে ছিলো এক দুর্দান্ত আয়োজন। লেয়ার লেভিনের তোলা ফুটেজে তারেক মাসুদ নির্মিত ‘মুক্তির গান’-এ এরকম একটা শরণার্থী শিবিরের দৃশ্যে আমরা দেখেছি, একটা টেবিলকে মঞ্চ বানিয়ে টেবিলের ওপরে ইয়াহিয়া খানের বেঢপ পাপেটের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারূপী টুটুলের অনবদ্য কথোপকথন এবং এক পর্যায়ে ইয়াহিয়ার কুপোকাৎ হওয়ার সময় বাঙালির বিজয়োল্লাস ও করতালিমুখর হাস্যধ্বনি। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। নিপীড়িত ও বঞ্চিত বাঙালির ভবিষ্যৎ বিজয়ের আগাম দৃশ্যকল্পই রচনা করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার ও সাইদুল আনাম টুটুল।

এই মুস্তাফা মনোয়ার বিটিভির ডিআইটি স্টুডিওতে অবিশ্বাস্য একটা প্রোডাকশন নামিয়েছিলেন ‘রক্তকরবী’ নামে, ১৯৭৬ সালে। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী। ছোট্ট সেই স্টুডিওতে রক্তকরবীর সেট নির্মাণ, আলোক প্রক্ষেপণ এবং শিল্পীদের অসাধারণ অভিনয় ও জালাল আহমেদের দুর্দান্ত আবহসঙ্গীতের সম্মিলনে ‘রক্তকরবী’ হয়ে উঠেছিলো বিটিভির একটি ঐতিহাসিক গৌরবময় সৃষ্টি। ‘নন্দিনী’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অনিন্দ্যসুন্দরী দিলশাদ খানম। নন্দিনীর প্রেমিক ‘কিশোর’-এর ভূমিকায় মুস্তাফা মনোয়ার কাস্ট করেছিলেন টুটুলকে। হ্যাঁ সাইদুল আনাম টুটুল। আহা কী অনবদ্য অভিনয়ই না করেছিলেন টুটুল! নিষ্পাপ এক কিশোর প্রেমিক হিশেবে টুটুলের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই কৈশোরেই।

গতকাল ইউটিউবের কল্যাণে টিভির পঞ্চান্ন ইঞ্চি পর্দায় আবারো দেখলাম রক্তকরবী। আবারো দেখলাম সেই কিশোর প্রেমিককে। প্রিয় টুটুল ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদে আমি একটুও কাঁদিনি। যদিও বিষণ্ণ ছিলাম সারাটা দিন। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে রক্তকরবীর কিশোরকে দেখে, টুটুল ভাইয়ের জন্যে প্রথম আমার চোখ অশ্রুসজল হলো। দৃশ্যটা বারবার রিওয়াইন্ড করে দেখি। বারবার।

নন্দিনীর জন্যে তাঁর ভালোবাসার নৈবেদ্য ‘রক্তকরবী ফুল’ নিয়ে অনেকটা নৃত্যের ভঙ্গিমায় নন্দিনী নন্দিনী (৭বার) বলে ডাকতে ডাকতে ছুটতে ছুটতে আসা কিশোরের মিষ্টি কণ্ঠের আকুতি শুনে দর্শিক হিশেবে আমি বিমুগ্ধ হলেও নন্দিনী বিরক্ত হয়ে বলে–
–আমাকে এতো করে ডাকিস কেনো কিশোর, আমি কি শুনতে পাইনি?
–শুনতে পাস জানি, কিন্তু আমার যে ডাকতে ভালো লাগে!আর ফুল চাই কি তোর? তাহলে আনতে যাই?
–যা যা এখুনি কাজে ফিরে যা, দেরি করিস নে

–সমস্ত দিন তো কেবল সোনার তাল খুঁড়ে আনি। তার মধ্যে একটু সময় চুরি করে তোর জন্যে ফুল খুঁজে আনতে পারলে আমি বেঁচে যাই।

–ওরে কিশোর জানতে পারলে যে ওরা শাস্তি দেবে

–তুমি যে বলেছিলে রক্তকরবী তোমার চাইই চাই, আমার আনন্দ এই যে, রক্তকরবী এখানে সহজে মেলে না, অনেক খুঁজে পেতে একটা জায়গায় এখানকার জঞ্জালের পেছনে একটিমাত্র গাছ পেয়েছি।

–আমাকে দেখিয়ে দে, আমি নিজে গিয়ে ফুল তুলে নিয়ে আসবো

-অমন কথা বলো না, নিষ্ঠুর হয়োনা, অই গাছটি থাক আমার একটিমাত্র গোপন কথার মতো। বিশু তোমাকে গান শোনায় সে তার নিজের গান
এখন থেকে আমি তোমাকে ফুল যোগাবো, এ আমারই নিজের ফুল

–কিন্তু এখানকার জানোয়াররা তোকে শাস্তি দেয় আমার যে বুক ফেটে যায়…

–সে ব্যথায় আরো বেশি করে আমারই ফুল হয়ে ফোটে
ওরা হয় আমার দুখের ধন।

–কিন্তু তোদের এই দুঃখ আমি সইবো কী করে!

–কিসের দুঃখ? একদিন তোর জন্যে প্রাণ দেবো নন্দিনী…
একথা কতোবার মনে মনে ভাবি

–তুই তো আমাকে এতো দিলি।
তোকে আমি কি ফিরিয়ে দেবো বলতো কিশোর?

–তিন সত্যিটি কর্‌ নন্দিনী আমার হাত থেকে রোজ সকালে ফুল নিবি?

–আচ্ছা তাই সই। কিন্তু তুই একটু সামলে চলিস।

–না। আমি সামলে চলবো না। চলবো না চলবো না চলবো না…ওদের মারের মুখের ওপর দিয়ে রোজ তোমাকে ফুল এনে দেবো।
রোজ তোমাকে ফুল এনে দেবো।
রোজ।
রোজ…

–কিশোর?

–রোজ
রোজ তোমাকে ফুল এনে দেবো…

বলতে বলতে লং শটে ফ্রেম থেকে বেরিয়ে গেলো কিশোর।

কিশোরের এই চলে যাওয়াটা আমাকে সহসা এতোটাই ব্যথিত করে তোলে যে চোখ আমার ঝাপসা হয়ে আসে। আমার চোখ ভেসে যায়।
নিষ্পাপ সেই প্রেমিক কিশোরের জায়গায় একবার আমি নিজেকে দেখি।
একবার টুটুলকে দেখি।
এবং শেষবার আমি দেখি নন্দিনীর অতীতের প্রেমিক কিশোরের জায়গায় বর্তমানের টুটুলকে, আটষট্টি বছর বয়েসী টুটুলকে, আমার টুটুল ভাই ফ্রেম আউট হয়ে গেলেন।

আর কখনোই ফ্রেমবন্দি করা যাবে না তাঁকে।

বিদায় টুটুল ভাই। লাইফ সাপোর্ট ছাড়াই এবার শান্তিতে ঘুমান আপনি।

অটোয়া ২০ ডিসেম্বর ২০১৮

 

Developed by :